শিউলি চরিত্রে খ্যাতির পর বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই—অভিনেত্রী বানিতা এখন কী করছেন
পর্দায় তাঁর সংলাপ ছিল খুব কম। বেশির ভাগ সময় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে হয়েছে। তবু ‘অক্টোবর’ সিনেমার শিউলিকে ভুলতে পারেননি দর্শক। চরিত্রটিতে প্রাণ দেন তরুণ অভিনেত্রী বানিতা সান্ধু।
২০১৮ সালে সিনেমাটি মুক্তির পর রাতারাতি পরিচিতি পান বানিতা। কিন্তু শিউলি চরিত্রে সাফল্যের পর তাঁর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।
ওয়েলসের ছোট শহর কেয়ারলিয়নে বেড়ে উঠেছেন বানিতা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম তাঁর। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ছোটবেলাতেই। মাত্র ১১ বছর বয়সে অভিনয় শুরু করেন। তখনই স্বপ্ন দেখতেন টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত অভিনয় করার।
পড়াশোনার জন্য পরে লন্ডনে যান। কিংস কলেজ লন্ডনে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। সেই সময়ই ভারতে একটি বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের সুযোগ আসে। প্রথমে বিজ্ঞাপনের কাজকে অভিনয়জীবনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখেননি বানিতা। কিন্তু সেই কাজই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অভিনয়ে অভিষেক
বানিতার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ওয়েলসের কেয়ারলিয়নে। ছোট শহর। পরিবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বাড়িতে ছিল হিন্দি ও পাঞ্জাবি গান। ছিল বলিউডের সিনেমা। মায়ের রান্নাও ছিল ভারতীয় স্বাদের। কিন্তু বাইরের পরিবেশ ছিল ভিন্ন। ছোটবেলা থেকেই দুটি সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। অভিনয়ের ইচ্ছা জাগে আরও আগে।
১১ বছর বয়সে মা–বাবাকে জানান, অভিনেত্রী হতে চান। তাঁকে একটি অভিনয় এজেন্সিতে ভর্তি করিয়ে দেন তাঁরা। সেখান থেকেই শুরু।
প্রথম দিকে ছোটখাটো কাজ করেছেন। বিবিসির একটি অনুষ্ঠানেও অভিনয় করেন। ১৮ বছর বয়সে পেশাদার অভিনয়ের দিকে এগিয়ে যান। তবে মা–বাবার শর্ত ছিল একটাই—পড়াশোনা শেষ করতে হবে।
তাই অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান। ১৮ বছর বয়সে লন্ডনে চলে যান। ভর্তি হন কিংস কলেজ লন্ডনে। পড়েন ইংরেজি সাহিত্য।
পড়াশোনা আর অভিনয়—দুটো একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না। কখনো বিমানে ১০ ঘণ্টার যাত্রাপথে পড়াশোনা করেছেন। আবার বিমান থেকে নেমেই ছুটেছেন শুটিং বা সাক্ষাৎকারে।
চরিত্রটি সহজ ছিল না
বলিউডে আসাটাও ছিল অনেকটা হঠাৎ। একটি বিজ্ঞাপনের কাজ নিয়ে ভারতে আসেন বানিতা। পরে আরেকটি চুইংগামের বিজ্ঞাপনে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় পরিচালক সুজিত সরকারের সঙ্গে।
দিল্লিতে পাঁচ দিন ধরে চলে সেই বিজ্ঞাপনের শুটিং। কাজের ফাঁকে নির্মাতা সুজিত সরকার বানিতাকে ‘অক্টোবর’-এর একটি দৃশ্য দেখান। জানতে চান, সিনেমায় অভিনয় করতে আগ্রহী কি না।
বানিতা তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। লন্ডনে ফিরে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কয়েক মাস পর আসে সুজিতের ফোন। শিউলি চরিত্রে অভিনয় করবেন বানিতা।
চরিত্রটি সহজ ছিল না। দুর্ঘটনার পর কোমায় থাকা শিউলিকে অভিনয় করতে হয়েছে প্রায় নীরব অবস্থায়। হিন্দিও তখন তাঁর জন্য স্বচ্ছন্দ ভাষা নয়। তাই ছবিতে কাজের আগে প্রায় এক বছর হিন্দি শেখেন। শুটিংয়ে আরও কঠিন পরীক্ষা ছিল।
দিনের পর দিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা স্থির হয়ে পড়ে থাকতে হয়েছে। চারপাশে সবাই অভিনয় করছেন। আর বানিতাকে থাকতে হচ্ছে চোখ বন্ধ করে। চরিত্রটির আবেগ প্রকাশ করতে হয়েছে চোখের পাতা, মুখের সামান্য পরিবর্তন আর শরীরী ভাষায়।
পরিচিতির পরই কঠিন সময়
‘অক্টোবর’-এর পর স্বাভাবিকভাবেই বানিতাকে নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে যায়। কিন্তু একের পর এক সিনেমায় দেখা যায়নি তাঁকে। এর পেছনে ছিল ব্যক্তিগত কিছু কারণ।
ছবিটি মুক্তির সময় বানিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। একদিকে প্রথম সিনেমার প্রচার, অন্যদিকে পড়াশোনা। সব মিলিয়ে সময়টা ছিল চাপের। এর মধ্যেই মানসিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যান বানিতা।
২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানান, ১৮ বছর বয়সে তাঁর বিষণ্নতা ধরা পড়ে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। একই সময়ে প্রথম সিনেমা মুক্তির প্রস্তুতিও চলছে। কী হচ্ছে, সেটি বুঝে উঠতেও সময় লেগেছিল তাঁর।
সুস্থ হতে কয়েক বছর সময় লাগে। পড়াশোনা শেষ করতে লন্ডনে ফিরে যান। অভিনয় থেকেও কিছুটা দূরে থাকেন। পরে ধীরে ধীরে ফেরেন ক্যামেরার সামনে। ‘আদিত্য ভার্মা’, ‘সরদার উধম’, ‘মাদার তেরেসা অ্যান্ড মি’ ও ‘প্যান্ডোরা’-র মতো ভিন্ন ধরনের কাজে দেখা যায় তাঁকে।
এখন কী করছেন
একসময় লন্ডন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যাতায়াত করতে হতো বানিতাকে। এখন মুম্বাই তাঁর কাজের ঘাঁটি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হিন্দুস্তান টাইমসকে জানান, যুক্তরাজ্যের কাজ শেষ করে তিনি মুম্বাইয়ে ফিরে এসেছেন। অভিনয়কেই এখন মূল লক্ষ্য করছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির এক সাক্ষাৎকারেও মুম্বাইয়ে তাঁর কাজ ও জীবন নিয়ে কথা বলা হয়েছে। শরীরচর্চা, খাবার, দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর পাশাপাশি নতুন কাজ নিয়েও ব্যস্ত তিনি।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্দায়ও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন বানিতা। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘ব্রিজারটন’-এর তৃতীয় মৌসুমে মিস মালহোত্রা চরিত্রে অভিনয় করেন। কাজ করেছেন মার্কিন সিরিজ ‘প্যান্ডোরা’-তেও।
২০২৫ সালে দেখা গেছে ‘ডিটেকটিভ শেরদিল’-এ। ২০২৬ সালে অভিনয় করেছেন ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ ছবিতে।
অভিনয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে লেখালেখি ও প্রযোজনাতেও যেতে চান বানিতা। তাঁকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলিউডের অভিনেত্রী, নাকি হলিউডের। এ বিভাজনকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না তিনি। ভালো গল্প ও চরিত্র যেখানে, সেখানেই কাজ করতে চান।
ফিল্মফেয়ার, দ্য গার্ডিয়ান, ইন্ডিয়া টু ডে, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া, বলিউড হাঙ্গামা, দ্য হ্যান্ডবুক অবলম্বনে