রূপ নয়, সাহস দিয়ে জয় করা এক নায়িকা
বলিউডে একসময় রাজত্ব ছিল মুমতাজের। তবে সেই রাজত্ব এক দিনে গড়ে ওঠেনি। তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে অভাব, অবহেলা, প্রতিকূলতা আর নীরব যুদ্ধের পথ।
আজ ৩১ জুলাই, মুমতাজের জন্মদিন। এই দিনে তাঁকে মনে করার মানে শুধুই তাঁর রূপ ও অভিনয় নয়—তাঁর আত্মত্যাগ, মানসিক দৃঢ়তাকেও সম্মান জানানো।
শুরুর শুরু
১৯৪৭ সালের এই দিনে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) জন্ম নেন মুমতাজ। বাবা আবদুল সামিদ আসকারী ও মা সরদার বেগম হাবিব আগা (চলচ্চিত্রে ‘নাজ’ নামে পরিচিত)। মা ছিলেন চলচ্চিত্রে যুক্ত, বোন মালিকাও কিছুদিন সিনেমায় ছিলেন, তবে বিয়ের পর বিদায় নেন।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে ‘সংসার’ (১৯৫২) ছবিতে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান মুমতাজ। এরপর ‘ইয়াসমিন’ (১৯৫৫), ‘লজ্জাবন্তী’, ‘সোনে কি চিড়িয়া’(১৯৫৮), ‘স্ত্রী’ (১৯৬১)—এমন অনেক ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থার কারণে তাঁকে নিয়মিত কাজ করতে হতো। তাঁর শৈশব কেটেছে স্টুডিওর আনাচকানাচে, আলোর বাইরে, ‘স্টান্ট গার্ল’ হিসেবে কাজ করে।
নায়িকা নয় যুদ্ধের পথ
মুমতাজ পূর্ণবয়স্ক চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ১৯৬৩ সালে ও পি রলহানের ‘গোহরা দাগ’ ছবিতে। এরপর আতাউল্লাহ খানের ‘পাঠান’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় সাইন করলেও ছবিটি শেষ হয়নি। তখনো বলিউডে নায়িকা হওয়ার মতো ‘গ্রেস’ ছিল না বলেই অনেকে মনে করতেন। তাই বি গ্রেড অ্যাকশন ছবিতে কাজ শুরু করেন, তা–ও আবার শারীরিক কসরতের ঘরানায়।
১৯৬৪ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত দারা সিংয়ের সঙ্গে মোট ১৬টি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি—‘ফৌলাদ’, ‘বক্সার’, ‘হারকিউলিস’, ‘সামসন’, ‘রাকা’, ‘টারজান কামস টু দিল্লি’, ‘রুস্তম-ই-হিন্দ’, ‘ডাকু মঙ্গল সিং’—যার মধ্যে ১০টি ছবিই বক্স অফিসে হিট হয়। তিনি প্রতি ছবিতে প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন—যা একজন বি গ্রেড নায়িকার জন্য ছিল বিস্ময়কর!
তারকা হয়ে ওঠা
এই সংগ্রামের মধ্যেই মুমতাজের অভিনয় নজরে পড়ে গুণী পরিচালকদের। ‘সেহরা’, ‘কাজল’, ‘হামরাজ’, ‘সুরজ’, ‘পাথর কে সনম’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘ব্রহ্মচারী’—এমন ছবিতে তাঁকে দেখা যায় সহনায়িকা বা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে।
তবে ভাগ্য বদলায় ১৯৬৯ সালে। রাজ খোসলার ‘দো রাসতে’ ছবিতে রাজেশ খান্নার বিপরীতে অভিনয় করে রাতারাতি মূলধারার তারকা হয়ে ওঠেন। এর আগেই ‘আরাধনা’ ছবির মাধ্যমে রাজেশ খান্না সুপারস্টার হয়ে উঠলেও তাঁর পরের দুটি হিট—‘দো রাসতে’ ও ‘বন্ধন’-এ প্রধান নায়িকা ছিলেন মুমতাজ। রাজেশ-মুমতাজ জুটি হয়ে ওঠে বলিউডের ‘গোল্ডেন পেয়ার’।
এরপর একে একে মুক্তি পায়—‘আপনা দেশ’, ‘আপ কি কসম’, ‘সাচ্চা ঝুঠা’, ‘প্রেম কাহানি’, ‘রোটি’—সবই সুপারহিট। তাঁদের রসায়ন এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে বাস্তব জীবনেও প্রেমের গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যদিও তাঁরা কখনো তা স্বীকার করেননি।
‘খিলোনা’ বদলে দেয় সবকিছু
১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘খিলোনা’ ছবিতে ‘চাঁদ’ চরিত্রে অভিনয় করে মুমতাজ প্রথমবার ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন এমন এক তারকা, যিনি একই সঙ্গে গ্ল্যামারাস, সংবেদনশীল এবং চরিত্রনির্ভর অভিনয়ে পারদর্শী।
‘সাওন কি ঘটা’, ‘লোফার’, ‘চোর মাচায়ে শোর’, ‘ঝিল কে উস পার’, ‘অপরাধ’, ‘আপনা দেশ’, ‘হামরাজ’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’, ‘তেরে মেরে সাপনে’, ‘হামজোলি’—সবখানেই মুমতাজ নিজেকে আলাদাভাবে মেলে ধরেন।
শুধু গ্ল্যামারই নয়, তাঁর অভিনয়ে ছিল প্রাণ, ছন্দ ও আবেগ। তিনি নেতিবাচক বা ইতিবাচক, গ্রামীণ বা শহুরে—সব চরিত্রেই স্বাভাবিকতা আনতেন, যেন প্রতিটি চরিত্র তাঁর জন্যই লেখা।
শাম্মি কাপুর, প্রেম ও অপূর্ণতা
মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রেমে পড়েন শাম্মি কাপুরের। শাম্মি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, তবে শর্ত ছিল অভিনয় ছাড়তে হবে। তখন মুমতাজ বলিউডে নিজের জায়গা পাকা করছিলেন। তাই সে প্রস্তাবে ‘না’ বলেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ওটা প্রেম ছিল, তবে তার থেকেও বেশি কিছু। আজও তাঁর নাম শুনলে চোখ ভিজে যায়।’
সংসারের টানে বিদায়
১৯৭৪ সালে যখন তিনি বলিউডের শীর্ষে, তখন বিয়ে করেন উগান্ডার ব্যবসায়ী ময়ূর মাধবানিকে। বিয়ের পর অভিনয় ছেড়ে দেন। যদিও কিছু চুক্তিবদ্ধ ছবির কাজ শেষ করেন ১৯৭৬ পর্যন্ত।
‘আমি তখন সাড়ে সাত লাখ রুপি পারিশ্রমিক পেতাম। তবু সংসারের জন্য অভিনয় ছেড়ে দেওয়া আমার কাছে কোনো ত্যাগ মনে হয়নি। আমি প্রেমে ছিলাম’, বলেন মুমতাজ।
জীবন, একাকিত্ব ও ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই
দাম্পত্য জীবন ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা—গর্ভপাত, স্বামীর পরকীয়া, দীর্ঘ একাকিত্ব। একসময় ভারতে ফিরে এসে নতুন এক সম্পর্কে জড়ান। পরে বলেন, ‘আমি জানি, ওটা ভুল ছিল, কিন্তু একাকিত্ব মানুষকে অনেক কিছু করিয়ে ফেলে।’ তবু তিনি সংসার ভাঙেননি।
২০০০ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ইউরোপে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ‘মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গেলে বোঝা যায় জীবনের মানে। এখন আমি প্রতিটি দিন উদ্যাপন করি’, বলেন মুমতাজ।
অভিনয়ে ফিরেও ফিরে না আসা
১৯৯০ সালে ‘আন্ধিয়ান’ ছবির মাধ্যমে ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থতা দেখে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, আর নয়। বলেন, ‘আমার সময় ফুরিয়ে গিয়েছিল, আমি সেটা মেনে নিয়েছিলাম।’
এখন কেমন আছেন?
বর্তমানে লন্ডনে বাস করেন মেয়ে নাতাশা (যিনি ফারদিন খানের স্ত্রী) ও তানিয়ার সঙ্গে, মাঝেমধ্যে ভারতেও আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে এখনো আগ্রহের শেষ নেই। কয়েক বছর আগে জিমে ব্যায়াম করার ভিডিও ভাইরাল হলে নতুন প্রজন্মও তাঁকে খুঁজে নিতে শুরু করে।
ইন্ডিয়ান আইডল-এর মঞ্চে বিশেষ অতিথি হয়ে এলে বিচারকেরাও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
এক জীবনে কত না গল্প!
মাত্র ১৪ বছরের ক্যারিয়ার, ১১৫টির বেশি ছবি। একাধিক প্রেম, অসুস্থতা, স্বামীকে ক্ষমা করা, মৃত্যু থেকে ফিরে আসা, নিজের জায়গা নিজে করে নেওয়া—মুমতাজের জীবন যেন সিনেমাকেও হার মানায়।
মুমতাজ নিজেই বলেছিলেন, ‘জীবন মানে শুধু সাফল্য নয়, সেটা সাহস, ত্যাগ আর নিজের সঙ্গে খুশি থাকার গল্প।’