দিল্লির আন্দোলনের বিরুদ্ধে পোস্ট দিয়ে আলোচনায়, কে এই অভিনেত্রী
ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে করা একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে মালয়ালম অভিনেত্রী, টেলিভিশন উপস্থাপক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় মুখ পার্ল মানি। একদল নেটিজেন তাঁর মন্তব্যকে সংবেদনশীল সময়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, অভিনেত্রী তাঁর ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকারই ব্যবহার করেছেন, তবে এটি প্রথম নয়। পার্ল মানির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও কম আসেনি। কখনো রিয়েলিটি শোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য—বারবারই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে তাঁর নাম।
উপস্থাপনা থেকে অভিনয়ে
পার্ল মানির জন্ম ১৯৮৯ সালের ২৮ মে, কেরালার আলাপ্পুঝায়। ছোটবেলা থেকেই গান, নাচ ও মঞ্চে পারফর্ম করার প্রতি আগ্রহ ছিল। পড়াশোনা শেষে করপোরেট চাকরিতে যোগ দিলেও খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, তাঁর আসল জায়গা বিনোদনজগৎ। সেই উপলব্ধি থেকেই টেলিভিশনে উপস্থাপক হিসেবে যাত্রা শুরু।
পার্ল মানির প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, স্বতঃস্ফূর্ত কথাবার্তা এবং দর্শকদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাঁকে অল্প সময়েই জনপ্রিয় করে তোলে। মালয়ালম টেলিভিশনের বিভিন্ন বিনোদন অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী এবং বিশেষ আয়োজনে নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে অভিনয়েও সুযোগ পান। বড় পর্দা ও ছোট পর্দা—দুই জায়গাতেই কাজ করেছেন। যদিও অভিনয়ের চেয়ে উপস্থাপক ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেই তাঁর পরিচিতি বেশি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা পরিচিতি
ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও ফেসবুকে পার্ল মানির অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। ভ্রমণ, পারিবারিক জীবন, ফ্যাশন, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং মোটিভেশনধর্মী ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে স্বামী অভিনেতা শ্রীনিশ অরবিন্দ ও দুই মেয়েকে নিয়ে তৈরি ভিডিও ও ভ্লগ ব্যাপক জনপ্রিয়। ভারতের আঞ্চলিক তারকাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করা ব্যক্তিদের একজন হিসেবে তাঁকে ধরা হয়। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট থেকেও তিনি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছেন।
‘বিগ বস মালয়ালম’ বদলে দেয় জীবন
২০১৮ সালে বিগ বস মালয়ালমের প্রথম আসরে অংশ নেওয়ার পর পার্ল মানির জনপ্রিয়তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। অনুষ্ঠানটিতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অভিনেতা শ্রীনিশ অরবিন্দ। রিয়েলিটি শোর মধ্যেই তাঁদের বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়।
অনুষ্ঠান শেষে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখেন দুজন। ২০১৯ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। পরে তাঁদের সংসারে দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। রিয়েলিটি শো থেকে শুরু হওয়া এই প্রেমের গল্প আজও ভক্তদের কাছে অন্যতম আলোচিত তারকাপ্রেমের উদাহরণ।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিতর্ক
২০২১ সালে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন জনপ্রিয় ইউটিউবার ও ব্লগার বিজয় পি নায়ার। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে মারধর ও অপদস্থ করার ঘটনায় পার্ল মানিও যুক্ত ছিলেন। পরে পুলিশ তাঁকেও আটক করে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এক পক্ষের দাবি ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলেন, আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। ঘটনাটি পার্ল মানির ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বিতর্ক পিছু ছাড়েনি
পার্ল মানি বরাবরই সামাজিক নানা বিষয়ে নিজের মতপ্রকাশ করেন। কখনো নারীর অধিকার, কখনো সামাজিক বৈষম্য, কখনো জনজীবনের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পোস্ট করেছেন। তবে এ মন্তব্যের কারণে একাধিকবার সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।
সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রও একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট। ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তাঁর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট নয় কিংবা সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, একটি পোস্টকে ঘিরে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করা উচিত।
২৪ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেন পার্ল মানি। পোস্টটি প্রকাশের সময় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ। ২৬ জুলাই সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ২৪ লাখে। পোস্টটি ঘিরে ব্যাপক সমালোচনার পর মন্তব্য করার সুযোগ (কমেন্ট) বন্ধ করে দেন তিনি। তবে তাঁর অন্য পোস্টগুলোয় সমালোচনামূলক মন্তব্য অব্যাহত রয়েছে।
পর্দার বাইরের মানুষ
বিতর্কের বাইরেও পার্ল মানির আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন, অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন এবং তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। মা হওয়ার অভিজ্ঞতা, মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মজীবন ও পারিবারিক ভারসাম্য নিয়েও নিয়মিত কথা বলেন।
তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে পরিবারকেন্দ্রিক কনটেন্ট বিশেষ জনপ্রিয়। ভক্তদের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার কারণে তাঁদের সঙ্গে তাঁর একটি আলাদা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে