প্রথম ছবি ফ্লপ, এখন ছবিপ্রতি ১৭ কোটি পারিশ্রমিক নেন এই নায়িকা
বলিউডে তারকাসন্তানদের অভাব নেই। কিন্তু তারকাসন্তান হলেই যে সাফল্য নিশ্চিত—এমন ভাবলে ভুল হবে। আলোঝলমলে পরিবারের ভেতর থেকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হয় বারবার। শ্রদ্ধা কাপুর সেই প্রমাণেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মিষ্টি হাসি, নরম কণ্ঠ আর পর্দায় স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জেদি, পরিশ্রমী ও আত্মসংগ্রামী শিল্পীর গল্প। গতকাল ৩ মার্চ শ্রদ্ধা কাপুরের জন্মদিন ছিল, এ উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক শ্রদ্ধা সম্পর্কে কিছু জানা–অজানা গল্প।
তারকা পরিবারে জন্ম, তবু অনিশ্চয়তার শুরু
১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ মুম্বাইয়ে জন্ম শ্রদ্ধার। বাবা শক্তি কাপুর বলিউডের পরিচিত অভিনেতা, মা শিবাঙ্গী কাপুরও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের পরিবেশে বড় হয়েছেন। কিন্তু এই পরিচিত পরিবেশ তাঁকে সহজ রাস্তা দেয়নি। জামনাবাই নার্সি স্কুলে পড়াশোনা করার সময় থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বলিউডের আরও কয়েকজন ভবিষ্যৎ তারকা। তবে পড়াশোনায়ও তিনি ছিলেন মনোযোগী।
বিদেশের জীবন
স্কুল শেষ করে শ্রদ্ধা যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হন। পরিবার চেয়েছিল তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে স্থিতিশীল জীবন বেছে নিন। বিদেশের জীবন তাঁর কাছে ছিল স্বাধীনতার এক নতুন অধ্যায়—নিজে রান্না করা, পার্টটাইম কাজ, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হোস্টেলজীবন—সবকিছুই ছিল স্বপ্নময়, আবার বাস্তবতার কঠিন পাঠও। পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফেরার আগে যুক্তরাষ্ট্রেই শ্রদ্ধা নেমেছিলেন নানা খণ্ডকালীন কাজে। কাজ করেছেন কফি শপে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কফি বানিয়ে দিতেন ক্রেতাদের জন্য। আবার স্যান্ডউইচও বিক্রি করেছেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সেই সব দিন তাঁকে আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দিয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবনের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে, যা পরে অভিনয়জীবনেও কাজে এসেছে।
এই সময়েই তাঁর জীবনের বড় সিদ্ধান্ত আসে। একটি ছবির প্রস্তাব পান। বহু ভাবনার পর পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন। অনেকেই বলেছিলেন, ডিগ্রি ছেড়ে অভিনয়ে ঝাঁপ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু শ্রদ্ধা মনে করেছিলেন, নিজের স্বপ্নকে আর পিছিয়ে রাখা যাবে না।
প্রথম ধাক্কা: ব্যর্থ অভিষেক
২০১০ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘তিন পাত্তি’ মুক্তি পায়। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে সফল হয়নি। সমালোচকরাও বিশেষ প্রশংসা করেননি। তারকাসন্তান হয়েও শুরুতেই ব্যর্থতা—এটি তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো আর টিকবেন না। কিন্তু এখানেই শুরু তাঁর আসল লড়াই। অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন, নিজেকে আরও প্রস্তুত করেন। ক্যামেরার সামনে স্বাচ্ছন্দ্য, সংলাপ বলার ভঙ্গি—সবকিছুতে কাজ করেন নতুন করে।
উত্থান: এক প্রেমের গল্পে তারকাখ্যাতি
২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া একটি সংগীতনির্ভর প্রেমের ছবি ‘আশীকি ২’তে অভিনয় করে শ্রদ্ধা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর চরিত্র, সংলাপ, গান—সবকিছুই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। শুধু অভিনয় নয়, গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। এই ছবির সাফল্য তাঁকে বলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে আসে।
আদিত্য রায় কাপুরের সঙ্গে জুটি বেঁধে এই ছবিতেই যেন জন্ম নিলেন এক নতুন নায়িকা। গান, অভিনয় আর গল্প—সব মিলিয়ে ছবিটি হিট হওয়ার পাশাপাশি শ্রদ্ধাকেও পৌঁছে দিল ঘরে ঘরে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন নিজের অভিনয়ের সামর্থ্য—‘এক ভিলেন’, ‘ওকে জানু’, ‘হায়দার’, ‘ছিছোড়ে’ কিংবা ‘স্ত্রী’—সবখানেই শ্রদ্ধা প্রমাণ করেছেন নিজেকে। বিশেষ করে ‘ছিছোড়ে’ তাঁকে এনে দেয় ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ, যা সমালোচকদের কাছ থেকেও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
সবশেষে এল ‘স্ত্রী ২’। ২০২৪ সালের এই হরর-কমেডি শুধু বলিউডেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ঝড় তোলে। ছবিটি বিশ্বজুড়ে আয় করে ৮৮৪ দশমিক ৪৫ কোটি রুপি। এর মাধ্যমে শ্রদ্ধা কাপুর পৌঁছে যান সেই কাতারে, যেখানে কেবল হাতে গোনা কয়েকজন অভিনেত্রী জায়গা করে নিতে পেরেছেন। এই সাফল্য তাঁকে প্রমাণ করে দিয়েছে বলিউডের সবচেয়ে ‘ব্যাংকেবল’ তারকাদের একজন হিসেবে।
অভিনয়ের বাইরেও এক শিল্পী
শ্রদ্ধা শুধু অভিনেত্রী নন; তিনি গায়িকাও। কয়েকটি ছবিতে নিজেই গান গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে কোমলতা আছে, যা পর্দার চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাচেও পারদর্শী তিনি। মঞ্চে লাইভ পারফরম্যান্সে তাঁর আত্মবিশ্বাস চোখে পড়ে।
এখন অনেকেই বলেন যে ওটিটি আসার পর বিনোদনজগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমি মনে করি, ওটিটির আগেই এই ঢেউ এসেছে। “নিরজা”র মতো সিনেমা ওটিটি যুগের আগে মুক্তি পেয়েছে। আগেও এমন সব ছবি মুক্তি পেয়েছে, যা নারীকেন্দ্রিক। তাই অনেক সময় মানুষ যখন বলেন যে এসব ওটিটিতেই এটা সম্ভব, আমি পুরোপুরি সহমত নই। গতানুগতিক গল্পের বাইরে ব্যতিক্রম সিনেমা আগেও মুক্তি পেয়েছে, সফলও হয়েছে।
সংগ্রাম: তুলনা ও প্রত্যাশার চাপ
তারকাসন্তান হওয়ার কারণে শ্রদ্ধাকে সব সময় তুলনার মুখে পড়তে হয়েছে। কেউ বলেছে তিনি বাবার খ্যাতির সুবিধা পেয়েছেন, কেউ বলেছেন তাঁর অভিনয় সীমিত। এই মন্তব্যগুলো তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু থামাতে পারেনি। বলিউডে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, ধৈর্যও প্রয়োজন। ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকটি ছবি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তখন আবারও সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। শ্রদ্ধা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কম কথা বলেন। প্রেমের গুঞ্জন, সম্পর্কের জল্পনা—সব সময়ই ছিল, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে কখনো নাটকীয় কিছু করেননি। তাঁর এই সংযত স্বভাব তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। পরিবারের সঙ্গে তাঁর বন্ধন দৃঢ়। প্রায়ই মা–বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
সামাজিক উদ্যোগ ও সচেতনতা
শ্রদ্ধা পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সোচ্চার। প্লাস্টিকবিরোধী প্রচারণা, প্রাণী অধিকার—এসব বিষয়ে তিনি কাজ করেন। বিভিন্ন দাতব্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট।
আর্থিক সাফল্য ও সম্পদের পরিমাণ
বলিউডে এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করার ফলে শ্রদ্ধা কাপুর এখন আর্থিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন চলচ্চিত্র, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট, স্টেজ শো ও প্রযোজনা–সংশ্লিষ্ট কাজ থেকে তাঁর আয় আসে। বিনোদনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় আর্থিক বিশ্লেষণ সূত্রের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি রুপি। ‘স্ত্রী ২’-এর সফলতার পর নিজের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ বাড়িয়েছেন শ্রদ্ধা, দিয়েছেন অতিরিক্ত কিছু শর্তও। জানা গেছে, একতা কাপুর প্রযোজিত একটি নতুন থ্রিলারধর্মী সিনেমায় অভিনয় করতে যাচ্ছেন এই বলিউড অভিনেত্রী। চলতি বছর সিনেমাটির শুটিং শুরু হওয়ার কথা। এ সিনেমার জন্য ১৭ কোটি রুপি পারিশ্রমিক দাবি করেছেন শ্রদ্ধা, যেখানে আগে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ৮ থেকে ৯ কোটি রুপির মধ্যে। শুধু তা-ই নয়, সিনেমার লভ্যাংশ থেকেও একটি অংশ দাবি করেছেন তিনি।
কী ভাবছেন শ্রদ্ধা
শ্রদ্ধা কাপুর মনে করেন, একটা সিনেমা সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেন, ‘এখন অনেকেই বলেন যে ওটিটি আসার পর বিনোদনজগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমি মনে করি, ওটিটির আগেই এই ঢেউ এসেছে। “নিরজা”র মতো সিনেমা ওটিটি যুগের আগে মুক্তি পেয়েছে। আগেও এমন সব ছবি মুক্তি পেয়েছে, যা নারীকেন্দ্রিক। তাই অনেক সময় মানুষ যখন বলেন যে এসব ওটিটিতেই এটা সম্ভব, আমি পুরোপুরি সহমত নই। গতানুগতিক গল্পের বাইরে ব্যতিক্রম সিনেমা আগেও মুক্তি পেয়েছে, সফলও হয়েছে।’
শ্রদ্ধা স্বীকার করেন যে তাঁর কাছে বেশ কিছু ছবির প্রস্তাব এসেছে, যেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাননি, চরিত্রগুলো গৌণ ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করি। আমাকে তাঁরা ভালো চরিত্রে দেখতে চান। আমি আগামী দিনে আরও ভালো চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরতে চাই।’ এই অভিনেত্রী প্রয়াত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর আর অভিনেত্রী পদ্মিনী কোলহাপুরীর বায়োপিক ছবিতে কাজ করতে চান।
ইন্ডিয়াডটকম, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে