দিব্যা ভারতীর কষ্ট, নিজেকে ‘ব্যবহৃত’ মনে করতেন নায়িকা

দিব্যা ভারতী। আইএমডিবি

বলিউডের ইতিহাসে এমন অনেক তারকা আছেন, যাঁদের উত্থান ছিল বিস্ময়কর। দিব্যা ভারতী তাঁদেরই একজন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে পা রেখে তিন বছরের মধ্যেই ২২টি ছবিতে অভিনয়, শ্রীদেবীর সঙ্গে তুলনা—সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো ক্যারিয়ার। অথচ এই উজ্জ্বল সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর একাকিত্ব, ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা এবং এক তরুণীর মানসিক ভাঙন।

দিব্যা ভারতীর মৃত্যু বলিউড ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যময় ঘটনা। ৫ এপ্রিল ১৯৯৩, মুম্বাইয়ের নিজের অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলার বারান্দা থেকে পড়ে যান তিনি। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও, চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনাকে সরকারিভাবে দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। তবে সেই সময় থেকেই নানা গুঞ্জন, জল্পনা ও প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে, এটি কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল অন্য কোনো অজানা কারণ?

সম্প্রতি শিশুশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় হওয়া মাস্টার রাজু এক সাক্ষাৎকারে দিব্যা ভারতীর জীবনের সেই না-বলা অধ্যায়গুলোর কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে—খ্যাতির শিখরে থেকেও দিব্যা ছিলেন ‘অসুখী ও দুঃখী’, নিজেকে মনে করতেন ‘ব্যবহৃত’ আর ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো তাঁকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিচ্ছিল।

১৬ থেকে ১৯—তিন বছরে ২২টি ছবি, শ্রীদেবীর সঙ্গে তুলনা
দিব্যা ভারতী মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন। খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন প্রযোজক-পরিচালকদের প্রথম পছন্দ। ক্যারিয়ারের তিন বছরের মধ্যেই তিনি অভিনয় করেন ২২টি ছবিতে। এত অল্প সময়ে এত বড় সাফল্য বলিউডে বিরল।

দিব্যার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে অনেকেই তাঁকে শ্রীদেবীর উত্তরসূরি বা ‘ইয়াং শ্রীদেবী’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেন। ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে-বাইরে আলোচনা চলত, দিব্যাই নাকি হবেন ভারতীয় সিনেমার পরবর্তী সুপারস্টার।
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে চলছিল আরেক বাস্তবতা—এক তরুণীর মানসিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর ব্যক্তিগত জীবনের অসন্তোষ।

রাজু ও দিব্যা ভারতী। কোলাজ

মাস্টার রাজুর স্মৃতিতে দিব্যা: ‘আমরা ডিস্কো আর বারে যেতাম’
সিনেমা ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ মাস্টার রাজু সম্প্রতি সিদ্ধার্থ কান্নানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিব্যা ভারতীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলেন। রাজু বলেন, ‘দিব্যা ভারতী আর পূজা ভাট—এই দুই নায়িকার সঙ্গেই আমি খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তাঁরা দুজনই খুব দয়ালু ছিলেন, একেবারেই ফিল্মি ধরনের না। দিব্যার সঙ্গে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি; আমরা একসঙ্গে ডিস্কো আর বারে যেতাম। সালমান খানের মতো দিব্যাও ছিল আমার খুব কাছের বন্ধু। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম।’
এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে দিব্যা শুধু সহশিল্পী নন, রাজুর কাছে ছিলেন একান্ত বন্ধু। তাঁদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত ও আন্তরিক।

আরও পড়ুন

‘ইয়াং শ্রীদেবী’, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাঙন
মাস্টার রাজু আরও বলেন, ‘মানুষ তাকে শ্রীদেবীর বিকল্প, ইয়াং শ্রীদেবী বলত। তার ক্যারিয়ার ছিল অসম্ভব সম্ভাবনাময়। তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলো এখন আর রেকর্ডে বলতে চাই না। কারণ সে আর আমাদের ভেতর নেই।’

এই মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে দিব্যার জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে এমন অনেক অজানা অধ্যায় আছে, যেগুলো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।

‘দিব্যা নিজেকে ব্যবহৃত মনে করত’ সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আবেগময় ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ আসে, যখন মাস্টার রাজু দিব্যার মানসিক অবস্থার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সে আমাকে অনেক কিছু বলেছিল। অনেক মানুষের উদাহরণও দিয়েছিল। সে ভীষণ একা আর দুঃখী ছিল। আজ আর নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করার মানে হয় না। ক্যারিয়ার নিয়ে সে খুব খুশি ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো নিয়ে নয়। বিষয়টা শুধু পুরুষ বা প্রেমিকদের নিয়ে ছিল না; অন্য মানুষদের নিয়েও ছিল। সে নিজেকে ব্যবহৃত মনে করত। তার মনে হতো, সে যেহেতু কাজ করছে আর টাকা উপার্জন করছে, তাই মানুষ তার টাকাপয়সার অপব্যবহার করছে। এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।’

এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, খ্যাতি ও অর্থের সঙ্গে সঙ্গে দিব্যার জীবনে ঢুকে পড়েছিলেন এমন কিছু মানুষ, যাঁরা তাঁর সরলতা ও সাফল্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছিলেন। এই উপলব্ধিই তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছিল।

দিব্যা ভারতী। আইএমডিবি

বিয়ে ও স্বস্তি: সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক
তবে মাস্টার রাজু জানান, দিব্যার জীবনের একমাত্র স্থিতিশীল ও আশাব্যঞ্জক দিক ছিল তাঁর স্বামী, প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক। রাজুর ভাষায়, ‘তার জীবনে যে মানুষ ছিল, তার ব্যাপারে সে খুবই ইতিবাচক ছিল। সে সন্তুষ্ট ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিল। ওই দিকটা তার জীবনে ঠিকই ছিল।’

এই বক্তব্যে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত জীবনের অনেক জটিলতার মধ্যেও সাজিদের সঙ্গে সম্পর্কেই দিব্যা কিছুটা মানসিক স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

দিব্যা ভারতীর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে তামিল ছবি ‘নীলা পেন্নে’ দিয়ে। সেখান থেকে খুব দ্রুত তিনি হিন্দি সিনেমায় জায়গা করে নেন এবং একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করেন। দিব্যার প্রাণবন্ত উপস্থিতি, ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক অভিনয় আর তরুণ বয়সের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন প্রিয় মুখ। আজকের দিনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা যতটা স্বাভাবিক, নব্বইয়ের দশকে তা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। অল্প বয়সে হঠাৎ পাওয়া বিপুল খ্যাতি, অর্থ আর প্রত্যাশার চাপ—দিব্যার মতো এক কিশোরীর জন্য তা সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাস্টার রাজুর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দিব্যা শুধু বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের লড়াইটাও লড়ছিলেন। তিনি একদিকে ছিলেন সফল তারকা, অন্যদিকে ছিলেন একা, বিষণ্ন ও অব্যবহারের শিকার এক তরুণী।

৫ এপ্রিল ১৯৯৩: একটি সন্ধ্যা, যা বদলে দিল সবকিছু
দিব্যা ভারতীর মৃত্যু বলিউড ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যময় ঘটনা। ৫ এপ্রিল ১৯৯৩, মুম্বাইয়ের নিজের অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলার বারান্দা থেকে পড়ে যান তিনি। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও, চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনাকে সরকারিভাবে দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। তবে সেই সময় থেকেই নানা গুঞ্জন, জল্পনা ও প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে, এটি কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল অন্য কোনো অজানা কারণ?

হাসপাতালে সেই রাত: ‘তিনি একা ছিলেন’
প্রযোজক পহলাজ নিহালানি, যিনি দিব্যাকে ‘শোলা অউর শবনম’ ছবিতে সাইন করিয়েছিলেন, পরে পিঙ্কভিলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তিনি তখন একেবারে একা ছিলেন। তখনো কেউ আসেনি। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি হাসপাতালে ছুটে যাই।’

মাস্টার রাজুর কথায়, ‘যখন সে মারা গেল, আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। আমি প্রথম ব্যক্তি ছিলাম যে সেখানে পৌঁছাই, আর শেষ ব্যক্তি ছিলাম যে সেখান থেকে বের হই। এটা ছিল ভয়ংকর। এটা হওয়া উচিত ছিল না।’

দিব্যার শুরু: তামিল ছবি থেকে বলিউড সুপারস্টার
দিব্যা ভারতীর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে তামিল ছবি ‘নীলা পেন্নে’ দিয়ে। সেখান থেকে খুব দ্রুত তিনি হিন্দি সিনেমায় জায়গা করে নেন এবং একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করেন।

দিব্যার প্রাণবন্ত উপস্থিতি, ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক অভিনয় আর তরুণ বয়সের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন প্রিয় মুখ।

আজকের দিনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা যতটা স্বাভাবিক, নব্বইয়ের দশকে তা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। অল্প বয়সে হঠাৎ পাওয়া বিপুল খ্যাতি, অর্থ আর প্রত্যাশার চাপ—দিব্যার মতো এক কিশোরীর জন্য তা সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।
মাস্টার রাজুর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দিব্যা শুধু বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের লড়াইটাও লড়ছিলেন। তিনি একদিকে ছিলেন সফল তারকা, অন্যদিকে ছিলেন একা, বিষণ্ন ও অব্যবহারের শিকার এক তরুণী।

উত্তরাধিকার: স্মৃতিতে বেঁচে থাকা দিব্যা ভারতী
মাত্র ১৯ বছর বয়সে দিব্যার জীবন থেমে গেলেও, তাঁর স্মৃতি আজও বেঁচে আছে দর্শকের মনে। নব্বইয়ের দশকের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে দিব্যা মানেই উচ্ছ্বাস, রোমান্টিকতা আর এক অসমাপ্ত সম্ভাবনার গল্প।
দিব্যার মৃত্যু শুধু এক তারকার মৃত্যু নয়, এটি ছিল এক সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের আকস্মিক ইতি, এক তরুণীর না-বলা কষ্টের শেষ অধ্যায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে