
পাপ্পুকে নিয়ে এভাবে লিখতে হবে, এটা কখনোই ভাবিনি। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। মাঝেমধ্যে তাকে একটি বিখ্যাত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের নাচের দলে নাচতে দেখা যায়। তার ইচ্ছা, সে কৌতুক অভিনেতা হবে, কিন্তু নিজের লেখা কোনো কৌতুক নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম, তাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। তার পরিবেশনার ভঙ্গি সুন্দর। এটা দেখে তার জন্য একটা কৌতুক লেখা হলো। কিন্তু টেলিভিশনের তখনকার মহাব্যবস্থাপক ও স্টেশন-প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের অনুমতি আবশ্যক তাকে স্ক্রিনে দিতে। আমি পাপ্পুকে নিয়ে গেলাম পরীক্ষা দেওয়াতে, মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের ইস্কাটনের বাসায়। অনুমতি মিলল। তবে ভালো না হলে, পরের অনুষ্ঠানে বাদ। দায়িত্ব নিলাম আমি, পাপ্পু রোজ আমি যেখানে থাকি সেখানেই চলে আসে, আর মহড়া করে। তার চেহারার মধ্যেই একধরনের মজা আছে, দর্শক তাকে পছন্দ করলেন। তারপর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘শুভেচ্ছা’তে তার নিয়মিত উপস্থিতি। প্রতি মাসে ‘শুভেচ্ছা’ দেখানো হতো, মাঝেমধ্যে দুয়েকবার বাদ পড়লে তার অভিমানের সীমা থাকত না।
এরপর ঈদের বিশেষ ‘শুভেচ্ছা’য় ঈদের সময় মার্কেটে দুই বান্ধবীর দেখা হলে কীভাবে বলে, ‘আরে তুই!’ এই কৌতুকের পরে এটা মুখে মুখে ফিরতে থাকল। আর তার প্রথম ক্যাসেট বের হলো। যার অধিকাংশ কৌতুকই আমার লেখা। এরপর সে একটা বিজ্ঞাপন করতে চায়। তার ধারণা, সিনেমা আর বিজ্ঞাপন না করলে তারকা হওয়া যায় না। সুযোগ দিলেন আমার বন্ধু শওকত। লবণের বিজ্ঞাপনে ‘দাদখানি চাল মসুরের ডাল, লবণটা কী?’ পাপ্পু এরপর ডাক পেল সিনেমায়। তার খুশি আর দেখে কে?
‘শুভেচ্ছা’র জনপ্রিয়তাও বাড়ছে, অনুষ্ঠানে যাঁরা আসেন, তাঁদেরও জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। পাপ্পু দেশ-বিদেশে স্টেজ শো করতে শুরু করল। তবে তার সব খুশির উদ্যাপন ছিল খাবার। তেহারি, বিরিয়ানি, পরোটা, কাবাব, পোলাও, রোস্ট। শুটিংয়ে ভর্তা-ভাজি দেখলেই আমাদের প্রোডাকশন ম্যানেজার সামিউল ভাইকে বলত, ‘এগুলা কি মানুষে খায়, এগুলা তো ঘাস। আমি তেহারি নিয়া আসুম কাইলকা।’ লালবাগের চোস্ত ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলত পাপ্পু। মোটরসাইকেল কিনুক আর টেলিভিশন, আমাকে তার ফোন করে সুসংবাদ দেওয়া চাই।
একবার রাস্তায় তাকে ছিনতাইকারী ধরে চিনতে পেরে তার ঘড়িটা না নিয়ে বলেছে, যান, চোখে মলম দিলাম না। সে এসে আমাকে সালাম দিয়ে বলে, ‘আপনার জন্য হাইজ্যাকারভি আমারে চেনে। চোখটা বাঁচল, ঘড়িটাও বাঁচল। চোখ গেলে ঘড়িতে টাইম দেখতাম কেমনে?’
শেষবার সে আমার অনুষ্ঠানে কাজ করেছে বিটিভিতে ‘আনন্দমেলা’য়। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে সারাক্ষণ মঞ্চের সামনের দর্শকদের হাসিয়েছে। সেগুলো অনুষ্ঠানের অংশ ছিল না। ব্যস্ত শিল্পী পাপ্পুকে কখনো মধ্যরাতে অনুষ্ঠান করতে ডাকলেও সে আমাকে না করেনি। পাপ্পু চেয়েছিল শিল্পী হতে।
ইদানীং যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। তারপরও সে ফোন করলে আমি প্রথমেই তাকে চিনে ফেলে বলতাম, বলো, পাপ্পু। সে খুব আনন্দিত হয়ে বলত, ‘যাক, আপনে পাপ্পুরে ভুলেন নাই!’
পাপ্পুকে কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? ‘শুভেচ্ছা’ জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যখন, তখন আমি পাপ্পুকে কাঁদতে দেখেছিলাম। আমাকে সে বলছিল, ‘আমি এখন কোন অনুষ্ঠান করুম, তুষার ভাই?’
আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম, পাপ্পু, মানুষ তোমাকে ভুলবে না। তুমি তো এখন স্টার।
আজকেও বলি, সবাই ভুলে গেলেও আমি পাপ্পুকে ভুলব না। এই লেখাটা লেখার সময় আমার মনে হচ্ছে, পাপ্পু হেসে বলছে, ‘যাক, আপনে পাপ্পুরে ভুলেন নাই। যাই দুই প্যাকেট তেহারি লিয়া আহি।’