বিটিভির ৫০ বছর

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভবনজুড়ে এখন সাজ সাজ রব। বদলে গেছে টিভির পর্দা। যুক্ত হয়েছে নানা অনুষ্ঠান। সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে লিখেছেন আদর রহমান

বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন

সব হবে বাংলায়
১৯৬৪ সালের ১ এপ্রিল, তখনো ঢাকা টেলিভিশনের যাত্রা হয়নি। তখনো এটি কাগজে-কলমে ছিল এনইসি টেলিভিশন গ্রুপ। সে সময় সেখানকার কেন্দ্রের অধক্ষ্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় জামিল চৌধুরীকে। দিন কয়েক পর এনইসি টেলিভিশন গ্রুপ হয়ে যায় ঢাকা টেলিভিশন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় ছাপা হয় জামিল চৌধুরীর একটি উদ্ধৃতি। এতে তিনি জানান, ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় পরীক্ষামূলক টেলিভিশন কেন্দ্র চালু হবে। ছায়াছবি ব্যতিরেকে ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের সব অনুষ্ঠান বাংলায় প্রচার করা হবে। এর পর থেকে এ নিয়ে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি দানা বাঁধতে থাকে। কিন্তু সব বাদানুবাদ শেষে ঢাকা টেলিভিশনে বাংলায় অনুষ্ঠান প্রচার থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজগুলোও হতে থাকে বাংলায়। জামিল চৌধুরী আরও জানান, এ কাজে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলায় চিঠিপত্র লেখা থেকে শুরু করে, চেকেও বাংলা লেখার প্রচলন শুরু হয় ঢাকা টেলিভিশনে।

মুনীর চৌধুরীর সাহায্যে বঙ্গানুবাদ
এখন রাস্তাঘাটে চলতে গেলে বিশেষ কিছু জায়গায় আমরা লেখা দেখি ‘নো স্মোকিং’, যার পাশেই আবার বাংলায় লেখা থাকে ‘ধূমপান নিষেধ’। এটা কিন্তু শুনতে অনেকটা খবরদারি বা নির্দেশসূচক ভাব প্রকাশ পায়। তাই নো স্মোকিংকে মার্জিত বাংলা লেখা যেতে পারে ‘ধূমপান বারণ’। কথাটা কিন্তু নতুন নয়। এমনটা প্রস্তাব করেছিলেন শহীদ মুনীর চৌধুরী। ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলায় রূপান্তর নিয়ে দেখা দেয় একটু জটিলতা। সেসব ইংরেজি শব্দের বাংলা রূপ খুঁজতে খানিকটা বেগ পেতে হচ্ছিল সবার। তখন নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এগিয়ে আসেন কিছু বাংলা শব্দ নিয়ে। তিনি ‘অন এয়ার’-এর বাংলা করেন ‘প্রেরণরত’, ‘রিহার্সেল অন’-এর বাংলা দেন ‘মহড়ারত’ আর ‘রেকর্ডিং অন’-এর বাংলা করেন ‘ধারণরত’। এভাবেই তিনি নো স্মোকিংকেও ধূমপান বারণ হিসেবে লেখার পরামর্শ দেন। তা ছাড়া ‘সাইলেন্স’কে তিনি ‘নীরব হন’ বলে উল্লেখ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ইংরেজি শব্দগুলো যেন বাংলায় রূপান্তরের পর খবরদারির মতো না শোনায়, সেদিকে বিশেষ নজর ছিল তাঁর।

যত গান...
‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ/ সে শুধু তোমার প্রেমে/ ওই যে বাতাস বাঁশি হলো আজ,/ সে শুধু আমার প্রেমে...’, ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাতটা ফেরদৌসী রহমানের এ গানটি দিয়েই শুরু হয় প্রথম গানের অনুষ্ঠান। গানটি লিখেছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। সুর করেছিলেন আনোয়ারউদ্দীন খান। এরপর তিনি গাইলেন একটি ভাওয়াইয়া গান। এর আগে পরীক্ষামূলক প্রচারের অংশ হিসেবে দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন ‘এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি বিজন ঘরের কোণে, এসো গো’ গানটি। উদ্বোধনের পরদিন ছায়ানটের গোষ্ঠী অনুষ্ঠানে গাওয়া হয় রবীন্দ্রসংগীত, ছিল নাচের আয়োজনও। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রথমে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন জাহেদুর রহিম (‘পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোনখানে তোমার পরশ আসে’ গানটি) ও ফাহমিদা খাতুন (‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়’ গানটি)। ওই অনুষ্ঠানে নাচের গান হিসেবে ছিল ‘আমার এই রিক্ত ডালি’। মন্দিরা নন্দী ওই নাচ পরিচালনা করেছিলেন, জানান সন্জীদা খাতুন।

নাটক ‘একতলা দোতলা’
ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম নাটক ছিল একতলা দোতলা। এর নাট্যকার শহীদ মুনীর চৌধুরী। প্রযোজক শহীদ মনিরুল আলম। ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টিভিতে সেই নাটক প্রচারিত হয়। নাটকে অভিনয় করেছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার। একতলা দোতলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম নাটকের মহড়া হয়েছিল এক মাস। প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা করে বিরতীহীনভাবে মহড়া দিতে হয়েছিল আমাদের। তখন রেকর্ডিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই গোটা নাটকটি নির্ভুলভাবে মুখস্থ কী করে হবে, সেটা আমাদের এটি বিরাট ভাবনা ছিল। কিন্তু একতলা দোতলা হয়ে যাওয়ার পর সে ভাবনা দূর হলো।’
টেলিভিশনের প্রথম নাটক নিয়ে কবি সুফিয়া কামাল বলেছিলেন, ‘ঢাকা টেলিভিশনে দেখা প্রথম গান কিংবা আবৃত্তির কথা মনে নেই। কিন্তু প্রথম নাটক শহীদ মুনীর চৌধুরীর একতলা দোতলার কথা মনে আছে। আমাদের যে কী আনন্দ ও উৎসাহ দিয়েছিল নাটকটি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অল্প পরিসরে ডিআইটি ভবনে কত পরিশ্রম ও অসুবিধার মধ্য দিয়ে সে উৎসব সার্থকতায় পরিপূর্ণ হয়েছিল।’

ঢাকা টেলিভিশনে শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আগে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। ঢাকা টেলিভিশন চালু হওয়ার পর স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান প্রচার ছিল এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। ঢাকা টেলিভিশন সেই কাজ করেছে সফলভাবে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টেলিভিশনে একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তবে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ সেলিমদ্দিন আহমদের কাছ পিন্ডি থেকে হুকুম আসে একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংগীত নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে। কিন্তু সে সময় ঢাকায় চলছিল কারফিউ। তাই অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টেলিভিশনকর্মীদের সেবার আয়োজন করতে হয় শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘হাজার বছরের বাংলা গান ও কবিতা’ নামে একটি অনুষ্ঠান করেন ওই বছর।

নৃত্যনাট্য ‘উদয়াচলের পথে’
তৎকালীন অনুষ্ঠান প্রযোজক বরকতউল্লাহ বাংলাদেশ টেলিভিশন নিয়ে তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেন উদয়াচলের পথে ছিল ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম দিককার নৃত্যনাট্য। এই নৃত্যনাট্যের জেলে চরিত্রে ছিলেন জিনাত আলী পলি, অর্থাৎ বর্তমানের জিনাত বরকতউল্লাহ। নৃত্যনাট্যটি প্রথম মঞ্চায়ন করা হয় বঙ্গভবনে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে। এর পরই তা রেকর্ড করা হয় ঢাকা টেলিভিশনে প্রচারে জন্য।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর (১৯৬৪ থেকে ১৯৮৯)