১৬ বছরে পালিয়ে বিয়ে, এরপর নির্যাতনের শিকার, আশার অন্য লড়াইয়ের গল্প জানেন কি

আশা ভোসলে। ছবি : খালেদ সরকার

সংগীতজীবনের আকাশছোঁয়া সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নারীর নিঃশব্দ সংগ্রাম। আশা ভোসলে নিজের জীবনের প্রথম দিকেই যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা বহু বছর পর তাঁর নিজের মুখেই উঠে আসে।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন আশা ভোসলে। তাঁর স্বামী গণপতরাও ভোসলে ছিলেন বয়সে প্রায় ২০ বছরের বড়। এই সম্পর্ক শুধু পরিবারের সঙ্গে দূরত্বই তৈরি করেনি, বরং তাঁর জীবনে নিয়ে আসে এক দীর্ঘ অশান্তির অধ্যায়। বিশেষ করে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর এই বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি; দীর্ঘদিন দুই বোনের মধ্যে কথা পর্যন্ত বন্ধ ছিল।

বিয়ের পর শুরু হয় আরেক লড়াই। সংসারের আর্থিক অবস্থা ছিল ভীষণ নড়বড়ে—স্বামীর আয় মাসে মাত্র ১০০ টাকা, যা দিয়ে বড় পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। ফলে খুব অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় আশাকে। গানের কাজের পাশাপাশি তাঁকে সামলাতে হতো শ্বশুরবাড়ির সব কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা—সবকিছু।

এই সময়েই আশা ভোসলে প্রথম সন্তানের মা হন। কিন্তু মাতৃত্বের স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এক মাসের শিশুকে বাড়িতে রেখে বেরিয়ে পড়তে হতো গান গাইতে। কারণ, সংসার চালানোর আর কোনো উপায় ছিল না। ভোর পাঁচটায় উঠে রেওয়াজ, তারপর ঘরের কাজ, এরপর গান—এভাবেই কাটত তাঁর প্রতিটি দিন। কখনো কাজ মিলত, কখনো মিলত না—অনিশ্চয়তাই ছিল নিত্যসঙ্গী।

আশা ভোসলে
ছবি: খালেদ সরকার

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি ছিল দাম্পত্য সম্পর্ক। নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে আশার ভাষ্য—এই বিয়ে ছিল নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারে ভরা। শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীল মানসিকতা একজন গায়িকাকে বউ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। ‘ওরা একজন গায়িকাকে পুত্রবধূ হিসেবে নিতে পারেনি’—এমনটাই বলেছিলেন তিনি।

পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় যখন তৃতীয় সন্তানের গর্ভে থাকাকালীন আশাকে স্বামীর বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। তখন আর কোনো উপায় না দেখে তিনি ফিরে আসেন নিজের মা, ভাইবোনদের কাছে। সেই থেকেই শুরু একক মায়ের লড়াই।

তিন সন্তানকে বড় করেছেন আশা প্রায় একাই। জীবনের সেই কঠিন সময়ে কেউ পাশে ছিল না; কিন্তু থেমে থাকেননি। বরং সেই সংগ্রামই তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে। সংগীতজগতে তখন ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছেন তিনি—যদিও সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে ‘সাহসী’ বা ‘বোল্ড’ গান গাওয়ার জন্য।

আরও পড়ুন

এই সমালোচনার জবাবও আশা দিয়েছিলেন সোজাসাপ্টা ভাষায়—‘আমি কি আনন্দের জন্য গান গাইতাম? সংসার চালাতে, সন্তানদের বড় করতে আমাকে কাজ করতেই হতো।’

১৯৬০ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে তিনি বিয়ে করেন সুরকার আর ডি বর্মনকে, যা তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় নিয়ে আসে। যদিও এই দাম্পত্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, ১৯৯৪ সালেই মারা যান বর্মন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে