মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রযাত্রা

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

মে মাসে ৯৪ বছর পূর্ণ হলো চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনজন প্রধান কারিগর বললে তাঁর নামটি ভাসে উজ্জ্বল হয়ে। শুধু সিনেমা নির্মাণই নয়, বিশ্ব দরবারে বাংলা সিনেমা পরিচিতি করাতে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর কর্মজীবন নিয়ে লিখেছেন চলচ্চিত্র গবেষক সাজেদুল আউয়াল

মৃণাল সেন
মৃণাল সেন

বিশ্ববরেণ্য বাঙালি চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন অবিভক্ত পূর্ব বাংলার ফরিদপুরে ১৪ মে ১৯২৩ সালে জন্মেছেন। মে মাসে তাঁর ৯৪ বছর পূর্ণ হলো। জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসেবে তাঁর শিরে ৯৪ বার কুমার নদের জল সিঞ্চন করছি, যে নদের তীরে একদা তিনি জন্মেছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৫৫ সালে রাতভোর নির্মাণের মাধ্যমে। ২০০২ সালে আশি বছর বয়সে নির্মাণ করেন শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আমার ভুবন। ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ৪টি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ৬টি চলচ্চিত্রবিষয়ক মৌলিক গ্রন্থও লিখেছেন।
ভারতীয় প্যারালাল সিনেমার পুরোধা ব্যক্তি তিনি। গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে শুরু করে নয়ের দশক এবং শূন্য দশকের পশ্চিম বাংলার সমাজকাঠামোর নানা সংকট থেকেই তিনি তাঁর অধিকাংশ চলচ্চিত্রের বিষয় বেছে নিয়েছেন। তাঁর চলচ্চিত্রসমুদয়, দু-একটি বাদে, তাঁর সময়ে ঘটতে থাকা সমাজ-ইতিহাসের চলচ্চিত্রায়ণই বটে।
রাজনীতির দীনতা, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, সমাজ-সংসারে নারীর অধস্তন অবস্থান, নারীর মনোলোক, ব্যষ্টির নৈঃসঙ্গ্য, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নগরায়ণের অসম্পূর্ণতাজাত নানা সমস্যা, মানবসভ্যতার নানামুখী সংকট, শ্রমিক-কৃষক-আমলা-প্রান্তজন—সব তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয়-চরিত্র হয়ে এসেছে।
সমকালীন সমাজবাস্তবতা থেকে বিষয় বেছে নিলেও নির্মিত চলচ্চিত্রে বাস্তবতার টানা রূপায়ণ করতেন না, নানা ধরনের সিনেমাটিক ডিভাইস ব্যবহার করে বাস্তবতাকে ভেঙে দিতেন। এই ভাঙচুরের কাজে তিনি পরাবাস্তববাদ ও জার্মান অভিব্যক্তিবাদী শিল্পদর্শনকে ব্যবহার করেছেন। বাস্তবকে তিনি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করেই চলচ্চিত্রের কাহিনি-কাঠামোতে স্থান করে দিয়েছেন। বক্তব্যের কাঠামোকে শান দিয়েছেন মার্ক্সবাদ, অস্তিত্ববাদের সারাত্সার দিয়ে।
তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয়-কাহিনি ব্যষ্টিকে দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তাতে সমাজের সমষ্টির অন্যান্য প্রসঙ্গও এসে গেছে। বস্তুত ব্যষ্টিসত্তার দ্বন্দ্বকে এক বিশেষ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করেই সমাজের সার্বিক মুক্তির উপায়ের সন্ধান তিনি করে গেছেন তাঁর চলচ্চিত্রসমগ্রে। এই প্রবণতাই তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক-প্রতিবাদী চলচ্চিত্রের প্রবক্তা হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে।
বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক কাহিনির কারণেই মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের আঙ্গিক সতত নিরীক্ষাপ্রবণ। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মিতির ধাঁচে ইতালীয় নব্যবাস্তববাদের অভ্যন্তরীণ উপকরণ ও ফরাসি নবতরঙ্গের প্রভাব পড়েছে; চেখভ্-ব্রেখট্-চ্যাপলিনের গল্প-নাটক-চলচ্চিত্র উপস্থাপনের রীতির উপস্থিতিও টের পাওয়া যায়।
উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজবাস্তবতায় মানবদরদি শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি নিজের অজান্তেই স্ব-সময় ও সমাজের কথক হয়ে উঠেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রের শেষে কোনো একক সমাধানের সন্ধান মেলে না। তিনি দর্শকের ওপর ছেড়ে দেন সমাধান খুঁজে নেওয়ার ভার। এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি দর্শককে যুক্ত করেন নির্মিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে; দর্শক পরিণত হন চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। এই প্রক্রিয়ায় দর্শক তাঁদের ভাবনাবলয়ের আদলে নানামুখী সমাধানের কথা ভাবার সুযোগ পান।
ব্যষ্টি ও সমষ্টির জীবন বিপন্ন হলে তাঁদের জীবনে নেমে আসে সংকট, সেই সংকটকালীন মুহূর্তেই তাঁরা সবচেয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম—ঠিক এ রকমই একটি দার্শনিক মতবাদ তাঁর প্রায় সব চলচ্চিত্রে ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করতেন মধ্যবিত্ত শ্রেণিই রাজনৈতিক আন্দোলনের নিয়ন ও নেতৃত্বদানকারী। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় হলেও তিনি কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির চেতনালোককেও বুঝতে চেয়েছেন, তাঁরাও যে নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বে ভূমিকা রাখবে, এ কথাও বিশ্বাস করতেন।
মৃণালের দায় শুধু সমাজের প্রতিই নয়, শিল্পের প্রতিও। নিজস্ব শিল্পভাবনার আলোকে নব চলচ্চিত্রাঙ্গিকের সন্ধানে সর্বদাই তাই নিরীক্ষামুখর। তাঁর চলচ্চিত্রে চিহ্ন-প্রতীকের উপস্থিতি প্রবল। নান্দনিক সৌকর্যের প্রলেপ দিয়েই তিনি সমাজসত্যের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন তাঁর চলচ্চিত্রসমূহে। তিনি সর্বদাই কাহিনির কৃত্রিম কাঠামো ভেঙে দিয়েছেন। বিষয়ের ভিন্নতার কারণে চলচ্চিত্রাঙ্গিক বদলেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে কাহিনির চেয়ে বক্তব্য ও চরিত্রের মনোজগৎ প্রাধান্য পেয়েছে বেশি—টুকরো টুকরো বাস্তব দৃশ্য ও শব্দ দিয়েই বক্তব্যকে প্রকাশ করেছেন।
মৃণাল সেন সময়ের তাড়া খেয়ে নিজেকে বদলে বদলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে করতে এগিয়ে গেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা থেমে গেলেও তাঁর চলচ্চিত্রের চর্চা কখনো থামবে না।