আট বছরে রাশমিকা–বিজয়ের জীবনে যা হলো

‘গীতা গোবিন্দাম’–এ রাশমিকা ও বিজয়ছবি : আইএমডিবি

দক্ষিণি সিনেমার আকাশে অনেক জুটি এসেছে–গেছে; কিন্তু রাশমিকা ও বিজয়ের সম্পর্ক ঘিরে যে কৌতূহল, তা গত কয়েক বছরে এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। পর্দার রসায়ন থেকে বাস্তবের ঘনিষ্ঠতা, গুঞ্জন থেকে নীরব স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগোনো এক দীর্ঘ উপাখ্যান। আজ তাদের বিয়ে—এমন খবরে ভক্তদের উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক। এ উপলক্ষে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাদের একসঙ্গে পথচলার টাইমলাইন ফিরে দেখা যাক।

সবকিছুর সূচনা ২০১৮ সালে। সেই বছর মুক্তি পায় তেলেগু ছবি ‘গীতা গোবিন্দম’। ছবির নায়ক ছিলেন বিজয় দেবরাকোন্ডা ও নায়িকা রাশমিকা মান্দানা। তখন দুজনেই ক্যারিয়ারের উত্থান পর্বে। বিজয় ইতিমধ্যে ‘অর্জুন রেড্ডি’ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন; আর রাশমিকা কন্নড় ও তেলেগু ছবিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করছেন। ‘গীতা গোবিন্দম’-এ তাঁদের সহজ, দুষ্টু–মিষ্টি রসায়ন দর্শকদের মন জয় করে নেয়। ছবির গান, সংলাপ ও প্রেমের টানাপোড়েন—সবকিছুতেই ফুটে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত এক বোঝাপড়া।

এই ছবির সাফল্যের পর থেকেই দুজনকে ঘিরে গুঞ্জন শুরু। প্রচারণায় একসঙ্গে উপস্থিতি, সাক্ষাৎকারে পরস্পরকে নিয়ে খুনসুটি—এসবই ভক্তদের মনে প্রশ্ন জাগায়। তবে তখন দুজনেই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, ভালো সহকর্মী ও বন্ধু—এর বেশি কিছু নয়।

২০১৯ সালে মুক্তি পায় তাঁদের দ্বিতীয় ছবি ‘ডিয়ার কমরেড’। এবার গল্প আরও গভীর, আবেগপ্রবণ। রাজনৈতিক পটভূমি ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এক জটিল প্রেমের কাহিনি। ছবিতে তাদের অভিনয় প্রশংসিত হয়, বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যে রসায়ন নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বলেন, পর্দার ঘনিষ্ঠতা বাস্তবের ইঙ্গিত বহন করছে। যদিও দুজনেই তখনো নীরব।

রাশমিকা ও বিজয়
ফাইল ছবি

এই সময়টাতে বিভিন্ন পার্টি, ছুটির দিন ও ব্যক্তিগত ভ্রমণে দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা আলাদা ছবি পোস্ট করলেও পটভূমির মিল দেখে ভক্তরা মিল খুঁজে নেন। কখনো একই রেস্তোরাঁ, কখনো একই বিদেশ ভ্রমণের ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।

২০২০ ও ২০২১ মহামারির সময়। এ সময় দুজনেই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি প্রকাশ্যে কথা বলেননি। তবে সাক্ষাৎকারে বিজয় একাধিকবার বলেন, তিনি এমন একজন মানুষকে পছন্দ করেন, যিনি তাকে মানসিকভাবে স্থির রাখেন। রাশমিকা বলেন, জীবনে এমন একজন আছেন, যিনি তাকে ভীষণভাবে বোঝেন। নাম না বললেও ভক্তরা বুঝে নেন ইঙ্গিত কার দিকে।

২০২২ সালে বিজয় বলিউডে পা রাখেন ‘লাইগার’ দিয়ে। রাশমিকাও হিন্দি ছবিতে কাজ শুরু করেন। দুজনের ক্যারিয়ার নতুন দিগন্তে। এই সময় গুঞ্জন কিছুটা থেমে গেলেও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি; বরং মুম্বাইয়ে একাধিকবার একসঙ্গে দেখা যাওয়ার খবর ছড়ায়। বিমানবন্দরে আলাদা আলাদা এলেও সময়ের ব্যবধান ছিল সামান্য—এমন বিশ্লেষণও চলে ভক্তদের মধ্যে।

২০২৩ সালে রাশমিকা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার জীবনে এমন একজন আছেন, যিনি আমার পরিবারকেও খুব সম্মান করেন।’ অন্যদিকে বিজয় বলেন, ‘আমি এখন জীবনের এমন এক পর্যায়ে, যেখানে স্থায়ী সম্পর্কে বিশ্বাস করি।’ এ কথাগুলো সম্পর্কের গুঞ্জনে নতুন মাত্রা যোগ করে। যদিও তারা প্রকাশ্যে কখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি।

২০২৪ সালে একাধিক সূত্রে জানা যায়, দুই পরিবার পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দক্ষিণি চলচ্চিত্র জগতে তাদের জুটি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব ছিল শুরু থেকেই। কাজের ক্ষেত্রেও তারা একে অপরকে সমর্থন করেছেন। রাশমিকার বড় সাফল্যের সময়ে বিজয় প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, বিজয়ের নতুন ছবির ট্রেলার মুক্তিতে রাশমিকা সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন।

প্রেমের টাইমলাইনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাদের পারস্পরিক সম্মান। তারা কখনো একে অপরকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি করেননি; বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করেছেন। এই পরিণত মনোভাবই তাঁদের সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

সিনেমার দৃশ্যে রাশমিকা ও বিজয়। আইএমডিবি

তাদের সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো বন্ধুত্ব। সহকর্মী হিসেবে শুরু হলেও বন্ধুত্বের জায়গাটা ছিল দৃঢ়। শুটিং সেটে একে অপরকে সাহায্য করা, কঠিন দৃশ্যে মানসিক সমর্থন দেওয়া—এসব গল্প সহকর্মীদের মুখে শোনা গেছে। ‘ডিয়ার কমরেড’-এর শুটিংয়ে এক আবেগঘন দৃশ্যের আগে বিজয় নাকি রাশমিকাকে দীর্ঘ সময় কথা বলে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। আবার ‘গীতা গোবিন্দম’-এর প্রচারণায় রাশমিকা বারবার বলেছেন, বিজয়ের কাজের প্রতি নিবেদন তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
বিয়ের গুঞ্জন প্রথম জোরালো হয় ২০২৫ সালের শেষ দিকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে, তাঁরা নাকি বাগদান সেরেছেন ঘরোয়া আয়োজনে। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দক্ষিণি চলচ্চিত্র জগতে তখন থেকেই আলোচনা—এই জুটি কি তবে শিগগিরই নতুন অধ্যায়ে পা রাখছেন?

আজকের এই বিয়ের খবর সেই দীর্ঘ গুঞ্জনের পরিণতি। প্রেম থেকে বিয়ে—প্রায় আট বছরের পথচলা। ২০১৮ সালে প্রথম একসঙ্গে কাজ, ২০১৯ সালে সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত, মহামারির সময় নীরব সমর্থন, বলিউডে নতুন যাত্রা, পরিবারগুলোর ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছে সম্পর্ক।

এই সম্পর্কের বিশেষত্ব হলো, তাঁরা কখনো প্রকাশ্যে প্রেমের নাটকীয়তা দেখাননি। সামাজিক মাধ্যমে যুগল ছবি খুব কম। একে অপরের জন্মদিনে শুভেচ্ছা থাকলেও তা ছিল সংযত। এই সংযমই ভক্তদের কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।
পর্দার প্রেম বাস্তবের সম্পর্কে রূপ নেওয়ার উদাহরণ দক্ষিণি চলচ্চিত্রে নতুন নয়। তবে রাশমিকা ও বিজয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ। কারণ, দুজনেই নিজ নিজ ক্যারিয়ারে শীর্ষে উঠেছেন। জনপ্রিয়তার চাপ, ব্যস্ততা, ভৌগোলিক দূরত্ব—সব সামলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। তাঁরা সেটিই করেছেন।

আরও পড়ুন

তাঁদের বিয়ে শুধু দুই তারকার ব্যক্তিগত মিলন নয়, ভক্তদের কাছেও এক আবেগঘন মুহূর্ত। ‘গীতা গোবিন্দম’-এর দুষ্টু–মিষ্টি প্রেম, ‘ডিয়ার কমরেড’-এর আবেগঘন সম্পর্ক—এসব যেন বাস্তবে পূর্ণতা পেল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ব্যক্তি হিসেবেও পরিণত হয়েছেন। রাশমিকা একসময় ছিলেন নতুন মুখ, এখন তিনি সর্বভারতীয় পরিচিত তারকা। বিজয়ও আঞ্চলিক নায়ক থেকে জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখ। এই সমান্তরাল উত্থান তাঁদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে বলে মনে করা হয়।

এই দীর্ঘ টাইমলাইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিশ্বাস ও সম্মান। গুঞ্জন, সমালোচনা, সামাজিক মাধ্যমের চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তাঁরা কখনো একে অপরকে অস্বস্তিতে ফেলেননি। সম্পর্ককে সময় দিয়েছেন, ব্যক্তিগত পরিসরকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
২০১৮ থেকে ২০২৬—আট বছরের পথচলা। সহকর্মী থেকে বন্ধু, বন্ধু থেকে প্রেমিক–প্রেমিকা, আর আজ তাঁরা হবু স্বামী–স্ত্রী। দক্ষিণি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই জুটির গল্প তাই কেবল গসিপ নয়; বরং ধৈর্য ও পরিণতির গল্প।

ভক্তদের কাছে তাঁরা ছিলেন ‘গীতা’ ও ‘গোবিন্দ’, ‘কমরেড’ ও তার সঙ্গী। আজ বাস্তব জীবনে তাঁরা একে অপরের জীবনসঙ্গী। সময়ই বলে দেবে, পর্দার মতো বাস্তবেও তাদের গল্প কতটা সফল হয়। তবে আপাতত বলা যায়, একসঙ্গে শুরু করা যাত্রা আজ নতুন অধ্যায়ে পৌঁছাল—প্রেমের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিয়ের বন্ধনে।

ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে