উৎসবে একবেলা…

টিএসসি প্রাঙ্গণে পুরোনো দিনের বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার ঘিরে তরুণদের উচ্ছ্বাস। ছবি: আনন্দ
টিএসসি প্রাঙ্গণে পুরোনো দিনের বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার ঘিরে তরুণদের উচ্ছ্বাস। ছবি: আনন্দ

বিকেলের রোদ পড়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে এলাম, তখনই কানে এল ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে, যেখানে নদী এসে থেমে গেছে’। টিএসসিতে দাঁড়িয়ে যেন ঘুরে এলাম একটুকরা শৈশব থেকে। 

ছোটবেলায় সাদাকালো টেলিভিশনে প্রতি শুক্রবার বাসার সবাই মিলে বিটিভিতে দেখতাম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। সামাজিক আদর্শে ভরপুর সেই সিনেমা দেখে বাড়ির সবাই একই সঙ্গে কাঁদত, একই সঙ্গে হাসত৷ তাই টিএসসির কাছাকাছি যেতেই পুরোনো সেই সুর কানে আসতেই স্মৃতিরা জেঁকে ধরল। ওই সুরের আরও কাছাকাছি যেতেই দেখা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক (টিএসসি) মিলনায়তনের গেট সাজানো হয়েছে মহাসমারোহে৷ হরেক রকমের নকশায় ছেয়ে আছে টিএসসি। ঝুলছে রংবেরঙের নকশা করা কৌণিক বাক্স৷ 

সাবেকি কায়দায় সিনেমা দেখার ডাক
গেটের সামনেই কয়েকজনকে দেখা গেল কাগজের চোঙা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। অনেকটা সাবেকি কায়দায় চলছে সিনেমা দেখার আমন্ত্রণ জানানোর কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোনানো হচ্ছে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের খবর। কানে এল ঘোষক বলছেন—‘আসিতেছে! আসিতেছে! তানিম রহমান অংশু পরিচালিত চলচ্চিত্র ন ডরাই।’ পুরো দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে গেল। এই পুরো মহাযজ্ঞ শুধু চলচ্চিত্র ঘিরে, বাংলা ভাষার বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ঘিরে। 

চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদ আয়োজিত ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র ১৪২৬’। পাঁচ দিনের এ আয়োজনে ঘুরতে গিয়েছিলাম ১১ ফেব্রুয়ারি। ৯ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারির (২৬ থেকে ৩০ মাঘ) এ আয়োজনে রয়েছে বেশ কিছু চলচ্চিত্র৷ প্রতিদিনই এই উৎসবে ভিড় করছেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ ছেলেমেয়েরা। 

উৎসবের আকর্ষণ
টিএসসি মিলনায়তনে এ আয়োজনে পাঁচ দিন দেখানো হয়েছে চার পর্বে নানান সময়ের বাংলা চলচ্চিত্র৷ ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ছিল তৌকীর আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ফাগুন হাওয়ায়৷ এর আগে একই দিন বিকেলে ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র 

ন ডরাই, ইতি, তোমারই ঢাকা, সত্তা ছিল এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। উৎসবে প্রদর্শিত পুরোনো দিনের কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও ছিল অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। 

গত ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা তিনটার দিকে এ উৎসবে দেখানো হয় ন ডরাই সিনেমাটি। সিনেমা শুরুর আগে উৎসবস্থলে গিয়ে দেখা যায় টিএসসি মিলনায়তনের সামনে পা ফেলারও জায়গা নেই। পুরো শো ছিল ‘হাউসফুল’। প্রতি প্রদর্শনীর টিকিটের মূল্য ছিল ৩০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ছিল ফ্রি৷ আর এমন ভিড় ছিল প্রতিদিনের প্রদর্শনীতেই। 

মিলনায়তনের বাইরে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার জন্য দর্শকদের লাইন। ছবি: খালেদ সরকার
মিলনায়তনের বাইরে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার জন্য দর্শকদের লাইন। ছবি: খালেদ সরকার

বাংলা ছবির পোস্টারে সেজেছিল টিএসসি
যাঁরা এই উৎসবে এসেছেন, দেখেছেন টিএসসির পরিবেশ, তাঁরাই আয়োজনের প্রশংসা করছিলেন। ‘বাংলা সিনেমা দেখতে এত ভিড়!’— কৌতূহলী মানুষের মুখ থেকে শোনা গেছে এমন মন্তব্যও। বিভিন্ন সময়ের বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের পোস্টার দিয়ে সাজানো হয়েছিল পুরো টিএসসিকে। আজিজুর রহমানের ছুটির ঘণ্টা, আব্দুস সামাদ খোকনের ঝিনুক মালা, কাজী জহিরের ময়না মতি, জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়ার পোস্টার দেখে দর্শনার্থীরা থেমে গেছেন। এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, অনেকে আবার টুকে নিয়েছেন পোস্টারে থাকা তথ্যগুলো। 

মূলত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং সাধারণ দর্শকের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের মেলবন্ধন ঘটাতেই প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ আয়োজন করে ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র’ উৎসবটি। বাংলা ভাষায় নির্মিত ঐতিহ্যবাহী সব চলচ্চিত্র নিয়ে এই আয়োজন। 

যেভাবে উৎসবটির যাত্রা শুরু
২০০২ সালে ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘চলচ্চিত্রে বাংলার মুখ’ শিরোনামে প্রথমবারের মতো এ উৎসব আয়োজন করা হয়। সে বছর উৎসবের উদ্বোধন করেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। পরবর্তীকালে ‘সত্যজিতের চলচ্চিত্র’, ‘বাংলার ছবি’, ‘বাংলা চলচ্চিত্রের ৫০ বছর’সহ বিভিন্ন নামে আয়োজন হওয়ার পর ২০০৭ সাল থেকে ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র’ নামেই এ উৎসব করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদ। 

যাঁরা এখনো ঘুরে আসেননি, আজই চলে আসতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে। 

>

আজ ১৩ ফেব্রুয়ারির সূচি

● সকাল ৮টায় তানিম রহমান পরিচালিত ন ডরাই

● সকাল ১০টায় আজিজুর রহমান পরিচালিত অশিক্ষিত

● বেলা ১টায় শহীদুল ইসলাম খোকনের বাংলা

● বেলা সাড়ে ৩টায় মালেক আফসারী পরিচালিত এই ঘর এই সংসার

● সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নিয়ামুল মুক্তা পরিচালিত কাঠবিড়ালী