আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে করুণ মৃত্যু, খ্যাতির আড়ালে বেবি নাজের করুণ জীবন

বেবি নাজ। আইএমডিবি

শৈশবেই মঞ্চে নাচের মধ্য দিয়ে শিল্পীজীবনে পা রাখেন বেবি নাজ। তাঁর বাবা মির্জা দাউদ বেগ ছিলেন লেখক। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই মাত্র চার বছর বয়সে উপার্জন শুরু করতে হয় তাঁকে। প্রথম দিকে মঞ্চে নাচ করতেন। সিনেমার নায়িকাদের নাচ দেখে সেগুলো অনুকরণ করতে ভালো লাগত তাঁর। কিন্তু শখের সেই নাচ একসময় হয়ে ওঠে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব। এরপরের গল্পটা খুব একটা সুখের নয়, একের পর এক সিনেমা করেছেন বটে; কিন্তু তাঁর জীবনের পথচলা মসৃণ ছিল না।

একেকটি অনুষ্ঠানে নাজ পারিশ্রমিক পেতেন ১০০ রুপি। সেই অর্থ দিয়ে সংসারের খরচ চলত। আট বছর বয়সে প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পান তিনি। পারিশ্রমিকের কথা জানার পর তাঁর মা-বাবা প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

তবে চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। একসময় স্কুল থেকে তাঁর নামও কেটে দেওয়া হয়। পর্দায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আবার পড়াশোনায় ফেরার সুযোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তত দিনে সংসারের প্রধান উপার্জনকারী হয়ে উঠেছেন নাজ। ফলে শিক্ষাজীবনে আর ফেরা হয়নি।

‘বুট পলিশ’ দিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৫৪ সালে মুক্তি পায় রাজ কাপুর প্রযোজিত ও প্রকাশ অরোরার পরিচালিত ‘বুট পলিশ’। ছবিতে বেবি নাজ অভিনয় করেন বেলু চরিত্রে। অনাথ দুই শিশুর দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার গল্প নিয়ে তৈরি ছবিটি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
ছবিটির সাফল্যে বেবি নাজ হয়ে ওঠেন সে সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুশিল্পী।

১৯৫৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বুট পলিশ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিশেষ সম্মাননা পান তিনি। তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ ছিলেন রাজ কাপুরও। নাজের প্রতিভা দেখে তাঁকে সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনার জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি নির্মাতা। কিন্তু তাঁর মা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

খ্যাতি ছিল, নিজের টাকা ছিল না
বেবি নাজের অভিনয়জীবন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিশুশিল্পীদের একজন। প্রায় ১২০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সাফল্যের অর্থ তাঁর নিজের হাতে থাকত না।

নার্গিস ও রাজ কাপুরের সঙ্গে বেবি নাজ। ইনস্টাগ্রাম থেকে

নাজ পরবর্তী সময়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর মা তাঁর উপার্জনের অর্থ নিজের এক পুরুষসঙ্গীর পেছনে ব্যয় করতেন। শিশুশিল্পী হিসেবে দিনের পর দিন কাজ করলেও অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জুটত না তাঁর। কখনো না খেয়েই ঘুমাতে হয়েছে। অথচ তাঁর উপার্জনেই চলত সংসার।

শৈশবের এই অভিজ্ঞতা নিয়ে নাজের বক্তব্য ছিল, তিনি ছোট ছিলেন বলে মা-বাবাকে অমান্য করার সাহস পাননি। মা চলচ্চিত্রের প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, আর বাবা কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে উপার্জনের দায়িত্ব পুরোপুরি তাঁর ওপর এসে পড়ে।

১০ বছর বয়সে আত্মহত্যার চেষ্টা
অভিনয়ের ব্যস্ততা, পারিবারিক অশান্তি ও বঞ্চনার চাপ শিশুমনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। মাত্র ১০ বছর বয়সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বেবি নাজ। তিনি একটি কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
নাজের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই ঘটনার পরও তাঁর মা তাঁকে সান্ত্বনা দেননি; বরং রাগ করে বকাঝকা করেছিলেন। এ ঘটনা তাঁর জীবনের গভীর ক্ষতগুলোর একটি হয়ে থেকে যায়।

১২ বছর বয়সে নাজ জানতে পারেন, মা-বাবার দাম্পত্য কলহের পেছনে ছিল তাঁর মায়ের অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক। পরে মা সেই ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। নাজের বয়স তখন ১৬ বছর।

আরও পড়ুন

মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাবাকে ফিরিয়ে আনেন
নিজের উপার্জনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু করেন নাজ। একসময় মাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দেন। বাবাকে খুঁজে বের করে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর মা যে পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন, নাজ অর্থ দেওয়া বন্ধ করার পর সেই সম্পর্কও ভেঙে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুশিল্পী হিসেবে বিপুল অর্থ উপার্জন করেও নিজের জীবনের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারেননি তিনি। বেবি নাজের গল্প তাই শুধু এক তারকার উত্থান নয়, বিনোদনজগতে শিশুদের শ্রম ও উপার্জনের ওপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণেরও এক করুণ উদাহরণ।

নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন, কিন্তু সাফল্য এল না
শিশুশিল্পী হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পর বড় হয়ে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন নাজ। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হিসেবে সেই সাফল্য আর ফিরে পাননি। হিন্দি ছবির পাশাপাশি ভোজপুরি সিনেমাতেও অভিনয় করেন তিনি। ‘বিদেসিয়া’ (১৯৬৩) ও ‘সাইয়ান সে নেহা লাগাইবে’ (১৯৬৫) ভোজপুরি ছবিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ।
১৯৬৫ সালে অভিনেতা সুব্বিরাজকে বিয়ে করেন নাজ। সুব্বিরাজ ছিলেন কাপুর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিনেতা। বিয়ের পর নাজ হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে অনুরাধা নাম নেন বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ আছে। তাঁদের দুই সন্তান—গিরিশ ও গৌরী।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে কণ্ঠ দেওয়ার কাজও করেন তিনি। শ্রীদেবীর অভিনীত কয়েকটি ছবিতে তাঁর হয়ে ডাবিং করেছিলেন বেবি নাজ। তবে নায়িকা হিসেবে বড় তারকা হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

শেষ জীবনে আড়ালে, ৫১ বছরেই মৃত্যু
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পর বেবি নাজ ক্রমে চলচ্চিত্রের আলো থেকে দূরে সরে যান। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর ৫১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়, কিছু প্রতিবেদনে ক্যানসারের কথা বলা হয়েছে, আবার জীবনীমূলক সূত্রে দীর্ঘস্থায়ী যকৃতের অসুস্থতার কথা উল্লেখ রয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে