default-image
>আজ সত্যজিৎ রায়ের শততম জন্মদিন। ১৯২১ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর প্রতি এই শ্রদ্ধার্ঘ্য

সত্যজিৎ রায় আমাদের বাড়িতে প্রথম ঢোকেন ‘বাক্স রহস্য’ হয়ে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ বা আশির দশকের শুরুর কোনো একদিন আমার অনুজ জন্মদিনে উপহার পেয়েছিল এই বই। ফেলুদা সেদিন থেকেই আমাদের আত্মার আত্মীয়। তবে ‘দেশ’ আর ‘আনন্দমেলা’র মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় যে আমাদের জীবনে নিয়মিত হয়ে উঠবেন, সেটাও জানা গেল কদিন বাদে। পুরনো পুজোসংখ্যাগুলো নতুন করে ওল্টালেই পাওয়া যেতে লাগল শঙ্কু আর ফেলুদাকে। এ যেন নতুন এক রত্নের খনি। তখনো ভিসিআর আসেনি দেশে। বিদেশি চলচ্চিত্র দেখার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন আর ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের পথ ধরে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসই ভরসা। আশির দশকের শুরুতে আমরাও যুক্ত হয়ে পড়লাম ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে। এনজয় ফিল্ম সোসাইটি আর পাইওনিয়ার ফিল্ম সোসাইটির তরুণ অগ্রজেরা আসতেন আমাদের বাড়িতে, আমার মেজ ভাই শাহীন রেজা নূরের কাছে। তিনি ছিলেন এই দুই ফিল্ম সোসাইটির সহসভাপতি।

default-image

সে সময়েই ভারতীয় সংস্কৃতি কেন্দ্রে সত্যজিৎ রায়ের তৈরি ছবি দেখার সুযোগ ঘটে। প্রথমে ‘তিন কন্যা’, তারপর ‘সৎরঞ্জ কা খিলাড়ি’র মাধ্যমে পরিচয়। এরপর বাড়তে থাকে জানা–বোঝার পরিধি। উচ্চমাধ্যমিকের কোনো এক সময়ে দেখে ফেলি ‘চারুলতা’। আর চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের নানা আলোচনা থেকে বুঝতে শুরু করি সত্যজিতের ছবিগুলোর নান্দনিকতা। মনে আছে, ধানমন্ডি দুই নম্বরের সেই এল প্যাটার্নের বাড়িটায় একের পর এক সিনেমা দেখেছি। সেখানেই একবার সত্যজিৎ রায় রেট্রোসপেকটিভ হলো। ওয়াহিদুল হক অতিথি হয়ে এসে বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি ঠিক জায়গায় থামতে জানেন।’ এ কথা আমার খুব মনে আছে। ‘ভারত বিচিত্রা’য় এই বিষয়টি নিয়ে একটি ফিচার লিখেছিলাম, মনে পড়ে।

‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি এসেছিল এরশাদ আমলে, কোনো এক চলচ্চিত্র উৎসবে। আনন্দ সিনেমা হলে সে ছবি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু মিসকমিউনিকেশনের কারণে টিকিট পাইনি। খুব মন খারাপ হয়েছিল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই টেলিভিশনে দেখেছিলাম সে ছবি। আমাদের বড় ভাইয়ের বন্ধু আজাদ ভাই পুরো সিনেমাটাই স্টেরিওতে ক্যাসেটবন্দি করেছিলেন। মাঝেমধ্যেই সে ক্যাসেট শুনতাম আমরা। এবং হ্যাঁ, পুরো সিনেমাটাই আমাদের মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মতো অসংখ্য মানুষের মুখস্ত ছিল সংলাপগুলো। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’ স্লোগানটার ব্যবহার ছিল সে সময়।

default-image

কেমন সত্যজিৎ?

আমরা যারা সাধারণ দর্শক, চলচ্চিত্রের কারখানায় গিয়ে কাটাছেঁড়া করার যোগ্যতা নেই যাদের, তারা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আর লেখালেখিতে বরাবর আনন্দ পেয়ে থাকি। এরপরও যখন সত্যজিতের চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো বোদ্ধা কোথাও কিছু লেখেন, তখন তা আগ্রহ নিয়েই পড়ি। কেউ কেউ সত্যজিতের চলচ্চিত্রজীবনকে দুভাগে ভাগ করেন, কেউ কেউ কোন পরিচালকের কোন চলচ্চিত্র থেকে সত্যজিতের কোন চলচ্চিত্র প্রভাবিত হয়েছে, সে বিষয়ে জানান, কেউ সত্যজিতের হয়ে ওঠার গল্প শোনান। সবকিছু্ই আমাদের ভালো লাগে। প্রশ্ন করা না হলে জানার সুযোগ ঘটে না। সবকিছুই অন্ধবিশ্বাসে মেনে নিলে জিজ্ঞাসাগুলোও আস্তে আস্তে মরে যেতে থাকে। তাই নতুন কিছু জানার আগ্রহে পর্দা টেনে দিতে নেই।


অনেকেই জানেন, সত্যজিৎ পড়তেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। পড়তে চেয়েছিলেন ইংরেজিতে, কিন্তু পড়তে হয়েছিল অর্থনীতি। এরপর গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেখানকার গ্রন্থাগারেই সত্যজিৎ খুঁজে পেয়েছিলেন রত্নভান্ডার। মার্কিন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ লুইস জ্যাকবস, রুশ চলচ্চিত্রকার পুদোভকিন, ব্রিটিশ চলচ্চিত্রবোদ্ধা পল রোথাসহ আরও কারও কারও চলচ্চিত্রবিষয়ক বইপত্র পড়েছিলেন তিনি। ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ নামে যে ছোট্ট একটি বই আছে সত্যজিতের, সেখানে ‘সোভিয়েত চলচ্চিত্র’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ আছে, তাতে সোভিয়েত তিন পরিচালক আইজেস্টাইন, পুদোভকিন আর দোভঝেঙ্কোকে নিয়ে বিশদ আলোচনা আছে। ‘মন্তাজ’ শব্দটার সঙ্গে সেখানেই পরিচিত হয়েছিলাম।

default-image

আন্দ্রেই তারকোভস্কির ‘ইভানস চাইল্ডহুড’ ছবিটি নিয়েও তাঁর পর্যবেক্ষণ সেখানে ছিল বলে মনে হয়।
যদি ভুল না করে থাকি, তাহলে ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বইটির প্রথম প্রবন্ধটি ছিল ‘চলচ্চিত্রের ভাষা: সেকাল ও একাল’। সংগীত, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটকসহ শিল্পকলার আদিম সৃষ্টিকর্ম এক হয়ে যে চলচ্চিত্র রূপে আবির্ভূত হলো, সে কথা বুঝি এখানেই প্রথম পড়েছিলাম। এই প্রবন্ধটি পড়েই লুমিয়ের, গ্রিফিত, রেনোয়া, অরসন ওয়েলসের ছবি দেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। অবশ্য চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আরও আগে, টেলিভিশনের কল্যাণেই।

সত্যজিৎ রায়কে চলচ্চিত্রনির্মাণের পুঙ্খনাপুঙ্খ নিয়ম মেনে চলা একজন শিল্পী হিসেবে দেখা হয়। ‘পথের পাঁচালী’ থেকেই ডিটেইলিং–এর প্রতি তাঁর নিষ্ঠা সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ক্যামেরায় গল্প বলাটা যে সাধারণ গল্প বলার চেয়ে ভিন্ন একটি ঘটনা আর সিনেমায় গল্প বলার মুনশিয়ানা যে একজন বড় মাপের চলচ্চিত্রকারকে চিনতে সাহায্য করে, সে কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। সমালোচকদের অনেকেই সত্যজিতের এই দিকটিকে ভাসিয়েছেন প্রশংসার বন্যায়।
সমালোচকদের প্রতি যে সত্যজিৎ রায় খুব নির্দয় ছিলেন, তারও প্রমাণ আমরা পাই তাঁর রচনায়। উপন্যাস বা গল্প থেকে কোনো কাহিনি চলচ্চিত্রে নিলে তা যে পরিবর্তন করতে হয়, সব সময় মূল গল্পে আস্থা রাখা যায় না, সে কথা হাতে–কলমে বুঝিয়েছেন সমালোচকদের। সে রকম একটি সমালোচনার প্রথম লাইনটি আমার মতো অনেকেরই মুখস্ত হয়ে গেছে, ‘আশ্বিনের পরিচয় খুলে দেখলুম রুদ্রমশাই আবার আমার পিছনে লেগেছেন।’ বোধ করি, ‘চারুলতা’ ছবিটি নিয়েই একটি রিভিউ করেছিলেন ‘রুদ্রমশাই!’ তারই প্রতিবাদে যে ঢাউস ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ, প্রবন্ধ হিসেবে পড়ার জন্য শুধু নয়, চলচ্চিত্রের ভাষা নির্মাণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার জন্যও তা এক দারুণ সংযোজন।

ছবি নিয়ে কথা হবে না?
সেটাই তো হতে হবে। এবং তা মুগ্ধদর্শকের দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই।

একটা কথা প্রায়ই বলি। ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে হরিহর যখন বহুদিন পর ফিরে আসেন এবং কিনে আনা জিনিসপত্র সর্বজয়াকে দেখাতে থাকেন, একপর্যায়ে দুর্গার জন্য আনা শাড়িটা দেখান, তখন যে দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা দেখে আমি আজ পর্যন্ত চোখের জল আটকাতে পারি না। যতবার দেখি, ততবার কাঁদি। আমার মতো দুর্বলচিত্ত মানুষ বলেই হয়তো এ ঘটনা ঘটে। কিন্তু ভাবতে হয়, সে দৃশ্যে সংলাপ বাদ দিয়ে যন্ত্রানুসঙ্গে যে আবহ সৃষ্টি করলেন সত্যজিৎ, সেটা কি কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে এক অনির্বচনীয় সুখেরও আস্বাদ দেয় না? একটি সার্থক দৃশ্য নির্মাণের সুখের আস্বাদ?
ইউটিউবে দেখলাম, ‘পথের পাঁচালী’ দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন এখনকার খ্যাতিমান ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সুজিত সরকার। বলছিলেন, ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন। কুড়ি মিনিট পার হওয়ার আগেই তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন ঘুমের রাজ্যে। বড় হয়ে দেশের বাইরে এক চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়ে আবার যখন ছবিটি দেখার সৌভাগ্য হলো, তখন ছবি শেষ হওয়ার পর আসন ছেড়ে উঠতে পারেননি তিনি। সেখানে বসেই আরও একবার এবং আরও একবার দেখলেন সে ছবি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো যেন সে ছবির স্বাদ গ্রহণ করলেন। চলচ্চিত্র উৎসব বলেই কয়েকটি শো একনাগাড়ে হয়েছিল। সে সুযোগ নিয়েছিলেন সুজিত সরকার। সুজিতের কাছে অপু ট্রিলজি আর চারুলতাই সেরা।

তবে সত্যজিতের কোন ছবি দেখবে বলে কেউ যদি নিজেকে প্রশ্ন করে, তবে সবার আগে উত্তর হওয়া উচিৎ, দেখতে হবে সব কটি ছবি। তারপরও যদি কেউ বলে, ঠিক আছে, আমাকে প্রথমে কোন পাঁচটি ছবি দেখার কথা বলবে? তাহলে ছবি নির্বাচন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অনেকেই এই তালিকায় ‘পথের পাঁচালী’, ‘মহানগর’, ‘জনঅরণ্য’, ‘চারুলতা’ আর ‘নায়ক’কে রাখবেন। আমি অবশ্য ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র বড় ফ্যান। কেউ কেউ বলবে, ভিন্নস্বাদের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ আর ‘হীরক রাজার দেশে’ কেন থাকবে না তালিকায়? কেউ কেউ গম্ভীর মুখে বলবেন, ‘ঘরে বাইরে’ ছবিটির অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনার কাছেও তো আত্মসমর্পণ করতে হবে। এই বিতর্ক চলতেই থাকবে।আমি জানি, ‘আগন্তুক’ ছবিটি নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ নেই। কিন্তু আমি তা মুগ্ধ হয়ে দেখি। প্রায় পুরো ছবিটাই বাড়ির ভিতর করা। শেষের দিকে খানিকটা আউটডোরে। কিন্তু কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষের লক্ষ্য, চাহিদা, চলার পথ ইত্যাদি নিয়ে এতটা সাবলীল গল্প কজন বলতে পারে? সভ্যতা নিয়ে তোলা প্রশ্নটি তো যেকোনো সময়ের জন্যই আমার প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। কথা বলতে গিয়ে ‘জলসাঘর’ মিস করে গেছি। সে ছবিটিও প্রথম দেখেছিলাম উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় ভারতীয় সংস্কৃতিকেন্দ্রে। সে ছবিতে ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের কথা নিশ্চয়ই মনে থাকবে আপনার। সামন্ততন্ত্রকে গুড়িয়ে দিয়ে পুঁজিবাদ উঠে আসছে—এই সত্য মেনে নিতে পারছেন না জমিদার মশাই। তাঁর হার্দিক বিহ্বলতা যেভাবে তুলে এনেছেন সত্যজিৎ, এখনো তা মুগ্ধ হয়ে দেখি। সেই ছবি বিশ্বাসই ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় বিলিতিদের প্রতি মুগ্ধতার অবতার। পাহাড়ে চাকরির প্রত্যাশায় হতোদ্যম অশোক নামের সেই যুবক ছেলেটি (অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়) যখন চাকরির আশ্বাস পেয়েও কোটিপতি ছবি বিশ্বাসকে বলে দিচ্ছে, সে চাকরিটা নেবে না, তখনকার হতভম্ব ছবি বিশ্বাসের মুখাবয়বটি নিশ্চয়ই অনেকেই খেয়াল করে দেখেছেন।

default-image

এবং সৌমিত্র
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল দুবার। একবার ধানমন্ডিতে তাঁর গেস্টহাউসে, আরেকবার র‌্যাডিসন হোটেলের একটি ঘরে। প্রথমবারই সত্যজিত রায়কে নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তিনি প্রবাদপ্রতিম এই পরিচালককে নিয়ে অনেক কথাই বলেছিলেন। তবে সেদিন যে সাংবাদিকেরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের কিছু প্রশ্নের নমুনা পেশ করলে বোঝতে পারবেন, সৌমিত্রের জন্য কিছু অস্বস্তির মুহূর্তও তৈরি হয়েছিল। যেমন, ১. ‘আপনি তো “অশনিসংকেত” ছবিতে ববিতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ববিতাকে আপনার কেমন লাগে?’ ২. ‘সত্যজিতের অনেকগুলো ছবির নায়ক আপনি। কিন্তু “নায়ক” ছবিতে তিনি কেন আপনাকে না নিয়ে উত্তমকুমারকে নিলেন?’

এ ধরনের অজস্র প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছিলেন সৌমিত্র। তবে এরই মধ্যে যে উত্তরগুলো দিয়েছিলেন, তাতেও সত্যজিৎ রায়ের মূল্যায়ন ছিল। বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায় জানতেন, কে কোথায় মানাবে। তাকেই তিনি সেভাবে নিতেন।’
এখানে সৌমিত্র ও সত্যজিতের জীবনের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। শিল্পী নির্বাচনে সত্যজিতের দক্ষতারও পরিচয় মিলবে। এ কথা সবাই জানেন, ‘অপরাজিত’ ছবির অপুর খোঁজ করছিলেন সত্যজিৎ। সে সময় তাঁর এক সহকারী নিত্যানন্দ দত্ত সৌমিত্রকে হাজির করেছিলেন সত্যজিতের সামনে। সৌমিত্রকে দেখেই সত্যজিৎ বলে উঠেছিলেন, ‘এ তো! আপনি তো বড্ড বড় হয়ে গেলেন!’

default-image

কিন্তু সে সময় থেকেই সৌমিত্রের দিকে চোখ রেখেছিলেন সত্যজিৎ। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে যখন শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে ‘অপরাজিত’ পেল গোল্ডেন লায়ন, তখন সে পুরস্কার নেওয়ার সময়ই সত্যজিৎ ঘোষণা করেছিলেন, এই সিরিজের তৃতীয় ছবিটিও তিনি নির্মাণ করবেন। সৌমিত্রই যে এ ছিবতে অপুর ভূমিকায় অভিনয় করবেন, সেটা সৌমিত্রের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। পরে সৌমিত্র জেনেছিলেন, সে সময় যে রোমান্টিক নায়কেরা ছিলেন ছবিপাড়ায়, তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচন করতে মন সায় দেয়নি সত্যজিতের। ফলে সৌমিত্র ঢুকে গেলেন সে ছবিতে। এবং এরপর সত্যজিতের আরও তেরটি ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেন।
সৌমিত্র ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’–এর গুপী চরিত্রে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সত্যজিৎ বলেছিলেন, তুমি এ চরিত্রে ভালো করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার মনের সঙ্গে মিলছে না।’

এর কারণ হিসেবে বললেন, গ্রামের দরিদ্র একটা ছেলের চরিত্রে অভিনয় করার মতো চেহারা নয় সৌমিত্রের। সৌমিত্র তারপরও জোদ ধরে বসে ছিলেন। বলেছিলেন, মেকআপের মাধ্যমে চেহারা ডিগ্লামারাইজ করে নেবেন। সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো সে রকম মেকআপ হয় না।’
এরপর তপেন চট্টোপাধ্যায়কে নেওয়া হলো সে চরিত্রে। এবং তপেন গুপীর ভূমিকায় যে অভিনয় করলেন, তাতে তো সৃষ্টিই হলো নতুন এক ইতিহাসের। বাঘা রীপে রবি ঘোষের অভিনয়ও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা উচিত।

‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির অশোক চরিত্রে সত্যজিৎ নিতে চেয়েছিলেন সৌমিত্রকে। কিন্তু অন্য শুটিং থাকায় সত্যজিতের সঙ্গে সময় মেলেনি। সে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে সত্যজিৎ বলেছিলেন, সৌমিত্র না হয়ে অরুণ অশোকের ভূমিকায় অভিনয় করায় ভালো হয়েছে। কারণ, অরুণের জায়গায় যদি সৌমিত্র থাকতেন, তাহলে দর্শক আগেই বুঝে যেত মণীষা প্রণবেশের প্রতি দুর্বল না হয়ে অশোকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে।


শততম জন্মদিন

রবীন্দ্রনাথের পর সত্যজিৎ রায়কেই বহুবৈচিত্র্যময় বাঙালি প্রতিভা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। সত্যজিৎ রায় পারিবারিকভাবেই নিজেকে গড়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বাবা সুকুমার রায়ের পথ ধরেই তাঁর শিল্পভুবনে ঘোরাফেরার শুরু। যাঁরা সত্যজিতের দাদা ও বাবার লেখা পড়েছেন, তাঁরা জানেন কতটা সুক্ষ্ণ জীবনবোধ ছিল তাঁদের। এই সময়টায় আরেকবার তাঁদের রচনা পড়ে ফেলা যায়।

আলোচনায় সত্যজিতের লেখালেখি, বিশেষ করে ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কু বাদ থেকে গেল। তাতে কিছু আসে যায় না। সামনে কোনো একসময় শুধু বই নিয়েই আলোচনা করা যাবে। আজ একের পর এক তাঁর তৈরি সিনেমা দেখেই উদ্‌যাপন করা হোক সত্যজিৎ রায়ের শততম জন্মদিন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0