নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ, দক্ষিণি সিনেমা নিয়ে তুমুল বিতর্ক
‘দশরা’র সাফল্যের পর আবারও একসঙ্গে নানি ও পরিচালক শ্রীকান্ত ওডেলা—খবরটি প্রকাশের পর থেকেই ‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তার ওপর ১৯৮০-এর দশকের সেকেন্দ্রাবাদ, প্রান্তিক একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই, অন্ধকার আবহ, বড় পরিসরের অ্যাকশন এবং অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সংগীত—সব মিলিয়ে প্রত্যাশার পারদ ছিল বেশ উঁচু।
২৪ সেপ্টেম্বর সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর অবশ্য সেই প্রত্যাশার সঙ্গে দর্শক-সমালোচকের প্রতিক্রিয়ার বেশ ফারাক দেখা যায়। নানির অভিনয়, সিনেমাটোগ্রাফি, আবহ ও অ্যাকশন দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন অনেকে। আবার গল্প বলার ধরন, অতিরিক্ত সহিংসতা, নারী চরিত্রের উপস্থাপন ও দ্বিতীয়ার্ধের দুর্বলতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া নানিকেও অবাক করেছে। অভিনেতার ভাষ্য, ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৩৩টি সিনেমা করার পর এমন প্রতিক্রিয়ার মুখে তিনি আগে কখনো পড়েননি।
তাহলে কী আছে ‘দ্য প্যারাডাইস’-এ, যা মুক্তির পর এত বিতর্ক তৈরি করেছে?
প্রান্তিক মানুষের গল্প, নাকি সহিংসতার প্রদর্শনী
সিনেমার গল্প ১৯৮০-এর দশকের সেকেন্দ্রাবাদে বসবাসকারী ‘সাভারি’ নামের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ঘিরে। তাদের নিজেদের পরিচয় নেই, সরকারি স্বীকৃতিও নেই। সমাজের প্রভাবশালী সামন্ততান্ত্রিক চরিত্র মালিকের নিয়ন্ত্রণে চলে তাদের জীবন।
দীর্ঘদিন পর নিজের সম্প্রদায়ে ফিরে আসে নানির চরিত্র জাডাল। পরিবার ও সম্প্রদায়ের ওপর চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সে।
শ্রীকান্ত ওডেলার ভাবনায় এটি কেবল প্রতিশোধের গল্প নয়। পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্পও। মুক্তির আগে পরিচালক বলেছিলেন, সিনেমায় এমন একটি জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে, যারা দেশের জন্য লড়াই করেও নিজেদের দেশে যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। সেই বঞ্চনা থেকেই তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, যা একসময় প্রতিরোধে রূপ নেয়।
কিন্তু এই বক্তব্য পর্দায় কীভাবে এসেছে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একাধিক সমালোচকের মতে, নিপীড়িত মানুষের জীবন ও আবেগকে গভীরভাবে তুলে ধরার আগেই সিনেমা বারবার সহিংস দৃশ্যে চলে গেছে। ‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নিপীড়নের গভীরে যাওয়ার বদলে অনেক সময় সিনেমাটি সেটিকে দৃশ্যমান বিনোদনে পরিণত করেছে। দুর্বল লেখা, বিশৃঙ্খল সম্পাদনা ও অতিরঞ্জিত অ্যাকশন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সমালোচকদের একাংশের মতে, সহিংসতা একপর্যায়ে এতটাই বেড়ে যায় যে চরিত্রগুলোর কষ্টের সঙ্গে দর্শকের আবেগের যোগাযোগ তৈরির বদলে তা দর্শককে ক্লান্ত করে।
নানির অভিনয়, কিন্তু চিত্রনাট্যে ঘাটতি
নানির অভিনয় নিয়ে অবশ্য বেশির ভাগ সমালোচনাতেই ইতিবাচক কথা এসেছে। অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর প্রস্তুতিও চোখে পড়ার মতো। তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চরিত্রটির জন্য লেখা চিত্রনাট্য নানির অভিনয়ের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সিনেমার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ইঙ্গিতও গল্পে প্রত্যাশিত গভীরতা তৈরি করতে পারেনি বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচনা এসেছে দ্বিতীয়ার্ধ নিয়েও। প্রথম অংশে সাভারি সম্প্রদায়ের জগৎ, জাডালের ফিরে আসা এবং মালিকের নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ দর্শকের আগ্রহ তৈরি করলেও পরে সেই গতি ধরে রাখা যায়নি বলে একাধিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে।
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার পর্যালোচনাতেও নানির অভিনয় ও সিনেমার নির্মিত জগতের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে গল্প একটা পর্যায়ে নিজের পথ হারিয়ে ফেলে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস আবার সিনেমাটিতে ‘দেজা ভ্যু’র অনুভূতির কথা বলেছে। অর্থাৎ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচার, প্রতিশোধ ও বিদ্রোহ—উপাদানগুলো নতুন কোনো ভাষায় উপস্থাপনের বদলে পরিচিত সিনেমার ছকেই ফিরে গেছে বলে মনে হয়েছে তাদের।
নারী চরিত্র নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন
‘দ্য প্যারাডাইস’-এর বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত জায়গাগুলোর একটি কায়াদু লোহার অভিনীত সুব্বলক্ষ্মী চরিত্র।
সিনেমায় সুব্বলক্ষ্মী দরিদ্র পরিবারের এক তরুণী। অর্থের প্রয়োজনে নিজের কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও তৈরি করে বিক্রি করে সে। কিন্তু কেন সে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তার নিজের ইচ্ছা কী, কীভাবে সে এই বাস্তবতার সঙ্গে লড়ছে—এসব খুব বেশি অনুসন্ধান করা হয়নি বলে সমালোচনা হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যে সিনেমা একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার কথা বলে, সেই সিনেমাই নারী চরিত্রকে যথেষ্ট ব্যক্তিসত্তা দিয়েছে কি না।
বিতর্ক আরও বাড়ে একটি সংলাপকে ঘিরে। সুব্বলক্ষ্মীর মা তাঁকে ‘সিঙ্গেল শট অভিনেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। চরিত্রটির শরীর ও ভিডিও তৈরির বিষয়টি যেভাবে পর্দায় দেখানো হয়েছে, সেটিকে অনেকে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন।
এখানে সমালোচনার প্রশ্নটি শুধু একটি দৃশ্য ভালো না খারাপ—সেটি নয়। বরং সিনেমার মূল বক্তব্যের সঙ্গে নারী চরিত্রের উপস্থাপনার সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
যে সিনেমা প্রান্তিক মানুষকে ‘মানুষ হিসেবে দেখার’ দাবি জানায়, সেখানে একজন তরুণীর শরীর ও যৌন আবেদনকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
নির্মাতারাও স্বীকার করলেন ভুল–বোঝাবুঝি
বিতর্কের এই অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত কথা বলতে হয়েছে নানি ও শ্রীকান্ত ওডেলাকেও। ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া বক্তব্যে তাঁরা জানান, ওই দৃশ্যের পেছনে আরও কিছু প্রেক্ষাপট ছিল। কিন্তু সম্পাদনার সময় সেই অংশ বাদ পড়ে যাওয়ায় দর্শকের কাছে দৃশ্যটির অর্থ ভিন্নভাবে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নির্মাতাদের উদ্দেশ্য আর পর্দায় শেষ পর্যন্ত যে অর্থ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছিল বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন।
মুক্তির আগেই আদালতে
‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরই শুরু হয়নি। মুক্তির আগেই বেঙ্গালুরুর একটি আদালত সিনেমাটিকে ঘিরে ‘মানহানিকর’ বা ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রকাশ ও ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
প্রযোজকদের বক্তব্য ছিল, সিনেমা মুক্তির আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট, মন্তব্য ও লিংকের মাধ্যমে মিথ্যা ও অবমাননাকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। এতে সিনেমার ব্যবসা ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তাঁরা দাবি করেন।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, আদালতের এই আদেশ কি সিনেমার
সমালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা?
পরে নানি বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, আদালতের আদেশ প্রকৃত সিনেমা-সমালোচনার বিরুদ্ধে নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই বা বট দিয়ে তৈরি মিথ্যা ও মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতেই এই আইনি পদক্ষেপ।
বুকমাইশোরে রিভিউ বন্ধ
মুক্তির পর নতুন করে আলোচনায় আসে বুকমাইশোরে ‘দ্য প্যারাডাইস’-এর রেটিং ও রিভিউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। সেখানে দেখা যায়, ‘রেটিং অ্যান্ড রিভিউ ডিজেবলড’। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল।
‘দ্য প্যারাডাইস’-এর ক্ষেত্রে বুকমাইশোর ঠিক কেন এবং কার অনুরোধে রেটিং ও রিভিউ বন্ধ করেছিল, প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নানির প্রতিক্রিয়া কী
তীব্র সমালোচনার মধ্যেও নানি দর্শকের প্রতিক্রিয়াকে এড়িয়ে যাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, দর্শকের ভালোবাসার পাশাপাশি ট্রল ও সমালোচনাও দেখেছেন। এমনকি কিছু সমালোচক যে ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো থেকেও শেখার কথা বলেছেন তিনি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নানি বলেন, ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৩৩টি সিনেমা করার পর এই প্রথম এত তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। সিনেমাটি পছন্দ না করলেও দর্শকের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যে প্রবল আবেগ ও সততা আছে, সেটিকেও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অর্থাৎ ছবিটির সমালোচনাকে শুধু আক্রমণ হিসেবে না দেখে আলোচনার অংশ হিসেবেই দেখছেন অভিনেতা।
বক্স অফিসে ভালোই চলছে
বক্স অফিসে মুক্তির প্রথম দিন ভারতে ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ রুপি নেট আয় করে ‘দ্য প্যারাডাইস’। এটি নানির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় উদ্বোধনী আয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দ্বিতীয় দিনেই আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ রুপি। তৃতীয় দিনে সামান্য বেড়ে আয় হয় ১৫ কোটি ২৫ লাখ রুপি। তৃতীয় দিন শেষে ভারতে সিনেমাটির মোট নেট আয় ৭৬ কোটি ৪০ লাখ রুপি। বিশ্বব্যাপী আয় ১১৯ কোটি ৫০ লাখ রুপি বলে ইন্ডাস্ট্রি ট্র্যাকার স্যাকনিল্কের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে