‘টক্সিক’ নিয়ে বিতর্ক, নারী পরিচালকের সিনেমায় নারীরাই কি অবহেলিত

গীতু মোহনদাস ও ‘টক্সিক’ সিনেমার দৃশ্য। কোলাজ

শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’। যশের প্রত্যাবর্তন, বিশাল বাজেট, তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী এবং পরিচালক হিসেবে গীতু মোহনদাস—সব মিলিয়ে সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু মুক্তির আগেই যৌনতা, নারীর উপস্থাপন ও সহিংসতার অভিযোগে বিতর্কে জড়ায় ছবিটি। মুক্তির পর সেই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমালোচকদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও। অথচ ‘লিয়ার্স ডাইস’ ও ‘মুথোন’-এর মতো প্রশংসিত সিনেমা দিয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন গীতু। ‘টক্সিক’ তাই শুধু একটি বড় বাজেটের সিনেমা নয়, তাঁর ক্যারিয়ারেরও এক বড় পরীক্ষা।

ভারতের দক্ষিণী সিনেমায় এমন পরিচালক খুব বেশি নেই, যাঁদের নাম শুনলেই দর্শকের মনে ‘বাণিজ্যিক’ ছবির চেয়ে ‘বিষয়ভিত্তিক’ ও ‘শৈল্পিক’ সিনেমার কথা আগে আসে। গীতু মোহনদাস তাঁদের একজন। তাঁর পরিচালিত ‘লিয়ার্স ডাইস’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছিল, পেয়েছিল জাতীয় পুরস্কারও। এরপর মুথোন তাঁকে আরও শক্তিশালী নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

সেই গীতুই এবার তৈরি করেছেন যশকে নিয়ে বিশাল বাজেটের গ্যাংস্টার সিনেমা ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’। ২৬ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর ছবিটির সামনে এখন আরেক বাস্তবতা—সমালোচকদের বড় অংশ ছবিটিকে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বলছেন। কেউ গল্পের দুর্বলতা, কেউ দীর্ঘ সময়, কেউ নারীর উপস্থাপন, আবার কেউ অতিরিক্ত সহিংসতার সমালোচনা করছেন।

বিতর্কের শুরু সেই টিজার থেকেই
‘টক্সিক’-এর প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল যশের চরিত্র রায়া। টিজারে বন্দুক, রক্তপাত, হিংসা ও যৌনতার ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য ছিল। বিশেষ করে গাড়ির ভেতরে যশের চরিত্রের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা হয়।

বিতর্ক এতটাই বাড়ে যে আম আদমি পার্টির নারী শাখা কর্ণাটক রাজ্য মহিলা কমিশনে অভিযোগ করে। অভিযোগে টিজারের দৃশ্যগুলোকে অশ্লীল ও আপত্তিকর বলা হয় এবং এগুলো নারী ও শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে দাবি করা হয়।

পরে আরেকটি ধর্মীয় সংগঠনও ছবিটির প্রচারমূলক ভিডিও নিয়ে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের কাছে অভিযোগ করে। তাদের আপত্তির মধ্যে ছিল অশ্লীল দৃশ্যের পাশাপাশি একটি কবরস্থানের লড়াইয়ের দৃশ্যে আর্চএঞ্জেল মাইকেলের মূর্তি ব্যবহারের বিষয়টি।

অর্থাৎ মুক্তির আগেই টক্সিককে ঘিরে প্রশ্নটা দাঁড়িয়ে যায়—এটি কি শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি একটি অন্ধকার গ্যাংস্টার গল্প, নাকি নারীর শরীর ও যৌনতাকে বাজারজাত করার আরেকটি উদাহরণ?

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠল গীতুকে ঘিরে
বিতর্কের জায়গাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে পরিচালক গীতু মোহনদাসের কারণে। কারণ, নারীকে কীভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে গীতু নিজেই অতীতে সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে মালয়ালম সিনেমা ‘কাসাবা’-তে নারীর উপস্থাপন নিয়ে তাঁর সমালোচনা আলোচনায় এসেছিল। সেই গীতুর সিনেমাতেই এবার নারী চরিত্রগুলোর উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘টক্সিক’-এর টিজার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন—যে নির্মাতা একসময় পর্দায় নারীর অবমাননাকর উপস্থাপনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাঁর নিজের ছবিতে একই ধরনের দৃশ্য কেন?

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছে, ‘কাসাবা’ নিয়ে গীতুর পুরোনো অবস্থানের সঙ্গে ‘টক্সিক’-এর টিজারে নারীর উপস্থাপনার মিল খুঁজে দেখে দর্শকের একাংশ দ্বিমত প্রকাশ করেছে।

এখানেই বিতর্কটি শুধুই ‘অশ্লীলতা’র বিতর্ক থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে একজন নারী নির্মাতার শিল্পীসত্তা বনাম তাঁর তৈরি ছবির নৈতিক অবস্থানের বিতর্ক।

গীতুর পক্ষে দাঁড়ালেন যশ
বিতর্কের মধ্যে গীতুকে একা থাকতে দেননি যশ। ছবির প্রচারণায় তিনি বারবার পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যশের বক্তব্য, ছবির প্রচারমূলক কিছু দৃশ্য দেখে পুরো সিনেমাকে বিচার করা ঠিক নয়। তাঁর দাবি, ‘টক্সিক’-এ নারীদেরও নিজস্ব কণ্ঠ আছে। ছবিটিকে তিনি সাহসী ও ভিন্নধর্মী কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, গীতু মোহনদাসের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর তাঁর আস্থা ছিল বলেই তিনি এই পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন।

অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়েও যশের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো কোনো ‘গিমিক’ নয়; ছবির ভেতরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলার জন্যই এমন দৃশ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত সিনেমা।

আরও সরাসরি ভাষায় যশ বলেছেন, টক্সিক কোনো সীমা অতিক্রম করেনি। ‘টাবাহি’ গান নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে বাণিজ্যিক কাজ নিয়ে তাঁর বাস্তববাদী অবস্থানও সামনে আসে।

গীতু মোহনদাস। নির্মাতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

হুমা কুরেশির আপত্তি ট্রোলিংয়ে
‘তাবাহি’ গান প্রকাশের পর বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন কিয়ারা আদভানি। যশের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের কটাক্ষ শুরু হয়। এমনকি কিয়ারা বিবাহিত এবং মা—এই বিষয়টিও ট্রলিংয়ের অস্ত্র হয়ে ওঠে।
সহশিল্পী হুমা কুরেশি এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর মতে, একই দৃশ্যে থাকা যশকে বাদ দিয়ে শুধু কিয়ারাকে আক্রমণ করা নিছক দ্বিচারিতা। তিনি এই ধরনের ট্রলিংকে ‘অসুস্থ’ ও ‘জঘন্য’ বলে অভিহিত করেন এবং কিয়ারার পাশে দাঁড়ান।

এই ঘটনা ‘টক্সিক’-এর বিতর্কে আরেকটি মাত্রা যোগ করে—নারী চরিত্রের উপস্থাপন যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনি সেই চরিত্রে অভিনয় করা নারীর ব্যক্তিজীবনকে টেনে এনে বিচার করার প্রবণতাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে যাকে নিয়ে এত কথা সেই গীতু এখন পর্যন্ত সিনেমাটির কোনো বিতর্কেরই উত্তর দেননি।

কিয়ারার চোখে সম্পর্কের ধূসর দিক
কিয়ারাও ছবিটি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, টক্সিক পুরুষ-নারীর সম্পর্ককে সাদা-কালোভাবে দেখায় না; বরং সম্পর্কের ধূসর জায়গাগুলোকে সামনে আনে।

এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ছবির প্রচারণায় যেভাবে নারীদের যশের চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট, মুগ্ধ বা নির্ভরশীল হিসেবে দেখা গেছে, তার বাইরে সিনেমাটিতে নারী চরিত্রগুলোর কী ভূমিকা আছে—সেটিই ছিল দর্শকের বড় কৌতূহল।

মুক্তির পরও এই প্রশ্ন পুরোপুরি থামেনি। বরং নতুন সমালোচনা এসেছে যে ছবির বেশ কিছু নারী চরিত্র শেষ পর্যন্ত পুরুষকেন্দ্রিক গল্পের আশপাশেই ঘোরে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বাংলা সংস্করণের পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, ছবির নারী চরিত্রগুলোকে মূলত পুরুষ চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা থেকে দেখানো হয়েছে।

‘লেডিস অ্যান্ড লেডিস’ দিয়ে কি জবাব দেওয়ার চেষ্টা
মুক্তির আগে নির্মাতারা নারী চরিত্রগুলোর আলাদা একটি প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করেন—‘লেডিস অ্যান্ড লেডিস’। সেখানে নয়নতারা, কিয়ারা, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্তকে বন্দুক হাতে অ্যাকশন দৃশ্যে দেখা যায়।
এতে বোঝানোর চেষ্টা ছিল, ‘টক্সিক’-এর নারীরা শুধু নায়কের প্রেমিকা বা সৌন্দর্যের প্রদর্শনী নন; তাঁদেরও নিজস্ব ক্ষমতা ও গল্প রয়েছে।

নয়নতারাও ছবিতে অভিনয়ের কারণ হিসেবে তাঁর চরিত্রের শক্তির কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য কোনো গল্পে থাকতে চান না; ‘গঙ্গা’ চরিত্রটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বলেই তিনি এতে আগ্রহী হয়েছেন।

‘টক্সিক’ সিনেমায় নয়নতারা। ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘লিয়ার্স ডাইস’ থেকে ‘টক্সিক’: একেবারে অন্য গীতু
গীতু মোহনদাসের ক্যারিয়ার দেখলে টক্সিককে আরও অদ্ভুত এক বাঁক বলে মনে হয়। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গীতু। পরে অভিনেত্রী হিসেবে মালয়ালম সিনেমায় প্রতিষ্ঠা পান। ২০০৪ সালে আকালে ছবির জন্য কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

কিন্তু গীতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তৈরি হয় পরিচালক হিসেবে। ২০১৩ সালের ‘লিয়ার্স ডাইস’ ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। প্রত্যন্ত গ্রামের এক মা নিখোঁজ স্বামীকে খুঁজতে বের হন—এই সহজ গল্পের মধ্য দিয়ে অভিবাসন, দারিদ্র্য, শোষণ ও মানুষের হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তুলে ধরেছিলেন গীতু।

ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে দুটি পুরস্কার জেতে এবং অস্কারের জন্য ভারতের সরকারি মনোনয়নও পায়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও ছবিটি প্রশংসিত হয়।

এরপর ‘মুথোন’। নিভিন পাউলিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে দ্বীপ থেকে মুম্বাই—এক তরুণের ভাইকে খুঁজে ফেরার গল্পের মধ্যে অপরাধজগৎ, যৌন পরিচয়, পরিবার, সহিংসতা ও ভালোবাসার জটিল সম্পর্ক তুলে ধরেছিলেন গীতু। ছবিটির চিত্রনাট্যের জন্য তিনি ২০১৬ সালে সানড্যান্সের গ্লোবাল ফিল্মমেকিং অ্যাওয়ার্ড পান।
সেই নির্মাতা যখন যশের মতো বিশাল তারকার সঙ্গে কয়েক শ কোটি রুপির বাণিজ্যিক ছবিতে হাত দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—গীতু হয়তো মূলধারার সিনেমার ভাষাটাকেই নতুনভাবে ব্যবহার করবেন।

‘টক্সিক’-এর বাজি ছিল বিশাল
টক্সিক শুধু যশের সিনেমা নয়, নির্মাতা হিসেবে গীতুর জন্যও ছিল বিরাট ঝুঁকি। ছবিটি ১৯৪০-এর দশকের গোয়া থেকে শুরু করে কয়েক দশকের অপরাধজগতের গল্প বলে। যশকে রায়া চরিত্রে দেখা গেছে, পাশাপাশি ছবিতে রয়েছেন নয়নতারা, কিয়ারা আদভানি, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্ত। ছবিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ ঘণ্টা ১৪ মিনিট।
এত বড় পরিসরের ছবিতে গীতুর আগের সিনেমার মতো সূক্ষ্ম মানবিক গল্প বলার জায়গা কতটা থাকবে—সেটিই ছিল কৌতূহল।
কিন্তু মুক্তির পর সমালোচকদের বড় অংশ বলছেন, এখানেই ছবিটি হোঁচট খেয়েছে।

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

মুক্তির পর সমালোচকদের হতাশা
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর পর্যালোচনায় ছবিটিকে ‘হইচইয়ে ভরা, কিন্তু সারবস্তুতে দুর্বল’ ধরনের সিনেমা হিসেবে দেখা হয়েছে। সমালোচনায় বলা হয়েছে, ছবিটি গীতু মোহনদাস পরিচালিত হলেও শেষ পর্যন্ত এটি অনেক বেশি ‘রকিং স্টার যশের সিনেমা’ হয়ে উঠেছে।  ছবির অ্যাকশন, ভিজ্যুয়াল ও প্রযুক্তিগত কাজের প্রশংসা থাকলেও গল্প ও আবেগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টার ছবিতে বন্দুকযুদ্ধ, রক্তপাত ও স্টাইলের আধিক্য থাকলেও চরিত্রগুলোর আবেগ দর্শকের সঙ্গে যথেষ্ট সংযোগ তৈরি করতে পারেনি বলে সমালোচনা এসেছে।

দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ছবিটিকে ২.৫/৫ দিয়ে বলেছে, দীর্ঘ রানটাইম ছবিটির দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অ্যাকশন দৃশ্য অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে দীর্ঘ হয়েছে, সম্পাদনা আরও টানটান হওয়া দরকার ছিল—এমন সমালোচনাও করা হয়েছে।

এমনকি ছবির ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য ও যশের উপস্থিতির প্রশংসা করেও অনেক সমালোচক গল্পের জটিলতা, আবেগের ঘাটতি ও অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

তাহলে কি ‘টক্সিক’ গীতুর ব্যর্থতা
এখনই এমন চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়তো তাড়াহুড়া হবে। কারণ, বাণিজ্যিক সিনেমার সাফল্য শুধু সমালোচকের রিভিউ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি শক্তিশালী অগ্রিম বুকিং এবং দর্শক আগ্রহ দেখিয়েছে। সমালোচনা নেতিবাচক হলেও বক্স অফিসে ছবিটির শুরু দুর্বল নয়।

কিন্তু একজন নির্মাতার ক্যারিয়ারের বিচারে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। গীতু মোহনদাস এত দিন যে সিনেমার জন্য পরিচিত ছিলেন, ‘টক্সিক’ তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। ‘লিয়ার্স ডাইস’ ছিল নীরব, সংবেদনশীল ও বাস্তবতার কাছাকাছি। ‘মুথোন’ ছিল চরিত্রনির্ভর ও বহুস্তরীয়। আর ‘টক্সিক’ তারকানির্ভর ও অ্যাকশনপ্রধান পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক সিনেমা।

এই পরিবর্তন নিজেই সমস্যা নয়। একজন নির্মাতার ভিন্ন ভাষায় নানা ধরনের কাজ করতেই পারেন।  কিন্তু সমালোচনার জায়গাটি হলো, এত বড় ক্যানভাসে গীতুর নিজস্ব স্বর কতটা টিকে থাকল?

আরও পড়ুন

মুক্তির পর ভাইরাল পুরোনো ভিডিও
মুক্তির পর সমালোচনার মুখে পড়েছে যশ অভিনীত ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে পরিচালক গীতু মোহনদাসের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের ভিডিও। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কখনো চিত্রনাট্য মেনে চলি না।’ ছবিটি নিয়ে চলমান নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পুরোনো সেই বক্তব্যই যেন নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

ভাইরাল ভিডিওতে গীতুকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কিছু লিখি, অন্য কিছু শুট করি, আবার অন্য কিছু এডিট করি। এরপর সিনেমা মুক্তি পায়। তখন আমি খুশি হই।’ এরপর আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো চিত্রনাট্য মেনে চলি না।’
সাক্ষাৎকারে গীতু তাঁর কাজের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, নির্মাণের সময় গল্প ও সিনেমার রূপ বদলে যেতে পারে—এমন স্বাধীনতা তিনি নিজের জন্য রাখেন। এমনকি প্রযোজকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি তাঁদের সতর্ক করে দেন যে চিত্রনাট্যে তাঁরা যা পড়ছেন, শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটিই পর্দায় দেখতে পাবেন না। গীতুর বক্তব্য ছিল, ‘আপনারা যা পড়ছেন, তা আপনারা পাবেন না।’

সাক্ষাৎকারে নিজের পরবর্তী সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে গীতু বলেন, প্রযোজকদের সঙ্গে আলোচনার সময়ও তিনি একই কথা বলেন—চিত্রনাট্য পড়ার পর তাঁরা যে সিনেমার কথা ভাবছেন, শেষ পর্যন্ত সেই সিনেমাই তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভিডিওটি যে সময় নতুন করে ছড়িয়েছে, সেটিই এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ‘টক্সিক’ মুক্তির পর ছবিটি নিয়ে দর্শকের একটি অংশ হতাশা প্রকাশ করছে। ফলে গীতুর ‘চিত্রনাট্য মেনে চলি না’ মন্তব্যকে কেউ কেউ ছবিটির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে