রাস্তায় ঘুমাতেন, সেখান থেকেই বলিউডের খ্যাতিমান লেখক

শৈশবে জাভেদ আখতারছবি: এক্স

বর্ষীয়ান ভারতীয় লেখক ও গীতিকার জাভেদ আখতারের জন্মদিন আজ। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি কয়েক দশক ধরে সমৃদ্ধ করেছেন ভারতীয় সিনেমা। তবে তাঁর সাফল্য সহজে আসেনি। এই দীর্ঘ পথচলার আগে ছিল চরম সংগ্রাম। জন্মদিনে জেনে নেওয়া যাক তাঁর কিছু সংগ্রামের গল্প।
১৯ বছর বয়সে একটাই স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে পা রাখেন জাভেদ আখতার—কিংবদন্তি নির্মাতা গুরু দত্তের সহকারী হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, জাভেদের মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর এক সপ্তাহের মধ্যেই গুরু দত্তের মৃত্যু হয়। সেখানেই হঠাৎ করে ভেঙে যায় তাঁর স্বপ্ন।

জাভেদ আখতার
ছবি: এএনআই

খ্যাতনামা কবি জান নিসার আখতারের পুত্র জাভেদ এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে কবিতা ও সাহিত্য ছিল শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক! লেখালেখি তাঁর রক্তেই ছিল। কিন্তু মুম্বাই শহরে টিকে থাকতে হলে কাজ দরকার। যে মুম্বাই তিনি রাজ করেছেন, সেখানেই দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।


ঘোস্টরাইটার হতে অস্বীকৃতি
চাকরির খোঁজে জাভেদ আখতার পৌঁছান মীনা কুমারীর স্বামী এবং ‘মহল’ ও ‘পাকিজা’র মতো ছবির পরিচালক কামাল আমরোহির কাছে। এখানে তিনি প্রায় এক বছর কাজ করেন, মাসিক বেতন ছিল ৫০ রুপি। এই সময়ে এক খ্যাতনামা লেখকের হয়ে ঘোস্টরাইটার (ছায়া লেখক) হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব পান তিনি। পারিশ্রমিক ছিল বেশ ভালো। কিন্তু তিন দিন ভেবে জাভেদ বুঝেছিলেন—টাকার চেয়ে নাম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেন। এ সিদ্ধান্তই পরবর্তী জীবনে তাঁর পথ নির্ধারণ করে দেয়।

কঠিন সংগ্রাম
জাভেদ আখতারের সংগ্রামের দিনগুলো ছিল ভয়াবহ কষ্টের। ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ নামের একটি তথ্যচিত্রে নিজের শুরুর দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় করে মুম্বাই এসেছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে থেকেছি, রেলস্টেশন, পার্ক, স্টুডিওর প্রাঙ্গণ, করিডর, বেঞ্চ—যেখানে জায়গা পেয়েছি, সেখানেই ঘুমিয়েছি। অনেক দিন বাসভাড়ার টাকা না থাকায় দাদর থেকে বান্দ্রা পর্যন্ত হেঁটে গেছি। কোনো কোনো দিন হঠাৎ মনে পড়ত, টানা দুই দিন কিছু খাইনি। তখন নিজেকে বলতাম—একদিন যদি আমার জীবনী লেখা হয়, এই সময়গুলোই হবে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায়।’

জাভেদ আখতার। এএনআই

জাভেদ আখতার আরও বলেন, ‘একদিন বুঝলাম, আমার পরার মতো কোনো কাপড় নেই। শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সেটাই সত্যি। আমার একমাত্র প্যান্টটাও ছিঁড়ে গিয়েছিল।’
জীবনের কিছু মুহূর্ত তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল বলেও স্মরণ করেন তিনি। জাভেদ আখতার বলেন, ‘দু-তিনটি ঘটনা আমাকে আজীবনের জন্য আঘাত করেছে। টানা দু-তিন দিন না খেয়ে থাকা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। তৃতীয় দিনে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। আত্মসম্মান, মর্যাদা—সবকিছুই ঝাপসা হয়ে যায়। তখন একটাই সত্য থাকে—ক্ষুধা।’

সিনেমায় জাভেদ আখতারের শুরু
এরপর তাঁর পরিচয় হয় পরিচালক এস এম সাগরের সঙ্গে। তিনি তখন ‘সারহাদি লুটেরা’ নামের একটি অ্যাকশন ছবি বানাচ্ছিলেন। সাগর জাভেদকে মাসিক ১০০ রুপিতে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন। অভিনেতাদের সংলাপ রিহার্সাল করানোই ছিল তাঁর কাজ।
শুটিং চলাকালীন ছবিটির সংলাপ লেখক হঠাৎ কাজ ছেড়ে দেন। সাগর তরুণ জাভেদকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি দায়িত্ব নিতে পারবেন? জাভেদের জবাব ছিল সোজাসাপটা—‘চেষ্টা করব।’
এই চেষ্টাই তাঁর জীবন বদলে দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন ছবিটির সংলাপ লেখক। আর এই ছবিতেই তাঁর পরিচয় হয় অভিনেতা সেলিম খানের সঙ্গে—যিনি পরবর্তী প্রায় দুই দশক তাঁর সৃজনশীল সঙ্গী হয়ে ওঠেন। যদিও ‘সারহাদি লুটেরা’ বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়, কিন্তু এখান থেকেই জন্ম নেয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক জুটি।

‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’–এ জাভেদ আখতার ও সেলিম খান। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও

সেলিম-জাভেদের জন্ম
এরপর এস এম সাগরের জন্য অশোক কুমার অভিনীত একটি ছবির চিত্রনাট্য লেখেন তাঁরা। পারিশ্রমিক হিসেবে পান ৫ হাজার রুপি। কিন্তু পাননি কৃতিত্ব। হতাশ হয়ে তাঁরা যোগাযোগ করেন জি পি সিপ্পির সঙ্গে। ঠিক সেই সময় সিপ্পির ছেলে রমেশ সিপ্পি তাঁর বাবার প্রোডাকশন হাউসে একটি লেখক বিভাগ গড়তে চাইছিলেন। সেলিম-জাভেদ তাঁকে একটি গল্প শোনান। প্রথমে অনাগ্রহী থাকলেও গল্প শুনে মুগ্ধ হয়ে যান রমেশ সিপ্পি। শেষ পর্যন্ত দুজনকেই মাসিক ৭৫০ রুপিতে নিয়োগ দেন।
সিপ্পি ফিল্মসের সঙ্গে তাঁদের প্রথম ছবি ছিল ‘আন্দাজ’। মুক্তির আগেই অনেকেই ছবিটিকে ব্যর্থ ঘোষণা করেছিলেন। তবে সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে ছবিটি সুপারহিট হয়। কিন্তু এখানেও গল্পটি সেলিম-জাভেদের হলেও তাঁদের নাম দেওয়া হয় শুধু ‘সিপ্পি ফিল্মস স্টোরি ডিপার্টমেন্ট’-এর অধীনে।

আরও পড়ুন

রাজেশ খান্নার সঙ্গে কাজ
এই অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা রাজেশ খান্নার সঙ্গে হাত মেলান সেলিম–জাভেদ। সে সময় রাজেশ খান্না তামিল ছবি ‘দৈব চেয়াল’–এর হিন্দি রিমেক সই করেছিলেন। চিত্রনাট্যে অসন্তুষ্ট হয়ে রাজেশ খান্না সেলিম-জাভেদকে নতুন করে লেখার অনুরোধ করেন এবং পূর্ণ কৃতিত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তৈরি হয় ১৯৭১ সালের হিট ছবি ‘হাথি মেরে সাথি’।
ছবিটি সফল হলেও প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। পারিশ্রমিক পান মাত্র ১০ হাজার রুপি। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের সঙ্গে রাজেশ খান্নার সম্পর্কেও ফাটল ধরায়। একই সময়ে তাঁরা লেখেন আরেক সুপারহিট ‘সীতা অউর গীতা’। এখানেও চিত্রনাট্যের কৃতিত্ব যায় ‘সিপ্পি ফিল্মস’–এর নামে।

জাভেদ আখতার ও সেলিম খান
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

শেষমেশ কৃতিত্ব আদায়
হতাশ হলেও দমে যাননি সেলিম-জাভেদ। তাঁরা লেখেন ‘জঞ্জির’। পরিচালক প্রকাশ মেহরা এই চিত্রনাট্য নিয়ে দিলীপ কুমার ও রাজ কুমারের মতো তারকাদের কাছে যান। কিন্তু সেলিম-জাভেদ জোর দেন, ছবিটি তখনো নবাগত অমিতাভ বচ্চনকে নিয়েই বানাতে হবে। ‘জঞ্জির’ মুক্তি পেয়ে হিন্দি সিনেমার ইতিহাস বদলে দেয়। গল্পের জন্য তাঁরা পান ৫৫ হাজার রুপি। কিন্তু পোস্টারে আবারও তাঁদের নাম নেই।
এবার তাঁরা নিজেরাই পদক্ষেপ নেন। একজন চিত্রশিল্পী নিয়োগ করে পোস্টারে বড় করে নিজেদের নাম লিখিয়ে দেন। পুরো ইন্ডাস্ট্রি হতবাক হয়ে যায়। এ ঘটনাই সিনেমায় লেখকদের কৃতিত্বের নিয়ম বদলে দেয়।
এরপর ইতিহাস। ‘দিওয়ার’, ‘ত্রিশূল’, ‘শোলে’, ‘ডন’—এই ছবিগুলো শুধু সফল হয়নি, হিন্দি সিনেমার ভাষা ও চরিত্র বদলে দিয়েছে। আজও তাঁদের সংলাপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উচ্চারিত হয়।


তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে