default-image
>

গত শুক্রবার দেশের ৮১টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে শাকিব খান অভিনীত কাজী হায়াতের ৫০তম সিনেমা ‘বীর’। মুক্তির আগে থেকে ছবিটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও মুক্তির দ্বিতীয় দিন থেকে দর্শক কমা শুরু হয়েছে ছবিটির। ছবিটি নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ হলেও নির্মাণে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছেন তিনি। আবার ‘বীর’ ছবির আলোচনা শেষ না হতেই শাকিব খানের কাছ থেকে আরেকটি ছবির প্রস্তাব এসেছে, সে ব্যাপারে বলেছেন কাজী হায়াৎ। ১৭ ফেব্রুয়ারি মান্নার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। স্মরণ করে মান্নাকে নিয়ে অনেক কথা বলেছেন এই গুণী নির্মাতা।

‘বীর’ করার পরিকল্পনা কবে থেকে?
তা–ও বছর দেড়েক হবে। একদিন হঠাৎ করেই শাকিব খান ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার ইকবাল আমাকে প্রস্তাব দিল, তারা আমাকে দিয়ে একটি ছবি নির্মাণ করতে আগ্রহী। মানে আমার ৫০তম ছবিটি প্রযোজনা করতে চায় তারা। তা ছাড়া এর আগে শাকিবকে নিয়ে আমার কোনো কাজ হয়নি। এ কারণে শাকিবের আগ্রহটা বেশি ছিল। আমিও দেখলাম শাকিবকে নিয়ে একটি কাজ হতেই পারে। ৫০তম ছবিটিই করার পরিকল্পনা শুরু করলাম। এর মধ্যে আমি অসুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলাম। এর প্রায় বছর দেড়েক পর ‘বীর’ ছবির কাজ শুরু করি। যদিও এই ফাঁকে তারা ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিটি করেছে।

যে প্রত্যশা নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেছেন, কতটুকু পুরণ হয়েছে বলে মনে করেন?
স্ক্রিনে একটু দরিদ্রতা দেখা গেছে ছবিটির। গল্প অনুযায়ী উপযুক্ত জায়গায় শুটিং করা যায়নি। আউটডোরে পুবাইলের লোকেশন ছিল। সেখানে আর পাঁচটি দিন করতে পারলে ভালো হতো। এফডিসিতে চলে এসে পর্দায় পরিসরটা কমে গেছে ছবির মধ্যে। তবে কিছু প্রতিবন্ধকতাও ছিল। কারণ, ছবির মধ্যে ভোটের আয়োজন, মিছিল মিটিং—এগুলো পুবাইলে লোক পাওয়া যেতে না। আবার ঢাকার থেকে এত লোকজন নিয়ে যাওয়াটাও অনেক খরচের ব্যাপার ছিল। এ কারণে ওই সব দৃশ্য বাধ্য হয়ে এফডিসিতে করেছি।

default-image


তাহলে ছবির বাজেট সমস্যা ছিল নাকি?
এই ছবিতে বাজেট অনেক কম। শাকিবের পারিশ্রমিক ছাড়া শুটিং ম্যানেজারের কাছ থেকে শুনেছি, শুটিংয়ের শেষ দিন পর্যন্ত মোট খরচ ৭২ লাখ টাকার কিছু বেশি। এরপর সেন্সর ও মুক্তির সময়কার খরচ আছে। আমার মনে হয়, শাকিবের পারিশ্রমিকসহ মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে এই ছবিতে।

যা–ই হোক, ছবিটি দেখে দর্শক কী বলছে?
দর্শক অনেক খুশি। তাঁদের কথাবার্তায় মনে হয়েছে, অনেক দিন পর ভালো একটি ছবি দেখলেন তাঁরা। সিনেমার ভাষায় বলতে হয়, অনেক খরার পর বোধ হয় বৃষ্টির ফোঁটা এসেছে সিনেমায়। এতে দর্শকেরা সন্তুষ্ট হয়েছেন। সিনেমা তো এখন হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয়, এই ছবিতে কোনো দর্শকই নিরাশ হননি, হতাশ হননি। তাঁদের ভালো লাগার মতো কিছু আছে এই ছবিতে।

এ কয়েক দিনে অনেকগুলো হলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম দিনে ছবিটি ভালো গেছে। এরপর থেকে দর্শক কমছে। আপনার কাছে কি মনে হয়েছে ছবিটি সফলতার পথে?
আপনি যেটা বলছেন, এভাবে আমি শুনিনি। তবে এই ছবিকে সুপারহিট বলা যায়। হয়তো দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে না। কারণ, এখন মানুষ বেকার কম। সবারই কাজ আছে। তবে এই ছবিতে দর্শক আসছেন। ভালো ছবি বানালে দর্শক আসবেন। তা ছাড়া কাজী হায়াতের ৫০তম ছবির সঙ্গে শাকিবের ক্রেজটাও কাজে দিয়েছে এই ছবিতে।

default-image


এই আগ্রহ দর্শকদের কত দিন থাকবে বলে আপনার মনে হয়?
অনেক দিনই থাকবে। ইতিমধ্যে মুখে মুখে প্রচার শুরু হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী ঈদ পর্যন্ত এই ছবি চলবে। এমনকি ঈদ উৎসবেও কিছু কিছু হল এই ছবি চালাবে।

‘বীর’ মুক্তির পর শাকিব খানের সঙ্গে কথা হয়েছে?
হ্যাঁ, দুই দিন আগে ফোন দিয়েছিল। ছবি নিয়ে আলাপ হলো। ছবির সফলতা নিয়েও আলাপ হলো। বোঝা গেল, তার ধারণা ছিল ছবিটি দর্শক সফলতা পাবে না। কিন্তু ধারণা পাল্টে গেছে বলে আমাকে জানাল। সে খুব খুশি ছবিটি নিয়ে। তার কথা শুনে আমারও ভালো লেগেছে।

আপনি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখেছেন?
না, এখনো দেখিনি। কিন্তু প্রতিমুহূর্তেই ছবির খোঁজখবর রাখছি। আশা আছে ২১ ফেব্রুয়ারি যেকোনো একটি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখব। আশা করছি, বিশেষ দিনটিতে দর্শকের উপস্থিতিও বাড়বে।

আপনার ছবিতে চলমান রাজনীতির বিষয় থেকে শুরু করে মাদক, ইভ টিজিংসহ নানা রকমের সামাজিক অসংগতিগুলো উঠে আসে। এ ধরনের বিষয়গুলো বেছে নেন কেন?
আমাদের সিনেমায় দেখা যায় একজন বড়লোকের মেয়ে একজন গরিবের ছেলের সঙ্গে প্রেম করছেন। মাঝখানে মেয়ের মামাতো, নাহয় চাচাতো ভাই এসে মারপিট করল। ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধ চলতে থাকল। একদম শেষে এসে দেখা গেল প্রেমের জয় হলো। দর্শক তা দেখে হল থেকে বেরিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। কী পেলেন তাঁরা সিনেমা থেকে? এ ধরনের গল্পের সিনেমা হারহামেশাই হচ্ছে। সমাজের কথা, মানুষের কথা, দেশের কথা—এর মধ্য দিয়ে বিনোদন। কজন বলেন এসব কথা? কিন্তু আমি সেই গোড়া থেকেই বলার চেষ্টা করেছি। সমাজের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতার বোধ থেকেই এই কাজ করে যাচ্ছি আমি।

default-image


সম্প্রতি ঢাকা ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এটিই হয়তো আমার জীবনের শেষ ছবি।’ হঠাৎ করে এমনটি ভাবছেন কেন?
মরে গেল তো আর বানাতে পারব না। এই ভাবনা থেকেই বলেছি। যদি বেঁচে থাকি, তাহলে হয়তো কাজ হতে পারে। শাকিব তার আরেকটি ছবিতে কাজের কথা বলেছে। আমি বলেছি, মাথা থেকে ‘বীর’ নামালাম। এরপর দেখি কী করা যায়। কারণ, আমি পরিকল্পনা করে কাজ করি। গল্প মাথায় আসা থেকে শুরু করে লেখা, এরপর নির্মাণে যাওয়া পর্যন্ত অনেকবার গল্প ও সংলাপ পরিবর্তন করতে হয়, করি। এ কারণে আমার ছবির ক্ষেত্রে সময় লাগে। কিন্তু শাকিব তাড়াতাড়িই আমার সঙ্গে আরেকটি কাজ করতে চাইছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি মান্নার মৃত্যুর ১২ বছর পার হলো। ঢাকার চলচ্চিত্রে আপনার সঙ্গে মান্নার একটি ভালো রসায়ন ছিল। অনেক জনপ্রিয় ছবির জুটি আপনারা দুজন। মান্নাকে নিয়ে কাজের শুরুর দিকের কথা বলবেন কি?
‘পাগলী’ মান্নাকে নিয়ে আমার প্রথম ছবি। ৮৫ সালের দিককার কথা। সে সময় ছবিটি মোটামুটি চলেছিল। এরপর তাঁকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। ডাবিং পারত না, অভিনয়ে কাঁচা—এসব কারণেই তাঁকে বাদ দিয়েছিলাম। এরপর ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে ‘দায়ী কে’ করলাম। ‘দায়ী কে’ হিট হলো। কিন্তু মান্না আমার পেছনে লেগেই থাকল, লেগেই থাকল। ‘দায়ী কে’র পরের ছবিটি করার পরিকল্পনা করছিলাম, ওই সময় মান্না এসে আমাকে অনুরোধ করল, তাঁকে নিয়ে যেন আরেকটি ছবি করি। তাঁকে নিয়ে ‘যন্ত্রণা’ নামের একটি ছবি করলাম। সুপারফ্লপ হলো ছবিটি। অভিসার সিনেমা হলে দেখতে গেলাম। হলের এক টিকিট কালোবাজারি কাছে ছবির কথা জানতে চাইলাম। সে বলল, ‘স্যার, আপনি ওই যে দাড়িওয়ালা মন্নান না কী যেন নাম, তাঁরে নিছেন, তাঁরে বাদ দিয়া যদি ইলিয়াস কাঞ্চনরে নিতেন, আপনের ছবি হিট হইয়া যাইত স্যার।’

তারপর কী করলেন?
এরপরও পিছু ছাড়েনি মান্না। ছেলেটার জন্য মায়া হচ্ছিল। বাদ না দিয়ে আরেকবার ঝুঁকি নিয়ে ‘দাঙ্গা’ বানালাম। সুপারহিট হয়ে গেল ছবিটি। ‘দাঙ্গা’ ছবির পর সে পায়ের নিচে মাটি পেল। পরের ছবি ‘ত্রাস’। সেটিও হিট হলো। এরপর মান্না ঢাকার চলচ্চিত্রে দাঁড়িয়ে গেল। এরপর ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’, ‘কষ্ট’, ‘আম্মাজান’সহ একাধিক ছবি হিট হয়। মান্নাকে নিয়ে ২০টির মতো ছবি করেছি।

default-image


শোনা যায় মান্না আপনাকে বাবা বলে ডাকতেন। সত্যি কি?
সে আমাকে সব সময়ই বাবা বলে ডাকত। তার কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল। আমার প্রতি তার বেশিই ছিল সেই বোধটা। সম্ভবত সে অনুভব করত, কাজী হায়াৎ না হলে তার সিনেমায় এই জায়গায় আসা হতো না। সিনেমাতে তাকে আমি দুবার জন্ম দিয়েছি।

কেমন?
‘দেশদ্রোহী’ ছবিটি দিয়ে তাকে আমি এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম। ‘দেশদ্রোহী’ করার পর মান্না অভিনেতা হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়ে গেল। তার কারণ হলো, ওকে দিয়ে দ্রুত কোনো সংলাপ বলানো যেত না। শুদ্ধ করে কথা বলতে দিলেই বেধে যেত, আটকে যেত। ‘দেশদ্রোহী’ ছবির পাঁচ-ছয় দিন শুটিং হয়ে গেছে। আমি মান্নাকে বললাম, তুমি তোমার দেশের বাড়ি টাঙ্গাইলের ভাষায় কথা বলো। দ্রুত কথা বলতে পারো কি না, দেখি। একটি সংলাপ বলতে বললাম। দেখি দ্রুতই বলতে পারছে। তখন তাকে বললাম, শুদ্ধ ভাষায় না, তুমি তোমার ভাষায় সংলাপ দাও। এভাবে ছবিটি শেষ করলাম। ছবিটি সুপারহিট হলো। ছবিটি দেখে মান্নাকে একজন ভালো অভিনেতার স্বীকৃতি দিল সবাই। তার আগে ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘তেজী’—এসব ছবি হিট হলেও ভালো অভিনয়ের তকমাটা তার লাগছিল না।

প্রায়ই মনে পড়ে, মান্নার সঙ্গে আপনার এমন কোনো স্মৃতির কথা বলবেন কি?
কষ্টের স্মৃতি এটি। তখন সে তারকা। মান্নার সঙ্গে আমার শেষ ছবি ‘মিনিস্টার’-এর শুটিং চলছিল। রাত আটটা পর্যন্তও তখন সে সেটে আসেনি। আমি শুনতে পেলাম, কোনো একটি ছবির গানের রেকর্ডিংয়ে মান্না। আমি শুটিং প্যাকআপ করে দিয়েছি। এরপর মান্না এসে বলল, রাস্তায় জ্যাম ছিল, এ কারণে আসতে দেরি হয়ে গেছে। চলেন শুটিং শুরু করি। আমি বললাম, তুমি কোথায় ছিলে? মান্না বলে, রাস্তায় জ্যাম ছিল, এ কারণে দেরি হয়ে গেছে। আমি বললাম, না, তুমি ছবির গানের রেকর্ডিংয়ে ছিলে। মান্না বলে, ‘না, আমি যাইনি।’ বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ, মান্না। আমি শুটিং করব না। ছবিই বন্ধ করে দেব। এরপর আমি বললাম, চলচ্চিত্রের মান্নার সমস্তটুকু আমার। আর কারোর কোনো শেয়ার নেই। আর আমার ছবিতে দেরি করে এসে তুমি মিথ্যা বলছ? পরিচালক সমিতির সামনে এই ঘটনা। তখন মান্না আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। খুব মনে পড়ে কথাগুলো। মান্নাকে খুব বেশি মনে পড়ে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন