'চাকা' পৌঁছেছে গন্তব্যে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রযোজনা ‘চাকা’ নাটকের একটি দৃশ্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রযোজনা ‘চাকা’ নাটকের একটি দৃশ্য

দিনটি ছিল ২৫ আগস্ট। সন্ধ্যার আকাশ। কিছুটা কালচে মেঘ জড়ো হয়েছে। দীর্ঘ লাইন প্রেক্ষাগৃহের বাইরে। ঠিক সাতটায় বেজে ওঠে নাটক শুরুর ঘন্টাধ্বনি। সবাই প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলের আলো-আঁধারি ঘরে।
পাতা আর ফুল নিবেদনে মঙ্গলাচরণ শেষে শুরু হয় ডম্বরু ধ্বনি। এই বাদনের সঙ্গে মঞ্চের কেন্দ্রে থাকা গোলাকার এক হাত উঁচু পাটাতনে লালচে-হলুদাভ আলোয় একজন অভিনেতার হাতের পাঁচ আঙুলের চক্রাকার ছায়া কেন্দ্রে স্থির ঘুরতে থাকে। হঠাৎ ডম্বরু থেমে যায়। শুরু হয় চাকা। তরুণ মেধাবী নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তীর হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ প্রথমবারের মতো সেলিম আল দীনকে মঞ্চায়ন করে। এ ক্ষেত্রে তারা বেছে নেয় অসামান্য কথাশৈলীতে গাঁথা কথানাট্য আঙ্গিকের প্রথম রচনা চাকা। বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার অংশ এই প্রযোজনা।
অপঘাতে মৃত এক যুবকের লাশ বহনের গল্প চাকা। এলংজানি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের নির্দেশে বাহের নামীয় এক গারোয়ান একজন প্রৌঢ় ও তরুণ দুই সঙ্গীসহ লাশটিকে লেখা ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে বাধ্য হন। তাঁদের সঙ্গে থাকেন হাসপাতালের প্রতিনিধি সাঁওতাল ধরমরাজ। কিন্তু কাগজে ভাসমান অক্ষরে চিত্রিত গন্তব্যের খোঁজ মেলে না কোথাও। লাশটি ক্রমেই পচে যেতে থাকে। গন্ধ বেরোয়। কোনো গ্রাম একে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। সমাহিত করার জন্য এক টুকরা ভূমির ব্যবস্থাও করে না কেউ। তারপর লাশটিকে যাঁরা ঠিকানায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তাঁরাই তার সহমর্মী হয়ে ওঠেন। কোনো এক নদীর তীরে লাশটিকে মাটিচাপা দেন পরম মমতায়। গল্পের এই আপাত সহজ চলনে একে একে যুক্ত হয় সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্ব, কারবালার বেদনাবহ ঘটনার টুকরা।
প্রায় দুই যুগ আগে ঢাকা থিয়েটার সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশনায়চাকার মঞ্চায়ন করেছিল। শিল্পোত্তীর্ণ এই প্রযোজনা আজ মিথের পর্যায়ে। আবার এই সময়ে সুদীপ চক্রবর্তীর হাত ধরে মঞ্চে ফিরে এল চাকা। তিনি ভূমিসমতল বৃত্তমঞ্চকেই এ নাটক মঞ্চায়নের জন্য উপযুক্ত ভেবেছেন। এটি একই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যসংলগ্ন আবার নাট্যের নামকরণের সঙ্গেও মিলে যায়।
শিক্ষার্থী অভিনেত্রী বাহেররূপী মাহ্জাবীন, প্রৌঢ়রূপী নুসরাত, তরুণ শকুরচান সুশান্ত, ধরমরাজ রফিকুলের চরিত্রানুগ অভিনয় এককথায় মনকাড়া। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের বয়স অতিক্রম করে চরিত্রের বয়স, ভঙ্গি, চলন-বলনকে যেভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন, তা মুগ্ধতা জাগায়। কথকত্রয় মেহেদী, ইফাত, লাবণী বর্ণনার পাশাপাশি অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চরিত্রে নিজেদের ব্যাপৃত করেছিলেন যখন, তখন তা বিশ্বাসযোগ্যতায় ঘাটতি তৈরি করেনি মোটেও। পোশাক চরিত্রানুগ আর তা আমাদের দেশজ ঐতিহ্যকে মান্য করেই পরিকল্পিত। মেকআপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আলো বৃত্তাকার মঞ্চটিতে পথ দেখিয়েছে যথাযথভাবেই। সংগীতের পরিকল্পনা সুন্দর।
মহড়া থেকেই এই প্রযোজনাকে অনুসরণ করছি। একটি নাটককে মঞ্চে সার্থক করে তুলতে যতটুকু পরিশ্রম, সময় ও নিষ্ঠার দরকার, তার ঘাটতি চোখে পড়েনি কোথাও। গরুর গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নাটোরে যাওয়া, সাঁওতালদের জীবনাচরণ আর সংস্কৃতি বোঝার জন্য রাজশাহী ভ্রমণ, নাট্যকারকে উপলব্ধি করার জন্য তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি নানাবিধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তবেই তাঁরা মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। আর তার ফলাফলও আমাদের চোখের সামনেই নান্দনিক এক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত।
চরিত্রাভিনয় ও কথক বিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে সুদীপ নাটকটিকে সাফল্যের তীরে পৌঁছে দিয়েছেন ঠিকই। তবে কথক আর চরিত্রের অভেদাত্মক যে রূপ, যা আমাদের ঐতিহ্যনিঃসৃত সেই অতুলনীয় ম্যাজিকের অভাবটুকু বোধ করেছি।
চাকার শেষ দৃশ্যে যখন কৃত্রিম নীলচে আলোয় লাশ নামীয় সাদা কাপড়টিতে মাটি বলে শুকনা পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, যখন বিশের কোঠার এক সুশ্রী তরুণী ষাটোর্ধ্ব এক প্রৌঢ়ের ভূমিকায় আকাশবিদারি পুঁথিপাঠে কারবালার করুণ মৃত্যুর শ্লোক উচ্চারণ করছেন, যখন তাঁর আর অপরাপর সঙ্গীদের ক্রন্দনে ভেসে যাচ্ছে ছোট্ট প্রেক্ষাগৃহটি, যখন আশপাশের সবার চোখে জল, যখন আমার বিপরীত দিকে বসা ভারতীয় অভিনেত্রী শাহানা গোস্বামীকেও চোখ মুছতে দেখি, তখন মনে হয়—তরুণ এই অভিনয়শিল্পীরা তবে স্পর্শ করতে পেরেছেন দর্শককে। একটি নাট্যের সাফল্যের শিরোপা এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে!