ভালোবাসা ভাঙা সম্পর্ক সারাতে পারে না, বিচ্ছেদ নিয়ে সেলিনা
বলিউড অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন লেখায় তাঁর ১৫ বছরের দাম্পত্যজীবনের অজানা ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন। সুইস নাগরিক পিটার হাগের সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ দাম্পত্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মানসিক নির্যাতন, অভিযোগ অনুযায়ী শারীরিক নির্যাতন এবং দীর্ঘদিনের সহনশীলতার গল্প।
২০২৫ সালের নভেম্বরে মুম্বাইয়ের একটি আদালতে সেলিনা বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। সেখানে তিনি গার্হস্থ্য সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। এত দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশ্যে তাঁদের সংসারকে ‘সুখী ও স্বাভাবিক’ বলেই মনে হতো; কিন্তু সাম্প্রতিক এই প্রকাশ সেই ছবিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
লেখাই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন
সেলিনা জানান, কঠিন দাম্পত্যজীবনে টিকে থাকার অন্যতম উপায় ছিল লেখা। নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য তিনি বারবার কলমের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, যখন তিনি কথা বলতে পারতেন না, যখন তাঁকে শোনা হতো না, তখন লেখা ছিল তাঁর আশ্রয়।
সেলিনা লিখেছেন, ভাঙা বাস্তবতার আড়ালে সুন্দর সবকিছুর গল্প ছিল তাঁর জীবন। ভালোবাসা, যন্ত্রণা আর টিকে থাকার লড়াই—এই তিনের মিশেলেই কেটেছে তাঁর দাম্পত্যজীবন। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কাউকে বেশি ভালোবেসে বদলে ফেলা যায় না। যা ভেঙে গেছে, শুধু ভালোবাসা দিয়ে তা জোড়া লাগানো সম্ভব নয়।
চিঠিতে ছিল ভালোবাসা, আশা আর টিকে থাকার চেষ্টা
সেলিনা জানান, বহু বছর ধরে তিনি স্বামীকে চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠিগুলোতে তিনি ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আকুতি তুলে ধরতেন। নিজের ভাষায় তিনি বোঝাতে চাইতেন সংসার ও পরিবারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।
সেলিনা বলেন, এই চিঠিগুলোর মাধ্যমে তিনি স্বামীর আত্মসম্মান জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, সম্পর্কের ফাটল সারানোর চেষ্টা করেছেন এবং সন্তানদের কথা ভেবে সংসার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
সময়ের সঙ্গে লেখার ভাষাও বদলে যায়
কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেলিনার লেখার ধরনও বদলে যেতে থাকে। চিঠিগুলো আর শুধু ভালোবাসার কথা বলত না, বরং সেখানে উঠে আসতে থাকে তাঁর বাস্তব জীবনের কষ্টের ছবি। তিনি লেখেন, কীভাবে তাঁকে বারবার চুপ করিয়ে দেওয়া হতো, তাঁর কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হতো এবং প্রতিবারই সব দোষ তাঁর ঘাড়ে চাপানো হতো।
সেলিনা জানান, এই লেখাগুলো কোনো কল্পনা নয়—এগুলো ছিল নির্যাতনের দলিল। দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি ছোট ছোট আশার টুকরা আর সামান্য উষ্ণ মুহূর্ত আঁকড়ে ধরে টিকে ছিলেন; কিন্তু একসময় তাঁর লেখাও আর বাস্তবতা ঢেকে রাখতে পারেনি।
ভালোবাসা ছিল সহনশীলতার ভাষা
সেলিনা স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ মানে এই নয় যে সেখানে নির্যাতন ছিল না। বরং সেই ভালোবাসা ছিল সহ্য করার, টিকে থাকার এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার একটি উপায়।
সেলিনা বলেন, অনেক নির্যাতিত মানুষ সামান্য আশার জানালা আঁকড়ে ধরে থাকে। তারা থেকে যায় এই বিশ্বাসে যে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তারা দুর্বল বলে নয়, বরং আশা, ভয়, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসাই অনেক সময় তাদের বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে ওঠে।
পরিবার ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
২০১০ সালে সেলিনা ও পিটার বিয়ে করেন। ২০১২ সালে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় যমজ পুত্রসন্তান। ২০১৭ সালে আবারও যমজ সন্তানের জন্ম দেন সেলিনা। তবে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায় তাঁদের এক সন্তানের অকালমৃত্যু হয়, যা তাঁদের পরিবারের জন্য বড় এক ট্র্যাজেডি হয়ে আসে।
আইনি লড়াই ও সম্পত্তি বিতর্ক
সেলিনার আইনজীবীর বরাতে জানা যায়, সেলিনা জানতে পারেন, অস্ট্রিয়ার রাজধানীতে থাকা কিছু সম্পত্তি তাঁর অজান্তেই বিক্রি করা হচ্ছে। এরপরই আইনি জটিলতা বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, পিটার অস্ট্রিয়ায় আদালতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন, যাতে সেলিনার ওই সম্পত্তির ওপর কোনো দাবি না থাকে।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, পিটার দাম্পত্য ভাঙনের জন্য সেলিনাকেই দায়ী করছেন। অন্যদিকে সেলিনা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন।
‘ভালোবাসা সবকিছু সারাতে পারে না’
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সারকথা হিসেবে সেলিনা যে কথাটি সবচেয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, তা হলো—ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু ঠিক করা যায় না। যে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, সেখানে শুধু ভালোবাসা দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে