তাঁদের স্মৃতিচারণায় সৌমিত্র উঠে এলেন শ্রদ্ধাভরে
তাঁদের স্মৃতিচারণায় সৌমিত্র উঠে এলেন শ্রদ্ধাভরেকোলাজ: আমিনুল ইসলাম

বইয়ের পাতা থেকে রুপালি পর্দায় নেমে এলেন ফেলুদা—তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় দিয়েই খ্যাতি পেয়েছিলেন। কী শিল্পসাহিত্য, কী চিত্রকলা; নানা গুণে প্রশংসিত ছিলেন এই বাঙালি। তাঁর প্রয়াণে ব্যথিত হয়েছেন শিল্প–সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষসহ ভক্তকুল। তাঁর সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্কিত বাংলাদেশের অনেকেই। তাঁদের স্মৃতিচারণায় সৌমিত্র উঠে এলেন শ্রদ্ধাভরে।
পাঁচ বছর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গঙ্গা–যমুনা সাংস্কৃতিক উৎসবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ফেরদৌসী মজুমদারের প্রথম দেখা। মাত্র ৩০ মিনিটের আলাপ। কিন্তু দুজনের এই আলাপ এমনভাবে গড়িয়েছিল, যেন তাঁরা কত দিনের পরিচিত! ফেরদৌসী মুজমদার সেই আড্ডার স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘এত বিশাল একজন ব্যক্তিত্ব চলে গেলেন, তাঁকে হারানোর বেদনা সীমাহীন। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই মুগ্ধতা আমার আজও কাটেনি। সাংঘাতিক উঁচু দরের বিরল একজন মানুষ। যেমন দর্শনধারী, তেমনই গুণবিচারী৷ কী অবলীলায় মানুষের মন চিনে নিতে পারেন তিনি। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। সবাই তো এক রকম হয় না। তবুও তাঁর কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন, এতটুকু সময় নষ্ট করেননি৷ তিনি সৎ, পরিশ্রমী, মেধাবী আর পরিশীলিত৷ এসব মানুষের কি কখনো মৃত্যু হয়?’

default-image
তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই মুগ্ধতা আমার আজও কাটেনি। সাংঘাতিক উঁচু দরের বিরল একজন মানুষ। যেমন দর্শনধারী, তেমনই গুণবিচারী৷ কী অবলীলায় মানুষের মন চিনে নিতে পারেন তিনি। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। সবাই তো এক রকম হয় না। তবুও তাঁর কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন, এতটুকু সময় নষ্ট করেননি৷
ফেরদৌসি মজুমদার
বিজ্ঞাপন

তাই তো, সৌমিত্র কীভাবে মারা যাবেন? তিনি তো অপু, ফেলুদা হয়ে বেঁচে থাকবেন ভক্তদের মধ্যে। সত্যজিৎ রায়–সৌমিত্র জুটিকে তো ভোলা যায় না। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে সৌমিত্রর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন ববিতা। শুধু ববিতা নয়, ‘চুপিচুপি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘সাঁঝবাতির রূপকথা’, ‘ভালোলাগা ভালোবাসা’ ও ‘মন্দ মেয়ের গল্প’ ছবিতে ফেরদৌসও পেয়েছিলেন সৌমিত্রকে।

default-image

ফেরদৌস বলেন, ‘আমি প্রথম দেখাতেই তাঁকে বললাম, “তুমি তো ফেলুদা”। তিনি বললেন, “আমি কি আর ফেলুদা আছি রে!” এভাবে আমাদের পরিচয়ের শুরু। শুটিংয়ে তাঁকে দেখলেই মনে হতো, নতুন কেউ কাজ করতে এসেছেন। চরিত্র নিয়ে এত সিরিয়াস ছিলেন! বলতেন, ‘‘চল রিহার্সেল করে নিই।” আমি বলতাম, ‘‘আগে মুখস্থ করে নিই?’’ কোনো দিনই বুঝতে দেননি, তিনি কত বড় মাপের অভিনয়শিল্পী। একজন অসাধারণ মানুষের কীভাবে সাধারণ হতে হয়, তার উদাহরণ ছিলেন তিনি।’

যৌথ প্রযোজনায় তৈরি ‘আগুন জ্বলবেই’ ছবিতে সৌমিত্রর সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ হয় আমিন খানের। কলকাতায় সৌমিত্রর সঙ্গে শুটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রথম দিনের শুটিংয়ে সৌমিত্রকে ধমক দিতে হবে। এত বড় মাপের একজন অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে প্রথম দিনে এমন সংলাপ দিতে মন থেকে সায় পাচ্ছিলেন না আমিন খান। তারপর তিনিই আমিন খানকে সহজ করে দেন। আমিন খান একটি বাক্যই বললেন তাঁকে নিয়ে, ‘একজন শিল্পী যত বড় হন, তিনি তত বিনয়ী হন। এটা তাঁকে দেখে বুঝেছি।’


কলকাতার দুটি সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ হয় ওমর সানীর। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সৌমিত্রদা একটা ইতিহাস। ভারতবর্ষের অভিনয়ের একটা ডিকশনারি। আমার সৌভাগ্য সহশিল্পী হিসেবে দাদাকে পেয়েছিলাম। তাঁকে দেখার পর আমি তাকিয়ে থাকতাম। আমাকে বলতেন, “কী রে কী দেখছিস? ” আমি বলতাম, ‘‘দাদা তোমাকে দেখি।’’

অভিনেতা শাকিব খান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যেখানে থাকেন, যেভাবেই থাকেন, আপনি আমাদের হৃদয়েই থাকবেন। বিদায় হে বরেণ্য।’
সৌমিত্রকে নিয়ে জয়া আহসান তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পর্দায় তিনি যখন অভিনয়ের গরিমা ঝেড়ে ফেলে চরিত্রের আচরণ ফুটিয়ে তুলেছিলেন, ভারতবর্ষের শিল্পভুবনে সেটা শুধু বিস্ময়কর একটা ঘটনাই ছিল না, ছিল এক নতুন যুগের শুরু। বিশ্ব চলচ্চিত্রের অভিনয়ের প্রথম সারিতেই তাঁর স্থান। কিন্তু অমন যে ইতিহাসের স্রষ্টা, অমন যে শিখরে ওঠা শিল্পী, মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন এক মহাসাগর। যে মহাসাগর অতলান্ত কিন্তু শান্ত। তাঁর মৃত্যু নেই!’

default-image

ছোট পর্দার অভিনেত্রী ঈশিতার সৌভাগ্য হয়েছিল ‘কাঠপেন্সিল’ নামের একটি টেলিছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করার।
ঈশিতা বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষের সঙ্গে আমি কাজ করতে পেরেছি। তখন তাঁর বয়স ৮৩ বছর। সেই বয়সেও তাঁর সময়ানুবর্তিতা ও পেশাদারত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে। ঠিক সময়ে সেটে আসাই নয়, তিনি আরও প্রস্তুতি নিয়ে আসতেন। কারণ, কখনো দেখিনি তাঁর একটি সংলাপ ভুল হয়েছে।’

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0