কিন্তু সে আমলে এসবে তেমন আয় হতো না। সংসারে ছিল খুব অভাব। মাহজাবিনের জন্মের পর ডাক্তারের খরচ দেওয়ার টাকাও ছিল না বাবার কাছে। আলি বখশ আশা করেছিলেন একটি পুত্রসন্তানের। সদ্যজাত মীনাকে রেখে আসা হলো এতিমখানায়। মীনার মায়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর বয়স থেকে সেই মেয়েকে পুরোদস্তুর সিনেমার অভিনয়ে নামতে হলো। তার আকুতি ছিল, ‘আমি স্কুলে যেতে চাই, পড়তে চাই!’ কিন্তু স্কুলে যাওয়ার বদলে পরিণত হয়েছিলেন বাবার টাকা তৈরির মেশিনে। শিশু মীনার আয়ে সংসার চলত।

default-image
সদ্যজাত মীনাকে রেখে আসা হলো এতিমখানায়। মীনার মায়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর বয়স থেকে সেই মেয়েকে পুরোদস্তুর সিনেমার অভিনয়ে নামতে হলো।

মীনা কুমারীর মাতামহী হেম সুন্দরী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই সুকুমার ঠাকুরের এই কন্যা বৈধব্যের যন্ত্রণা মেনে না নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পালিয়ে মীরাটে গিয়ে বিয়ে করেন খ্রিস্টান সাংবাদিক পেয়ারেলালকে। হেম সুন্দরীর কন্যা প্রভাবতী বম্বে এসে মঞ্চের নৃত্যশিল্পী হয়েছিলেন। সেখানেই আলি বখশের সঙ্গে পরিচয় আর পরিণয়। প্রভাবতীর নতুন নাম হয় ইকবাল বানু। এই ইকবালের কন্যা মীনা কুমারী।

default-image

১৭ বছর বয়সেই নায়িকা খ্যাতি পেয়েছেন মীনা। আর্থিক সচ্ছলতা আসতে শুরু করেছে। তখনই ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যু ঘটে তাঁর মায়ের। কিছুদিন পর পরিচালক কামাল আমরোহির সঙ্গে প্রেম হলো মীনার। ১৯৫২ সালে ১৮ বছরের মীনা কুমারী এবং ৩৪ বছরের আগেই বিবাহিত কামাল আমরোহি গোপনে বিয়ে করেন। মীনার চিন্তা ছিল লাখ দুয়েক টাকা জমলে সেই টাকা বাবার হাতে দিয়ে বিয়ের কথা বলবেন, যাতে সংসার চালাতে কষ্ট না হয়। কিন্তু বাবা বিয়ের কথা জানতে পেরে মীনাকে চাপ দিতে থাকেন তালাক নেওয়ার জন্য।

মীনা চলে গেলেন স্বামীর বাড়িতে। কিন্তু কামাল আমরোহি ভিন্ন জীবনের দূত হতে পারলেন না মীনা কুমারীর জীবনে। পরিচালক স্বামী তাঁকে সিনেমায় কাজ করতে দিয়েছিলেন তিনটি শর্তে। শুটিং থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসতে হবে, যাতায়াত নিজেদের গাড়িতে আর মেকআপ রুমে মেকাপম্যান ছাড়া আর কাউকে আসতে দেওয়া যাবে না। তাঁদের সম্পর্ক ক্রমে তিক্ত হতে শুরু করে।

default-image

কামাল আমরোহি রীতিমতো গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছিলেন তাঁর পেছনে। ১৯৬৩ সালে সাহেব বিবি অর গুলাম মনোনীত হয় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য। কামাল আমরোহির বাধার কারণে বার্লিনে যাওয়া হয়নি মীনার। আর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন তো চলতই। পিতাকে ছেড়ে যে বাড়িতে গিয়েছিলেন, সে বাড়িও ছাড়লেন মীনা। তাঁর শেষ আশ্রয় হলো অ্যালকোহল আর কবিতা। ১৯৬৮ সালে ধরা পড়ে, তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছেন।

মীনার সবচেয়ে বিখ্যাত সিনেমা বোধ হয় পাকিজা। ছবিটি কামাল আমরোহি বানানোর কাজ শুরু করেন ১৯৫৮ সালে। বিবাহবিচ্ছেদের পর ছবির কাজ থেমে গেল। ১৯৬৯ সালে সুনীল দত্ত আর নার্গিস সেই ছবির কিছু রিল দেখলেন। তাঁরা উঠেপড়ে লাগলেন যে এই ছবি শেষ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মীনা আর কামাল রাজি হলেন। চূড়ান্ত অসুস্থ মীনা অমানবিক পরিশ্রমে জীবনের শেষবিন্দু নিংড়ে দিলেন এই ছবিতে। পাকিজা মুক্তি পেল ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ছবি ফ্লপ। ছবি মুক্তির দুই মাস পর তিনি মারা গেলেন পর ৩১ মার্চে। মীনার জীবনের শেষ ট্রাজেডি পরে পাকিজা ছবিটিকেও সুপারহিট করল। হলে উপচে পড়ল দর্শক। মীনা কুমারী পেলেন মরণোত্তর তাঁর জীবনের দ্বাদশ আর সর্বশেষ ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন।

default-image

বেঁচে থাকতে মীনা কুমারী উপার্জন আর দান করেছেন বেহিসাব। অথচ হাসপাতালে ভর্তির দিন তাঁর ঘরে ছিল মাত্র ১০০ টাকা। মৃত্যুর খবর পেয়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতে ছুটে আসতে হয়েছিল গীতিকার গুলজারকে। এত বড় শিল্পী আর তার চেয়ে বড় এই মানুষের জীবন আরেকটু কম বেদনার হলে কার কী ক্ষতি হতো!

বলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন