default-image

পরিচালক নায়ক বানান। বানিয়েছিলেন সত্যজিৎও। যেমন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কত ছবি সত্যজিৎ বানিয়েছেন সৌমিত্রকে নিয়ে। তখনকার সুপারস্টার উত্তম কুমারকে ততটা নেননি। উত্তমকে বানানোর কিছু ছিল না তাঁর। তবু তিনি উত্তম কুমারকে নিয়ে তৈরি করেন ‘নায়ক’ নামের একটি সিনেমা, ১৯৬৬ সালে। আসছে বৃহস্পতিবার ছবিটি মুক্তির ৫৫ বছর। এই ছবিতে প্রতিষ্ঠিত একজন নায়ককে দিয়ে তিনি ফাঁস করেছেন একজন নায়ক, একজন তারকার ভেতরজগৎ।

তারকার কত তাড়া! প্রশংসা, করতালি, অর্থপ্রাপ্তির তাড়না। সে কথা বেশির ভাগ লোকই জানেন না। জানেন কিছু লোক। আর সাধারণের তো জানারই কথা না যে, কত যাতনা থাকে তারকাজীবনের অন্তরালে। সত্যজিৎ রায় ৫৫ বছর আগে একজন বড় তারকাকে নিয়ে ছবি বানিয়ে সেসব জানিয়ে দিয়ে গেছেন। পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন, তারকার হৃদয়ের গভীর বেদনা জনতাকে জানানোর নয়। মনে পড়ে ছবির গল্পটা?

বিজ্ঞাপন
default-image

সুপারস্টার নায়কের নাম অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিতে যাবেন, কিন্তু বিমানের টিকিট পাননি বলে রওনা দিয়েছেন রেলগাড়িতে। বগিতে তাঁর পরিচয় হয় অদিতি সেনগুপ্ত নামের এক আধুনিক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে। শিক্ষিত, রুচিশীল, মার্জিত এই তরুণী ‘আধুনিকা’ নামে মেয়েদের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সংলাপ আর হাবভাবে বোঝা যায়, মূলধারার এ রকম তারকাদের তিনি তেমন পাত্তা দেন না। তবে পত্রিকার প্রসারের জন্য অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার পেতে চান। ছবিটা দেখার সময় এই প্রজন্মের মূলধারার বাংলা ছবির দর্শকেরা হয়তো হতাশ হবেন! নায়কের সঙ্গে দেখা হলো নায়িকার, অথচ সেখানে প্রেমালাপ নেই, ‘ফ্লার্ট’ নেই। আছে কেবল সেয়ানে সেয়ানে টক্কর!

default-image

নায়কের প্রতি তরুণীর স্বাভাবিক মুগ্ধতার বদলে অদিতির তৈরি হয় তাঁর ভেতরবাড়ির এই অনুভূতিগুলো জানার আগ্রহ। তিনি জানতে চান, ‘এই যে বেশি করে পাওয়া, এর মধ্যে একটা ফাঁক, একটা অভাববোধ, কোনো অনুতাপ নেই?’ নায়কও জবাব দেন, ‘আমাদের খুব বেশি কথা বলতে নেই। আমরা ছায়ার জগতে বিচরণ করি তো, কাজেই আমাদের রক্ত–মাংসের জ্যান্ত শরীরটা জনসাধারণের সামনে খুব বেশি করে তুলে না ধরাই ভালো।’ তবে জনসাধারণের জন্য না হলেও সুন্দরী ওই তরুণীর কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। মনের অর্গল খুলে জানিয়ে দেন সফল নায়কের নানা অনুভূতি—জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়, নিঃসঙ্গতা, অপরাধবোধ, লোভের কথা! ফ্ল্যাশব্যাকে সেসব দেখে নেন দর্শকও।

ধারণা করা হয়, উত্তমের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে উত্তম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন নায়ক হিসেবে। তারুণ্যপাড়ায় থিয়েটারের গুরু শঙ্কর দা উঠে আসেন নায়কের স্বপ্নে, দর্শকের জন্য ফ্ল্যাশব্যাকে। সত্যজিৎ সেই থিয়েটারসংগ্রামীর সংলাপে জানান তখনকার চলচ্চিত্র সম্পর্কে থিয়েটারের ধারণা, ‘ফিল্মের একটা গ্ল্যামার আছে জানি, কিন্তু তার সাথে আর্টের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সত্যজিৎ কিন্তু তাঁর আর্ট বের করে এনেছেন। শিল্পনির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত বিশেষভাবে বানিয়েছিলেন শুটিং সেটের রেলের কামরা। শুটিংয়ে ট্রেনের ঝাঁকুনি, ঝকঝক শব্দসহ কোনো কিছুতেই আর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মনে হয়নি যে ওটা শুটিং সেট। ‘নায়ক’-এর নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর বা মিস অদিতি সেনগুপ্তের মনে নায়কের ব্যাপারে যে কিঞ্চিৎ অবজ্ঞাভাব শুরুতে ছিল, সেটাকে সহানুভূতিতে রূপ দিয়েছেন পরিচালক। নায়ককে অবাক করে পুরো সাক্ষাৎকারটি ছিঁড়ে ফেলে দেন নায়িকা। নায়ক জানতে চান, ‘মন থেকে লিখবেন নাকি?’ নায়িকা বলেন, ‘মনে রেখে দেব।’ অর্থাৎ সবটা সবাইকে বলে দেওয়া যায় না।

১৯৬৬ সালে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ডের’ পাশাপাশি ‘শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্ম’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনি ও চিত্রনাট্য’ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ‘নায়ক’। আমাদের এখনকার নায়কেরা উত্তমের মতো সাহস করবেন এমন ছবিতে অভিনয় করতে?

বলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন