মাত্র ১০ বাই ১০ ফুটের ঘর থেকে বড় বাংলো, সব হারিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন জ্যাকি

সিনেমার দৃশ্যে জ্যাকি শ্রফ। অভিনেতার ফেসবুক থেকে

মুম্বাইয়ের টিন বাত্তি এলাকার একটি চাওল (ছোট কামরার বহুতল ভবন)। মাত্র ১০ বাই ১০ ফুটের ঘর। সেখানেই পরিবারের সঙ্গে বড় হয়েছেন জ্যাকি শ্রফ। একসময় যে ঘরে জায়গা ভাগ করে থাকতে হতো, সেই ছেলেই পরে বলিউডের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা হয়ে ওঠেন। খ্যাতি আসে, অর্থ আসে, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি—সবই আসে জীবনে। কিন্তু সেই সচ্ছলতা একসময় আবার ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়ে।

২০০৩ সালের ছবি ‘বুম’ প্রযোজনার সিদ্ধান্ত জ্যাকি শ্রফের পরিবারকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছিল যে বাড়ির আসবাব পর্যন্ত একে একে বিক্রি করতে হয়। চার শয্যার ফ্ল্যাটও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। পরে স্ত্রী আয়েশা ও দুই সন্তান টাইগার ও কৃষ্ণাকে নিয়ে ছোট বাড়িতে উঠতে হয়।

জ্যাকি শ্রফের জীবন তাই শুধু চাওল থেকে বলিউড তারকা হয়ে ওঠার গল্প নয়; এটি অর্থ, সাফল্য, ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেতা।

তবে এত বছর পরও চাওলের স্মৃতি তাঁর কাছে আলাদা। সেই ঘর এখন আর তাঁর দখলে নেই। কিন্তু সেখানে কাটানো ৩৩ বছর ভুলতে পারেননি তিনি। এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকি জানান, পুরোনো ঘরটি আবার ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর আছে। বাড়ির মালিক রাজি না হলেও তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যান, বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করেন।

১০ বাই ১০ ফুটের ঘর
জ্যাকি শ্রফ বড় হয়েছেন মুম্বাইয়ের টিন বাত্তি এলাকার চাওলে। তাঁর বাবা ছিলেন জ্যোতিষী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল ছিল না। সাম্প্রতিক একাধিক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জানিয়েছেন, জীবনের প্রথম ৩৩ বছর কেটেছে সেই চাওলেই। এমনকি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কিছুদিন সেখানে ছিলেন তিনি।
চাওলের জীবনযাত্রা ছিল খুবই সাধারণ। শৌচাগার ছিল সবার জন্য, সেখানে যাওয়ার জন্যও লাইনে দাঁড়াতে হতো। পরে জ্যাকি স্মরণ করেছেন, জীবনের প্রথমদিককার কয়েক বছর শুটিংয়ে যাওয়ার আগে কিংবা কাজের ফাঁকে তাঁকে এই বাস্তবতার মধ্যেই থাকতে হতো।

জ্যাকি শ্রফ। অভিনেতার ফেসবুক থেকে

মজার ব্যাপার হলো, তখন থেকেই গাড়ির প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ ছিল। আয় করতে শুরু করার পর সঞ্চয়ের চেয়ে পরিবার, বন্ধু ও প্রয়োজনের মানুষকে সাহায্য করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। নিজের ভাষায়, টাকা এলেই তিনি তা দিয়ে দিতেন। ফলে অর্থ উপার্জন করলেও সঞ্চয় খুব একটা হতো না।

মডেলিং থেকে সিনেমা
অভিনয়ে আসার আগে জ্যাকি শ্রফ মডেলিং করতেন। সেই সময়ই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় দেব আনন্দের। ১৯৮২ সালে দেব আনন্দের ‘স্বামী দাদা’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ১৯৮৩ সালে সুভাষ ঘাইয়ের ‘হিরো’ তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে দেয়।

‘হিরো’র সাফল্যের পর আর পেছন তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছবিতে কাজ করতে থাকেন তিনি। অ্যাকশন, রোমান্স, পারিবারিক গল্প—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন। আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন।
খ্যাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলাতে থাকে আর্থিক অবস্থাও।

প্রথম বড় বাড়ি, স্ত্রীর বড় ত্যাগ
অভিনয় থেকে আয় শুরু হলেও নিজের জন্য স্থায়ী বাড়ি কেনার ব্যাপারে জ্যাকির তেমন আগ্রহ ছিল না। গাড়ি কেনা, পরিবারকে সাহায্য করা কিংবা দরিদ্র মানুষকে অর্থ দেওয়া—এসবেই তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর মা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। অভিনেতা শক্তি কাপুরের সঙ্গে জ্যাকির পরিচয় ছিল ‘স্বামী দাদা’ থেকেই। শক্তি কাপুরও তাঁকে বোঝান, শুধু অর্থ উপার্জন করলেই হবে না, নিজের একটি বাড়িও থাকা দরকার।

পরে জ্যাকি জানান, তাঁকে বাড়ি কিনতে সাহায্য করতে স্ত্রী আয়েশা নিজের বাড়ি বিক্রি করেছিলেন। আয়েশা ছিলেন তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের মেয়ে; তাঁর বাবা ছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল। তবু জ্যাকির সংগ্রামের সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন তিনি। এমনকি চাওলের জীবনযাত্রার সঙ্গেও মানিয়ে নিয়েছিলেন।
একসময় সেই ছোট ঘর ছেড়ে বড় বাড়ির মালিক হন জ্যাকি। তাঁর জীবনে তখন যেন স্বপ্নপূরণের সময়।

বাবার তারকাখ্যাতির আড়ালে ‘বুম’-এর ব্যর্থতার ধাক্কা টাইগারের শৈশবেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরে তিনি বলেছেন, পরিবারের আর্থিক সংকটের সময় ছোটবেলায় অনেক কিছু বুঝতে না পারলেও ঘরের জিনিসপত্র একে একে বিক্রি হতে দেখেছেন।
টাইগার একসময় এমনও জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে তিনি তাঁদের হারানো বাড়িটি আবার কিনে বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিতে চান। কিন্তু জ্যাকি ও আয়েশা সেই পুরোনো বাড়ি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। জ্যাকির ভাষ্য অনুযায়ী, আয়েশার মনোভাব ছিল—যা চলে গেছে, তা চলে গেছে।

‘বুম’ বদলে দিল সব
অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জ্যাকি প্রযোজনায় নামেন। স্ত্রী আয়েশা শ্রফের প্রযোজনায় তৈরি হয় ‘বুম’। কাইজাদ গুস্তাদের পরিচালনায় ২০০৩ সালের এই ছবিতে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন, জ্যাকি শ্রফ, গুলশন গ্রোভার, জিনাত আমান, পদ্মা লক্ষ্মী ও ক্যাটরিনা কাইফ। এই ছবির মাধ্যমেই বলিউডে অভিষেক হয় ক্যাটরিনার।

ছবিটি ঘিরে শুরুতে বড় প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মুক্তির পর বক্স অফিসে ব্যর্থ হয় ‘বুম’। আর সেই ব্যর্থতার আর্থিক অভিঘাত সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ে শ্রফ পরিবার।
জ্যাকি পরে জানিয়েছেন, ব্যবসায় টাকা হারানোর বিষয়টি তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দেনা পরিশোধ করাও ছিল তাঁদের দায়িত্ব। পরিবারের নামের সঙ্গে কোনো ঋণ বা দেনা জড়িয়ে থাকুক, সেটা তিনি চাননি। তাই যতটা সম্ভব কাজ করে সেই অর্থ পরিশোধ করেন।

বিক্রি হলো বাড়ি, একে একে গেল আসবাব
‘বুম’-এর ব্যর্থতার পর পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছিল, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় টাইগার শ্রফের পুরোনো সাক্ষাৎকারে।

২০১৯ সালে টাইগার জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়ির আসবাব একে একে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। শৈশব থেকে যে জিনিসগুলো ঘরে দেখে বড় হয়েছেন, সেগুলো হঠাৎ অদৃশ্য হতে শুরু করে। এমনকি তাঁর বিছানাও বিক্রি হয়ে যায়। একসময় মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল তাঁকে।

পরিবারকে শেষ পর্যন্ত চার শয্যার বান্দ্রার ফ্ল্যাট বিক্রি করে খারে দুই শয্যার একটি বাড়িতে উঠতে হয়।

জ্যাকি নিজেও পরে বলেছেন, ‘বুম’-এর পর তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে তাঁকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়েছে। তবে সেই সময়ের জন্য কাউকে দায়ী না করে ব্যবসার উত্থান-পতন হিসেবেই বিষয়টিকে দেখেছেন তিনি।

ছেলেও ভুলতে পারেননি সেই দিনগুলো
বাবার তারকাখ্যাতির আড়ালে ‘বুম’-এর ব্যর্থতার ধাক্কা টাইগারের শৈশবেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরে তিনি বলেছেন, পরিবারের আর্থিক সংকটের সময় ছোটবেলায় অনেক কিছু বুঝতে না পারলেও ঘরের জিনিসপত্র একে একে বিক্রি হতে দেখেছেন।
টাইগার একসময় এমনও জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে তিনি তাঁদের হারানো বাড়িটি আবার কিনে বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিতে চান। কিন্তু জ্যাকি ও আয়েশা সেই পুরোনো বাড়ি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। জ্যাকির ভাষ্য অনুযায়ী, আয়েশার মনোভাব ছিল—যা চলে গেছে, তা চলে গেছে।

আরও পড়ুন

আবার ঘুরে দাঁড়ানো
‘বুম’ ব্যর্থ হলেও জ্যাকি শ্রফের ক্যারিয়ার থেমে যায়নি; বরং তিনি অভিনয়ে আরও মনোযোগ দেন। হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার চলচ্চিত্র ও পরে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

গত কয়েক বছরে একাধিক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই কঠিন সময়ের কথা খোলামেলা বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে বারবার এসেছে—টাকা হারানো জীবনের শেষ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিস্থিতি সামলে আবার দাঁড়ানো।

বর্তমানে জ্যাকি শ্রফ মুম্বাইয়ে নিজের বাড়ির পাশাপাশি মুম্বাই-পুনের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৪৪ হাজার বর্গফুটের একটি ফার্মহাউসের মালিক বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এত বছর পরও চাওলের স্মৃতি তাঁর কাছে আলাদা। সেই ঘর এখন আর তাঁর দখলে নেই। কিন্তু সেখানে কাটানো ৩৩ বছর ভুলতে পারেননি তিনি। এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকি জানান, পুরোনো ঘরটি আবার ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর আছে। বাড়ির মালিক রাজি না হলেও তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যান, বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে