default-image

‘এক ঘারমে দো পীর’ থাকলে চলে না। বড় ভাই আবদুল হাই চিত্রশিল্পী। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পড়ে বেরিয়েও চিত্রশিল্পী হতে পারেননি টেলিসামাদ। তবে ইচ্ছে ছিল, বিদ্যাটা একদিন কাজে লাগাবেন। রং-তুলি হাতেও নিতেন অবসরে। একবার একটি একক চিত্র প্রদর্শনী করার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু হবে কী করে! আঁকার পরই লোকে একটা একটা করে নিয়ে যেত।

টেলিসামাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। গত বছরের ৬ এপ্রিল প্রয়াত হয়েছেন বরেণ্য চলচ্চিত্র অভিনেতা টেলিসামাদ। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। বয়সের কাছেও পরাস্ত হয়েছিলেন। সেই অবস্থাতেও মাঝে-মধ্যে অভিনয় করতেন। কিন্তু গলায় তেমন জোর ছিল না। শরীরেও তেমন বল ছিল না। লাফাতে-ঝাঁপাতে পারতেন না। তারপরও দাঁড়াতেন ক্যামেরার সামনে। শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা করে ফিরেছিলেন বটে, তবে সেভাবে আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। ‘জিরো ডিগ্রি’ ছবি দিয়ে শেষ হয় তাঁর অভিনয়জীবন।

শক্তিমান কৌতুক অভিনেতা হিসেবেই টেলিসামাদের পরিচিতি। অভিনয়ে তাঁর হাতেখড়ি অল্প বয়সেই। জন্মভূমি মুন্সিগঞ্জে মঞ্চনাটক করতেন তিনি। মঞ্চের তুখোড় অভিনেতা টেলিসামাদকে টেলিভিশনে নিয়ে আসে মঞ্চের সামনে থাকা দর্শকদের করতালির শব্দ। সেখানে নতুন নাম জুটে যায় তাঁর। আব্দুস সামাদ হয়ে যান টেলিসামাদ। কাণ্ডটি করেছিলেন বিটিভির ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন। তবে এই নামের জনপ্রিয়তা টিভি থেকে নয়, এসেছিল সিনেমা থেকে।

ছাত্রজীবনেই টেলিসামাদের প্রতিভা টের পাওয়া গিয়েছিল। পরিচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় সেসময়। নজরুল ইসলাম ছিলেন হাসির ছবির দুর্দান্ত পরিচালক। তার ‘স্বরলিপি’ ও ‘দর্পচূর্ণ’ ছবি দুটি বিখ্যাত। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কার বউ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন টেলিসামাদ। ১৯৭৩ সালে মেহমুদ পরিচালিত ‘পায়ে চলার পথ’ ছবিটি টেলিসামাদকে চেনাতে সাহায্য করে। তিনি পেয়ে যান দর্শক প্রীতি। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘নয়নমণি’ ছবিটি তাঁর জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। এ ছবিতে ফারুকের বন্ধুর চরিত্রে তাঁর হৃদয়কাড়া অভিনয় তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়।

default-image

তারপর কয়েক শ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন টেলিসামাদ। অগণিত ছবির মধ্যে উল্লেখ করতে গেলে লিখতে হয় ‘ময়নামতি’, ‘বেইমান’, ‘সুজন সখী’, ‘সোহাগ’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘জিঘাংসা’, ‘আগুনের আলো’, ‘গুনাহগার’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘অশিক্ষিত’, ‘আসামী হাজির’, ‘ফকির মজনু শাহ্’, ‘তুফান’, ‘বৌরানী’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মধুমিতা’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘বধূ বিদায়’, ‘মাটির ঘর’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’, ‘দি ফাদার’, ‘কথা দিলাম’, ‘কলমীলতা’, ‘খোকন সোনা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘গুন্ডা’, ‘মিস ললিতা’, ‘দিলদার আলী’, ‘মনা পাগলা’, ‘ভাত দে’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিগুলো দর্শকপ্রিয় হয়েছিল।

টেলিসামাদ কেবল অভিনয়ে আটকে থাকেননি। তিনি ছিলেন প্রযোজকও। নিজের জন্য গল্প বেছে প্রযোজনা করেছেন ‘দিলদার আলী’ ছবিটি। ১৯৮০ সালে মুক্তি পেয়ে সফলতাও পায় কাজী হায়াৎ পরিচালিত এ ছবিটি। এ ছবিতে নায়ক হিসেবে দর্শকদের সাধুবাদ পেয়ে ‘মনা পাগলা’ ছবিতেও নায়ক হন তিনি। এটির পরিচালকও কাজী হায়াৎ। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। এ ছবিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন স্ত্রী রাখী।

default-image

‘মনা পাগলা’ ছবির কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক সবই ছিলেন টেলিসামাদ। শুধু নিজের প্রযোজিত ‘দিলদার আলী’ ও ‘মনা পাগলা’ই নয়, আরও বেশ কিছু ছবিতে গান গেয়েছেন তিনি। তাঁর গাওয়া ‘দিওয়ানা বানাইয়া’, ‘দিলদার আলী আমার নাম’, ‘ও জুলিয়া প্রাণ খুলিয়া দে’, ‘দোস্ত আমার ইস্কাপনের টেক্কা’ গানগুলো শ্রোতারা বহু বছর মনে রেখেছেন। এমনকি মঞ্চে গাইতে গেলেও এ গানগুলোর অনুরোধ পেয়েছেন।

যতই প্রতিভাবান হোন টেলিসামাদ, নাম-যশ-খ্যাতি পেয়েছিলেন কমেডিয়ান হিসেবে। শেষের দিকে দেশের সিনেমা ও কমেডির মান নিয়ে তাঁর আক্ষেপ ছিল। সিনেমায় কমেডির নামে ভাঁড়ামোর ব্যাপারে ছিল ক্ষোভ। আর বড় আফসোস ছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পাওয়ায়। অবশ্য তাঁর চেয়ে বেশি আফসোস সিনেমাপ্রেমীদের। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের চেয়ে বড় পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দর্শকদের ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0