জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেলেন প্রিসাইডিং অফিসার, এরপর...
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারত। প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের দেশটিতে নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট বাক্স বসানো নয়, এটি এক বিশাল প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও মানবিক প্রক্রিয়া। শহরের চকচকে ভোটকেন্দ্র থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ি বা জঙ্গলঘেরা গ্রাম—সবখানেই পৌঁছাতে হয় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যন্ত্রকে। এই বাস্তবতাকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছে অমিত ভি মাসুরকার পরিচালিত ছবি ‘নিউটন’। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে রয়েছে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, কমেডি আর সামাজিক বাস্তবতার মিশেল। এত দিন পরও তাই সিনেমাটি সমান প্রাসঙ্গিক।
সিনেমায় রাজকুমার রাও অভিনয় করেছেন নিউটন কুমারের চরিত্র। নিয়মকানুনে কঠোরভাবে বিশ্বাসী এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি আদর্শবাদী, একগুঁয়ে ধরনের মানুষ, যার কাছে রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান মানা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং নৈতিক কর্তব্য। ছবির শুরুতেই বোঝা যায়, নিউটন এমন একজন, যিনি ব্যক্তিগত জীবনেও নীতির প্রশ্নে আপস করেন না। পরিবার বেছে দেওয়া পাত্রী নাবালিকা জেনে তিনি সেই বিয়ে বাতিল করেন। তাঁর চোখে নিয়ম মানা মানেই ন্যায়ের পক্ষে থাকা। এই মানসিকতা নিয়েই তিনি স্বেচ্ছায় এমন এক দায়িত্ব নেন, যা অনেকেই এড়িয়ে চলেন—বিদ্রোহী-প্রভাবিত, দুর্গম এক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এলাকায় ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব।
এই জায়গায় ছবিতে নির্মাতার দর্শন ফুটে ওঠে। একদিকে রাষ্ট্রের কাগুজে আদর্শ—‘সব নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে’, অন্যদিকে মাটির বাস্তবতা-নিরাপত্তাহীনতা, ভাষাগত বিভাজন, রাজনৈতিক অনাগ্রহ এবং বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অবহেলার অনুভূতি। নিউটনের যাত্রা যেন এই দুই বাস্তবতার সংঘর্ষের গল্প।
তাঁর সঙ্গে রয়েছেন অভিজ্ঞ কিন্তু খানিকটা উদাসীন লোকনাথ (রঘুবীর যাদব) এবং স্থানীয় তরুণী মালকো (অঞ্জলি পাতিল), যিনি অনুবাদক ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর গ্রামবাসীরা হিন্দি বোঝেন না, তাঁরা জানেন না প্রার্থীরা কে, এমনকি ভোট তাঁদের জীবনে কী বদল আনতে পারে, তা–ও স্পষ্ট নয়। তাঁদের কাছে রাষ্ট্র মানে দূরের এক শক্তি, যা মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সংকটে তেমন পাশে দাঁড়ায় না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ও জটিল চরিত্র হয়ে ওঠেন সেনা কর্মকর্তা আত্মা সিং (পঙ্কজ ত্রিপাঠী)। বিদ্রোহী হামলার ঝুঁকিতে থাকা এই অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষা করাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব। তাঁর দৃষ্টিতে, নির্বাচন মানে কাগজে-কলমে প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, যেখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। তাই তিনি বাস্তববাদী, কঠোর এবং ঝুঁকি কমানোর প্রশ্নে আপসহীন। নিউটনের চোখে আত্মা সিং যেন বাধা, কিন্তু দর্শকের চোখে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়—এই মানুষ শুধু নিষ্ঠুর বা অসংবেদনশীল নন, তিনি এমন এক বাস্তবতার প্রতিনিধি, যেখানে আদর্শ আর নিরাপত্তার মধ্যে প্রতিনিয়ত আপস করতে হয়।
‘নিউটন’-এর বড় শক্তি এখানেই, ছবিটি কাউকে একমাত্র নায়ক বা একমাত্র খলনায়ক বানায় না। নিউটনের আদর্শবাদ যেমন প্রেরণাদায়ক, তেমনি আত্মা সিংয়ের বাস্তববাদও পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। ছবিটি দেখায়, গণতন্ত্র শুধু নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি নিরাপত্তা, ক্ষমতা, ভয় এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক জটিল প্রক্রিয়া।
‘নিউটন’ কোনো রাজনৈতিক থ্রিলার নয়, আবার নিছক হালকা কমেডিও নয়। হাসির মধ্যেই দর্শক টের পান, পরিস্থিতির ভয়াবহতা। ভোটকেন্দ্রে বসে দীর্ঘ সময় কোনো ভোটার না আসা, সেনাবাহিনীর পাহারায় ভোটারদের হাজির হওয়া কিংবা ভোটারদের নিজেদের ভাষায় পর্যন্ত ব্যালট বোঝার সুযোগ না থাকা—এই দৃশ্যগুলো একদিকে হাস্যকর, অন্যদিকে গভীরভাবে অস্বস্তিকর।
‘নিউটন’ দেখতে দেখতে আপনার মনে পড়তে পারে ইরানি সিনেমা ‘সিক্রেট ব্যালট’-এর কথা, যেখানে এক তরুণী কর্মকর্তা মরুভূমির দ্বীপে ভোটার খুঁজে বেড়ান। কিন্তু ‘নিউটন’ সেই গল্পকে আরও বাস্তব ও সমসাময়িক ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এনে ফেলেছে। এখানে শুধু একজন আদর্শবাদী কর্মকর্তার সংগ্রাম নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছবিটি চাইলে আরও তীক্ষ্ম হতে পারত—নির্বাচনী অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান করা যেত। কিন্তু পরিচালক মাসুরকার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থান নেন। তিনি বড় রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে মানবিক গল্পে জোর দেন। ফলে ছবিটি সহজে দেখা যায়, সহজে উপভোগ করা যায়, কিন্তু হয়তো সব দর্শকের প্রাক্-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে না।
ছবির মূল দর্শন গভীর—ভোটের প্রক্রিয়াটাই কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নাকি ভোটের অর্থ ও প্রভাব? ‘নিউটন’ শেষ পর্যন্ত এমন এক অবস্থান নেয়, যেখানে বলা হয়: কীভাবে ভোট দিচ্ছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি ভোট দিচ্ছেন কি না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণাদায়ক, বিশেষ করে এমন প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভোটাধিকার পাওয়াই একটি সংগ্রাম।
‘নিউটন’ যে জায়গায় সবচেয়ে সফল, তা হলো মাঠপর্যায়ের গণতন্ত্রের জটিলতা দেখানো। শহরের সংবাদপত্রের পাতায় বা টিভির টকশোতে যে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়, তার বাইরেও এক বিশাল বাস্তবতা আছে, যেখানে ভোট মানে হেলিকপ্টারে চড়া, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটা, বিদ্রোহের আতঙ্ক আর প্রশাসনিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই।
কারিগরি দিক থেকেও ছবিটি বলিউডের চিরচেনা ঝলমলে ফর্মুলা থেকে আলাদা। ক্যামেরার কাজ সংযত, সংগীত নীরব ও আবহ তৈরি করার মতো, অভিনয় স্বাভাবিক ও সংযমী। রাজকুমার রাও তাঁর স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় নিউটন চরিত্রকে একদিকে হাস্যরসাত্মক, অন্যদিকে সহানুভূতিশীল করে তুলেছেন। পঙ্কজ ত্রিপাঠী আত্মা সিং চরিত্রে এনে দিয়েছেন এমন এক গভীরতা, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে, আদর্শ আর বাস্তবতার সংঘর্ষে কে আসলে ‘ঠিক’?
‘নিউটন’ শুধু একটি রাজনৈতিক ছবি নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর গ্রামবাসীদের সংলাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাদের জীবনে সরকার বদলালেও বাস্তব সমস্যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। তাদের কাছে ভোট যেন এক বিমূর্ত ধারণা, যা জীবনের মৌলিক সংকট—জমি, কাজ, নিরাপত্তা; এসবের সমাধান করে না। এই জায়গায় ছবিটি নীরবে কিন্তু শক্তভাবে বলে দেয়, গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতা আর বাস্তব উন্নয়নের মধ্যে কত বড় ফাঁক থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ‘নিউটন’ এক ধরনের দ্ব্যর্থক অনুভূতি রেখে যায়। একদিকে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি একধরনের আশাবাদী বিশ্বাস প্রকাশ করে, সব প্রতিকূলতার মাঝেও ভোটের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যদিকে এটি দেখায়, এই প্রক্রিয়া কতটা ভঙ্গুর, কতটা আপসনির্ভর এবং কতটা মানুষের জীবনের ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
‘নিউটন’ এমন এক ছবি, যা তীব্র স্লোগান দেয় না, কিন্তু নীরবে গভীর প্রশ্ন তোলে। এটি দেখায়, গণতন্ত্র কাগজে যতটা সুন্দর, বাস্তবে ততটাই জটিল।
সিনেমাটি দেখা যাচ্ছে অ্যামজন প্রাইম ভিডিওতে।