প্রথাগত গল্প বলার রীতি ভাঙা গল্প

পদ্ম পাতার জল ছবিতে অভিনয় করেছেন ইমন ও মিম
পদ্ম পাতার জল ছবিতে অভিনয় করেছেন ইমন ও মিম

১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন পাস হওয়ায় জমিদারি প্রথা এ দেশে বিলোপ হয়ে যায়। আজ থেকে ৬৭ বছর পেছনকার প্রেক্ষাপট নিয়ে তন্ময় তানসেনের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পদ্ম পাতার জল। এই চলচ্চিত্রের কাহিনি বর্ণনা করতে পরিচালক ধারাভাষ্যের সাহায্য নিয়েছেন। ধারাভাষ্যে গল্পের সঠিক সময়কাল বর্ণিত না হওয়ায় দর্শক গল্পস্বাদে বঞ্চিত হয়েছে।
জমিদারি সময়কালের পটভূমিকায় এক জমিদারপুত্র এবং বাইজির প্রেম-ভালোবাসা, পারস্পরিক মূল্যবোধের বিশ্বাস, সৌহার্দ্য ও কাপুরুষতার গল্প পদ্ম পাতার জল। গল্পে জমিদারপুত্র রেজওয়ান (ইমন) উচ্চতর শিক্ষার প্রয়োজনে শহরে আসে। হোস্টেলের রসিক বন্ধুদের প্ররোচনায় ঝুমরিমহল নামের এক বাইজির বাড়িতে যায় এবং ফুলেশ্বরী (বিদ্যা সিনহা মিম) বাইজির নৃত্যকলা ও রূপে মুগ্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের জনপদী ধারার চলচ্চিত্ররূপে পদ্ম পাতার জল-এর গল্প এগোতে থাকে।
ফুলেশ্বরীকে পাবার আকুলতায় রেজওয়ান যখন মুগ্ধ সময় কাটায়, তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায় রণবীর সিংহ। যার লক্ষ্য ফুলেশ্বরীর রূপ-যৌবন। ফুলেশ্বরী চায় রেজওয়ানের মতো উদার মানুষের হাত ধরে মুক্ত জীবনে ফিরে যেতে। পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে ফুলেশ্বরী মুক্তি পায়। ঝড়বৃষ্টির রাতে রেজওয়ানকে নিয়ে আশ্রয় নেয় পাহাড়ে, এক অজানা সরফরাজ আলীর বাংলোতে। সরফরাজ আলী (শহীদুজ্জামান সেলিম) তার জীবনের গল্প শোনায় রেজওয়ানকে। পরিচালক এখানে ভাববাদী রেজওয়ানকে বাস্তববাদের সামনে দাঁড় করান। দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে রেজওয়ান ফুলেশ্বরীর প্রেমের চেয়ে তার বেঁচে থাকাটাই বড় করে দেখে। রেজওয়ান ফুলেশ্বরীকে রণবীর সিংহের (অমিত হাসান) কাছে ফিরে যেতে বলে। অপ্রত্যাশিতভাবে রেজওয়ান দ্বারা প্রত্যাখ্যান হওয়া, অবক্ষয়ী অতীত এবং নিষ্ঠুর বর্তমানের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফুলেশ্বরীর বর্ণবহুল জীবনটা বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। রাতভর দৌড়ে সকালে ফুলেশ্বরী পাহাড়ের সমতল চূড়ায় লুটিয়ে পড়ে। জীবনকে উত্তরহীন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় এবং আত্মহত্যা করে।
সিনেমা শুধু বিনোদন বা প্রমোদ বিতরণ নয়, মানবিক চেতনার খনন, পরিচালকের চিত্রভাবনায় এই সত্যটি দানা বাঁধে।
গল্পের আঙ্গিক অথবা ফর্ম পরিচালকের স্ব-অঙ্কিত। প্রথাগত গল্প বলার রীতি ভাঙতে পরিচালক একধরনের বিপ্লবীয়ানার সাহস দেখিয়েছেন। প্রথাগত বাণিজ্যিক সিনেমার ফর্মুলায় ফুলেশ্বরী নামক বাইজিকে নিয়ে রেজওয়ান ও রণবীর সিংহের মধ্যে রক্তপাত, রেজওয়ানের জমিদার পিতা কর্তৃক ফুলেশ্বরীর খুন হয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে পরিচালক ফুলেশ্বরী বাইজির আত্মহত্যা দেখিয়ে জীবনকে নতুন করে ইন্টারপ্রিটেশনের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সত্যের কাছাকাছি দর্শকদের নেবার চেষ্টা করেছেন। এখানেই চলচ্চিত্রটির অনন্যতা।
পদ্ম পাতার জল চলচ্চিত্রটির সৌন্দর্যসম্পদ সঠিক লোকেশন নির্বাচন, দৃশ্য পরিকল্পনা ও শিল্পীদের সাজপোশাক। পরিচালকের ক্যামেরা চোখের প্রসাদগুণে জমিদারদের প্রাচীন স্থাপত্যকলা জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। যদিও অত্যধিক ক্রেনটলির শট চলচ্চিত্রের নন্দনরসকে বিঘ্নিত করেছে। সামীরের সম্পাদনাও ছিল চলচ্চিত্র ভাষাসমৃদ্ধ। গান দৃশ্যের টেকিং এবং লোকেশন নির্বাচনে নৃত্য পরিচালকের শৈল্পিক উদ্ভাবনী মেধার প্রয়োগ লক্ষ করা গেছে।
কিন্তু পদ্ম পাতার জল চলচ্চিত্রটির প্রথম গানটি ছাড়া প্রতিটি গান গল্পের সময়কাল, মেজাজ এবং ক্ষেত্র থেকে সরে গেছে। দুর্বল গীত-সংলাপের কারণে গানগুলোর দৃশ্য, পোশাক এবং শট পরিকল্পনায় মুগ্ধকর সৌন্দর্য থাকার পরও দর্শকদের মনে আবেদন সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে।
শহীদুজ্জামান সেলিমের বাইরের চেহারা ও অন্তর রূপের অভিনয় পার্থক্য বেশ কারুময়। গল্পের গড়ন পদ্ধতিতে ততটাই অবহেলিত শক্তিমান অভিনেতা তারিক আনাম খানসহ চিত্রলেখা গুহ ও অমিত হাসান। শহীদুজ্জামান সেলিমের খড়ের চালের ডাকবাংলোর অন্দরে ওয়ালপেপার এবং বিদ্যুতের আলো গল্পের সময়কাল প্রেক্ষাপটে বেমানান মনে হতে পারে। পাহাড়ে রাতভর ঝুমবৃষ্টি হলে পরদিন পথঘাট জলে ভেজা থাকার কথা। দৃশ্যের অথবা সময়ের ধারাবাহিকতায়, কন্টিনিউইটির দাবিতে দেহসাজ ও রূপসজ্জা হওয়ার কথা। সেখানে দৃশ্যে দৃশ্যে ইমন ও মিমের পোশাক বদল অসংগতিপূর্ণ। যদিও আধুনিক চলচ্চিত্রনির্মাতারা বলছেন, জীবনকে ব্যাকরণ ও গাণিতিক ছকে বাঁধা গেলেও চলচ্চিত্রকে বাঁধা যায় না। তবু সিনেমায় কন্টিনিউইটি বা ধারাবাহিকতার সুনির্দিষ্ট মূল্য অস্বীকার করার উপায় নেই।