কাজলের কোলে ধরা সেই শিশু আজ নায়িকা, আমিরের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনও ছিল

‘ইশ্‌ক’ সিনেমার সেই দৃশ্য ও আমির খান। কোলাজ

একটা পুরোনো সিনেমার দৃশ্য।

এক উঁচু ভবনের ছাদে ছোটদের নিয়ে জন্মদিন পালন করছেন কাজল। রঙিন বেলুনে সাজানো চারদিকে হইচই, উচ্ছ্বাস। সেই আনন্দঘন মুহূর্তে পাশের ভবনের ছাদ থেকে হঠাৎই এক বিপজ্জনক কাণ্ড শুরু করেন অজয় দেবগন। দুটি ভবনের মাঝখানে বসানো সরু পাইপের ওপর দিয়ে হেঁটে কাজলের ছাদের দিকে এগোতে থাকেন তিনি। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পেরে একসময় পা হড়কে যায়। পাইপ আঁকড়ে ঝুলে পড়েন অজয়।

এই দৃশ্য দেখে ‘মরা! মরা!’ (মরলাম! মরলাম!) বলতে বলতে ছুটে যান আমির খান। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া অজয় দেবগন, আমির খান ও কাজল অভিনীত ‘ইশ্‌ক’ ছবির এ দৃশ্য আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। হাসির মাঝেই টানটান উত্তেজনা—নব্বইয়ের দশকের বলিউড বিনোদনের সুন্দর এক মুহূর্ত। আজও ফেসবুক, ইউটিউবে এ দৃশ্যের রিলস, শর্টস দেখা যায়।

চিত্রনাট্য অনুযায়ী এ দৃশ্যে ভয় আর উৎকণ্ঠার মাঝেই কাজল কোলে তুলে নেন একটি মিষ্টি শিশুকে। গোলাপি রঙের ফ্রক পরা সেই ছোট্ট মেয়ের মুখে কোনো সংলাপ নেই, দৃশ্যটাও খুব দীর্ঘ নয়। ক্যামেরা দ্রুতই সরে যায় অন্য দিকে। তখন হয়তো কেউ খেয়ালই করেনি—এ শিশুই একদিন বড় হয়ে অভিনয়ের দুনিয়ায় নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করবেন।

কাজের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে খুব দ্রুতই বুঝে গিয়েছিলেন, এই ইন্ডাস্ট্রির অন্ধকার দিকটা কতটা নির্মম! দক্ষিণ ভারতের এক কাস্টিং এজেন্ট কাজের বিনিময়ে তাঁকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি ‘সবকিছু করতে রাজি কি না’। তিনি সরাসরি প্রতিবাদ না করে বোঝার ভান করেছিলেন, দেখতে চেয়েছিলেন একজন মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে। হায়দরাবাদে এক প্রযোজকের সঙ্গেও হয়েছিল এমনই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা, যেখানে ‘কাস্টিং কাউচ’-এর কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা হচ্ছিল।

নব্বইয়ের দশকের সেই দৃশ্যে কাজলের কোলে ধরা ছোট্ট মেয়েটি তখন কেবলই একটি মুখ। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সেই শিশুই বলিউডের পরিচিত অভিনেত্রী। সেই একঝলক উপস্থিতি থেকেই শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ যাত্রা—যার পথে ছিল সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর নিজেকে বারবার প্রমাণ করার লড়াই।

‘ইশক’ সিনেমায় কাজলের কোলে থাকা সেই শিশুটি এখন নায়িকা। ভিডিও থেকে

শৈশবেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেও তাঁর পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকটি ছবিতে কাজ করার পর হঠাৎই যেন হারিয়ে গেলেন তিনি। কৈশোরে এসে পড়াশোনার সঙ্গে লড়াই, আত্মবিশ্বাসের সংকট—সব মিলিয়ে জীবনটা হয়ে উঠেছিল অনিশ্চিত। দ্বাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই ছিলেন দোলাচলে।

কাজের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে খুব দ্রুতই বুঝে গিয়েছিলেন, এই ইন্ডাস্ট্রির অন্ধকার দিকটা কতটা নির্মম! দক্ষিণ ভারতের এক কাস্টিং এজেন্ট কাজের বিনিময়ে তাঁকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি ‘সবকিছু করতে রাজি কি না’। তিনি সরাসরি প্রতিবাদ না করে বোঝার ভান করেছিলেন, দেখতে চেয়েছিলেন একজন মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে। হায়দরাবাদে এক প্রযোজকের সঙ্গেও হয়েছিল এমনই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা, যেখানে ‘কাস্টিং কাউচ’-এর কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা হচ্ছিল।

বিভিন্ন সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে দেখা গেছে তাঁকে। কোলাজ

এসব লড়াইয়ের মাঝেই আসে সেই মোড়ঘোরানো সুযোগ। এবার পরিচয়টা স্পষ্ট করা যাক। সেই পুরোনো দৃশ্যে কাজলের কোলে ধরা শিশুটি হলেন ফাতিমা সানা শেখ। কিছুদিন আগে ভারতী সিং ও হর্ষ লিম্বাচিয়ার একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানে নিজেই সেই স্মৃতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ফাতিমা বলেন, ‘একটা ছবি ছিল “ইশ্‌ক”। সেখানে আমির “মরা, মরা” বলতে বলতে দৌড়াচ্ছেন, আর কাজলের কোলে যে ছোট্ট মেয়েটাকে দেখা যায়, ওটাই আমি।’

১৯৯২ সালের ১১ জানুয়ারি হায়দরাবাদে জন্ম ফাতিমার। বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ে। ‘ইশ্‌ক’ ছাড়াও তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন ‘চাচি ৪২০’, ‘বড়ে দিলওয়ালা’, ‘ওয়ান টু কা ফোর’-এর মতো ছবিতে। কিন্তু শৈশবের সেই পরিচয় অনেক দিন পর নতুন করে আলোচনায় আসে।

ফাতিমার নাম বড় করে সামনে আসে ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দঙ্গল’ দিয়ে। কুস্তিগির গীতা ফোগটের চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। পরে নিজেই বলেছেন, এ ছবিই তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে, অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, নিজের রুচি অনুযায়ী কাজ বেছে নেওয়ার সাহস দিয়েছে।

তবে ‘দঙ্গল’-এর সাফল্যের পরও ফাতিমার জীবন খুব আরামদায়ক হয়ে যায়নি। বড় বাজেটের ‘ঠগস অব হিন্দোস্তান’ বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থতার চাপও নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিছুদিন কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা, নিজের প্রতিভা নিয়েই সন্দেহ—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

তবু থেমে যাননি। ধীরে ধীরে বেছে নিয়েছেন ভিন্নধর্মী কাজ। ‘লুডো’ ও ‘আজিব দাস্তানস’-এ জটিল সম্পর্কের নারীর চরিত্রে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ওটিটিতে ‘মডার্ন লাভ মুম্বাই’-এ তাঁর অভিনয় নতুন দর্শক তৈরি করে। ‘ধক ধক’-এ চার নারীর বন্ধুত্ব আর স্বাধীনতার গল্পেও তাঁকে দেখা যায় আলাদা রূপে।

ফাতিমা সানা শেখ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নজর কেড়েছেন তিনি—‘স্যাম বাহাদুর’-এ ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে। এ চরিত্রের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তাঁকে। ফাতিমার ভাষায়, এই চরিত্র তাঁকে অভিনেত্রী হিসেবে আরও পরিণত করেছে। গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘মেট্রো ইন দিনো’ ছবি, যেখানে একঝাঁক তারকার মধ্যে তাঁর সাবলীল ও আবেগময় অভিনয় আলাদা করে নজর কেড়েছে। এখন তাঁর সামনে রয়েছে নতুন কাজ।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম নিয়েও ফাতিমা খোলামেলা। এখনো নিজের বাড়ি কেনেননি, থাকেন ভাড়া বাড়িতে। একসময় গাড়ি রাখার জায়গা থেকে বানানো নিচতলার ঘরে থাকতে হয়েছে। সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেন না। তাঁর মতে, অভিনয় পেশায় অনিশ্চয়তা কখনো শেষ হয় না। বিল বা কিস্তি শোধ করার চাপ এলে অনেক সময় পছন্দের বাইরে কাজ করতে হয় শুধু টিকে থাকার জন্য।

আমির খানের সঙ্গে ফাতিমা সানা শেখের প্রেমের গুঞ্জন একসময় বলিউডে বেশ আলোচিত ছিল। ‘দঙ্গল’ মুক্তির পর থেকেই দুজনকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়। একসঙ্গে কাজ করা, শুটিংয়ের বাইরে সময় কাটানো, পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে গুঞ্জন ছড়াতে সময় লাগেনি। তখন আমির খান বিবাহিত ছিলেন, সে কারণেই এই আলোচনা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তবে এ বিষয়ে কখনোই প্রকাশ্যে কিছু স্বীকার করেননি আমির খান বা ফাতিমা। তাঁরা দুজনই বারবার বলেছেন, তাঁদের সম্পর্ক পুরোপুরি পেশাগত এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক। ফাতিমা নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন, এই গুঞ্জন তাঁর কাজে ও মানসিকতায় প্রভাব ফেলেছিল, কিন্তু তিনি চেয়েছেন নিজের অভিনয় দিয়েই সব প্রশ্নের জবাব দিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গুঞ্জনও ফিকে হয়ে এসেছে, আর আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে তাঁর কাজ ও অভিনয়যাত্রা।

আরও পড়ুন

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম নিয়েও ফাতিমা খোলামেলা। এখনো নিজের বাড়ি কেনেননি, থাকেন ভাড়া বাড়িতে। একসময় গাড়ি রাখার জায়গা থেকে বানানো নিচতলার ঘরে থাকতে হয়েছে। সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেন না। তাঁর মতে, অভিনয় পেশায় অনিশ্চয়তা কখনো শেষ হয় না। বিল বা কিস্তি শোধ করার চাপ এলে অনেক সময় পছন্দের বাইরে কাজ করতে হয় শুধু টিকে থাকার জন্য।

ফাতিমা সানা শেখ
ইনস্টাগ্রাম

স্বাস্থ্যগত লড়াইও কম নয়। ‘দঙ্গল’-এর সময়ই তাঁর মৃগীরোগ ধরা পড়ে। শুরুতে তিনি তা মানতে চাননি। এই রোগ ঘিরে সমাজের ভুল ধারণা তাঁকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। এখন তিনি মনে করেন, এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাই দরকার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। বয়স কম থাকলে হয়তো এই মাধ্যম তাঁকে টানত, এখন আর টানে না। তাঁর মতে, এই জায়গাটা দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে, যেখানে অন্যের ব্যর্থতাকে উদ্‌যাপন করা হয়, আর মেয়েরাই বেশি ট্রলের শিকার হন।

সব মিলিয়ে কাজলের কোলে ধরা সেই ক্ষণিকের উপস্থিতি থেকে আজকের এই অবস্থান—ফাতিমা সানা শেখের জীবন যেন ধীরে ধীরে লেখা এক দীর্ঘ চিত্রনাট্য। যেখানে আছে শৈশবের আলো, তারপর দীর্ঘ অন্ধকার টানেল, আবার নতুন করে আলো খোঁজার চেষ্টা। জন্মদিনে তাই ফাতিমার পরিচয় শুধু জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নয়, টিকে থাকার লড়াইয়ে আর বারবার নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার এক জীবন্ত গল্প এই বিটাউন নায়িকা।