‘কয়েদি নম্বর ১৬৬৫৬: কারাগারে যেভাবে দিন কাটত সঞ্জয় দত্তের’
তাঁর বাস্তব জীবন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। তারকাখ্যাতি, মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই, মায়ের মৃত্যু, প্রেম ও দাম্পত্যের টানাপোড়েন, আইনি জটিলতা, কারাবাস এবং আবার রুপালি পর্দায় ঘুরে দাঁড়ানো—সবই আছে সঞ্জয় দত্তের জীবনে।
গত ২৯ জুলাই ছিল এই অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫৯ সালের এই দিনে কিংবদন্তি অভিনেতা সুনীল দত্ত ও নার্গিসের ঘরে জন্মেছিলেন তিনি। ৬৭ বছরে পা দেওয়া সঞ্জয় দত্ত চার দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ। পর্দায় কখনো প্রেমিক, কখনো গ্যাংস্টার, কখনো খলনায়ক, আবার কখনো হাস্যরসিক এক চিকিৎসক হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় কোনো সিনেমার গল্প নয়; সেটি ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত, অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে দণ্ড এবং কারাগারে কাটানো দিনগুলোর গল্প।
মায়ের মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই অভিষেক
সঞ্জয় দত্তের অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল শোকের মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে বাবা সুনীল দত্ত পরিচালিত ‘রকি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। ছবিটি মুক্তির মাত্র কয়েক দিন আগে ক্যানসারে মারা যান তাঁর মা নার্গিস। ছেলের প্রথম ছবি প্রেক্ষাগৃহে দেখে যেতে পারেননি তিনি।
‘রকি’ সাফল্য পাওয়ার পর সঞ্জয়ের সামনে বলিউডের দরজা খুলে যায়। কিন্তু শুরু থেকেই তাঁর পথ মসৃণ ছিল না। ব্যক্তিগত সংকট ও মাদকাসক্তির কারণে একসময় তাঁকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছিল। সেই অধ্যায় পেরিয়ে তিনি আবার অভিনয়ে মনোযোগী হন।
আশির দশকের মাঝামাঝি ‘নাম’ সঞ্জয়কে নতুনভাবে দর্শকদের সামনে আনে। এরপর ‘সাজন’, ‘সড়ক’, ‘খলনায়ক’, ‘গুমরাহ’, ‘আতিশ’, ‘বাস্তব’, ‘মিশন কাশ্মীর’সহ একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন তিনি। বিশেষ করে ‘বাস্তব’-এ গ্যাংস্টার রঘুর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়।
অ্যাকশন ও অপরাধজগতের চরিত্রের বাইরে ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ সঞ্জয়ের ক্যারিয়ারে নতুন মোড় আনে। মুন্না ভাই চরিত্রের হাস্যরস, আবেগ ও মানবিকতা তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। পরে ‘লাগে রহো মুন্না ভাই’ সেই জনপ্রিয়তা আরও বাড়ায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নায়ক নয়, শক্তিশালী খল চরিত্রেও নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন সঞ্জয়। ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এ অধীরার চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি আলোচিত হয়। হিন্দির পাশাপাশি কন্নড়, তামিল ও তেলেগু সিনেমাতেও নিয়মিত কাজ করছেন তিনি।
যে ঘটনায় বদলে গেল জীবন
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাইয়ের একাধিক স্থানে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে বহু মানুষ নিহত হন। সেই হামলার তদন্ত চলাকালে সঞ্জয় দত্তের কাছে অবৈধ অস্ত্র থাকার তথ্য সামনে আসে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি তিনটি একে-৫৬ রাইফেল ও গোলাবারুদ গ্রহণ করেছিলেন; পরে দুটি ফেরত দিলেও একটি নিজের কাছে রেখেছিলেন বলে তাঁর স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ ছিল।
সঞ্জয় দত্ত বরাবরই দাবি করেছিলেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার আশঙ্কা থেকে অস্ত্রটি রেখেছিলেন। তবে আদালত তাঁর সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মুম্বাই বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্র বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ থেকে সঞ্জয় দত্তকে খালাস দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় অস্ত্র আইনে অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং তা নষ্ট করার অপরাধে। ২০০৭ সালে বিশেষ টাডা আদালত তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দণ্ড বহাল রেখে সাজা ছয় বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর করেন।
যেভাবে তদন্তে উঠে আসে ‘সঞ্জু বাবা’র নাম
১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণ মামলার অন্যতম তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন আইপিএস রাকেশ মারিয়া। গেল দুই বছর এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই তদন্তের কয়েকটি অজানা মুহূর্ত তুলে ধরেছেন। রাকেশের ভাষ্য অনুযায়ী, বান্দ্রার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী হানিফ কদাওয়ালা এবং প্রযোজক সামীর হিঙ্গোরা প্রথম সঞ্জয় দত্তের নাম তদন্তকারীদের কাছে বলেন। শুরুতে তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করছিলেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তাঁরা বলেন, বড় কোনো নাম সামনে এলেই পুলিশ পিছিয়ে যাবে।
রাকেশ তাঁদের কাছে সেই বড় ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘সঞ্জু বাবা’। নামটি শুনে রাকেশ প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলেন। বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে বিস্ফোরণ মামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের যোগসূত্র কীভাবে থাকতে পারে, সেটিই ছিল তাঁর প্রশ্ন।
রাকেশের দাবি, অস্ত্র সরবরাহকারী ব্যক্তিরা একটি গাড়িতে করে সঞ্জয় দত্তের বাড়িতে গিয়েছিলেন। গাড়ির গোপন অংশে রাখা অস্ত্র নামিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখার প্রয়োজন ছিল। সঞ্জয়কে আগে থেকেই ফোনে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তিনি তাঁদের গাড়ি বাইরে রেখে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে রাকেশ সাক্ষাৎকারে দাবি করেন। সঞ্জয় কিছু অস্ত্র নিজের কাছে রেখে পরে বেশির ভাগ অস্ত্র ফেরত দিয়েছিলেন বলেও জানান রাকেশ।
বিমানবন্দর থেকে ক্রাইম ব্রাঞ্চে
তদন্তকারীরা যখন সঞ্জয় দত্তের সম্পৃক্ততার তথ্য পান, তখন তিনি মরিশাসে শুটিং করছিলেন। পুলিশ তাঁর দেশে ফেরার অপেক্ষা করে। ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে মুম্বাই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে আটক করে ক্রাইম ব্রাঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। রাকেশ মারিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, সঞ্জয়কে ক্রাইম ব্রাঞ্চের এমন একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল, যেখানে একটি বাথরুম থাকলেও তার দরজা খুলে নেওয়া হয়েছিল। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে যেন সিগারেট দেওয়া না হয় এবং কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে না দেওয়া হয়।
রাত আড়াইটার দিকে সঞ্জয়কে সেখানে রাখা হয়। সকাল আটটার দিকে রাকেশ কক্ষে গিয়ে তাঁর কাছে ঘটনার সত্যতা জানতে চান। সঞ্জয় শুরুতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন।
রাকেশ মারিয়ার ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তিনি সঞ্জয়কে চড় মারেন। এরপর সঞ্জয় একা কথা বলার অনুরোধ করেন এবং ঘটনার বিবরণ দেন।
সঞ্জয়ের তখন একটাই অনুরোধ ছিল—বাবা সুনীল দত্তকে যেন বিষয়টি জানানো না হয়। রাকেশকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভুল করেছি। দয়া করে বাবাকে বলবেন না।’ রাকেশ তাঁকে জানান, তাঁর বাবাকে অবশ্যই জানাতে হবে। ভুলের মাশুলও তাঁকে দিতে হবে।
বাবার পায়ে পড়ে ক্ষমা
সেদিন সন্ধ্যায় সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে দেখা করতে ক্রাইম ব্রাঞ্চে যান তাঁর বাবা সুনীল দত্ত। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমার, নির্মাতা মহেশ ভাট, প্রযোজক যশ জোহর ও রাজনীতিক বলদেব খোসা।
তাঁরা তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, সঞ্জয় এমন ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। এরপর সঞ্জয়কে অন্য একটি কক্ষে আনা হয়, যেখানে তাঁর বাবা অপেক্ষা করছিলেন।
রাকেশ মারিয়ার স্মৃতিতে সেই দৃশ্য ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। বাবাকে দেখেই সঞ্জয় শিশুর মতো তাঁর পায়ে পড়ে যান। বলেন, ‘বাবা, ভুল হয়ে গেছে আমার।’
ছেলের কথা শুনে সুনীল দত্তের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। রাকেশ পরে বলেন, কোনো বাবার জন্য এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া কতটা কঠিন, তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। সঞ্জয়ের গ্রেপ্তার, জামিন, আবার কারাগারে যাওয়া—দুই দশকের বেশি সময় ধরে মামলাটি তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ওপর ছায়া ফেলে রাখে।
প্রথম দফায় ১৮ মাস কারাগারে
১৯৯৩ সালে গ্রেপ্তারের পর বিচারাধীন বন্দী হিসেবে প্রায় ১৮ মাস কারাগারে ছিলেন সঞ্জয় দত্ত। ১৯৯৫ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান; কিন্তু মামলা চলতে থাকে।
সে সময় সঞ্জয়ের মুক্তিপ্রাপ্ত ‘খলনায়ক’ ছবির নাম ও বাস্তব জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকে। ছবিতে তিনি একজন পলাতক অপরাধীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পর্দার খলনায়ক আর বাস্তব জীবনের বিতর্ক তখন যেন একাকার হয়ে যায়।
২০০৭ সালে বিশেষ আদালত সঞ্জয়কে অস্ত্র আইনে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর সুপ্রিম কোর্ট থেকে তিনি অন্তর্বর্তী জামিন পান। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সাজা পাঁচ বছর নির্ধারণ করলে অবশিষ্ট দণ্ড ভোগ করতে তাঁকে আবার আত্মসমর্পণ করতে হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে আদালতে আত্মসমর্পণের পর সঞ্জয়কে পুনের ইয়েরওয়াড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
কয়েদি নম্বর ১৬৬৫৬
রুপালি পর্দায় সঞ্জয় ছিলেন কোটি মানুষের তারকা। কিন্তু ইয়েরওয়াড়া কারাগারে তাঁর পরিচয় ছিল ‘কয়েদি নম্বর ১৬৬৫৬’। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে একজন সাধারণ বন্দীর মতোই নির্ধারিত রুটিন অনুসরণ করতে হয়েছে বলে মহারাষ্ট্র সরকার আদালতে জানিয়েছিল। সরকার আরও দাবি করে, মুক্তি বা সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে তাঁকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তার কারণে সঞ্জয়কে অন্য বন্দীদের থেকে আলাদা একটি সেলে রাখা হয়েছিল। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁর দিন শুরু হতো। যে অভিনেতা চলচ্চিত্রের শুটিংয়েও সকালে পৌঁছানোর জন্য পরিচিত ছিলেন না, তাঁকেই কারাগারে প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হতো।
কারাগারে দিনের শুরু হতো বন্দীদের গণনা দিয়ে। এরপর প্রার্থনা, সকালের খাবার ও নির্ধারিত শ্রম। স্বাধীনভাবে কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কখন খাবেন, কখন কাজ করবেন, কখন বিশ্রাম নেবেন—সবই নির্ধারিত ছিল কারা কর্তৃপক্ষের নিয়মে।
পুরোনো সংবাদপত্র দিয়ে কাগজের ব্যাগ
কারাগারে বসে সঞ্জয়ের প্রধান কাজগুলোর একটি ছিল পুরোনো সংবাদপত্র দিয়ে কাগজের ব্যাগ তৈরি করা। একটি ব্যাগের জন্য তিনি ২০ থেকে ২৫ পয়সা করে পেতেন বলে পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।
প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত কাগজের ব্যাগ তৈরি করতেন সঞ্জয়। কখনো কাঠের চেয়ার ও অন্যান্য আসবাব তৈরির কাজও করেছেন। বন্দীদের দক্ষতার ভিত্তিতে কারাগারে মজুরি দেওয়া হতো।
সঞ্জয় পরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, প্রায় সাড়ে তিন বছর কাজ করে তাঁর হাতে জমেছিল মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি। কারাগার থেকে বেরিয়ে সেই অর্থ স্ত্রী মান্যতাকে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ওই ৫০০ রুপির মূল্য তাঁর কাছে হাজার কোটি রুপির চেয়েও বেশি ছিল। কারণ, সেটি ছিল কারাগারে নিজের শ্রমে উপার্জিত অর্থ।
কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, কাজ করে সঞ্জয়ের মোট আয় হয়েছিল প্রায় ৩৮ হাজার রুপি। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে তিনি অধিকাংশ অর্থ কারাগারের ক্যানটিনেই খরচ করেন। মুক্তির সময় তাঁর কাছে অবশিষ্ট ছিল প্রায় ৪৫০ রুপি। কারাগারে নিজের হাতে তৈরি কয়েকটি কাগজের ব্যাগও তিনি সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেগুলোকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারকগুলোর একটি মনে করতেন তিনি।
কারাগারের ভেতরে ‘রেডিও ওয়াইসিপি’
শুধু কাগজের ব্যাগ বা আসবাব তৈরি করেই সময় কাটাননি সঞ্জয়। ইয়েরওয়াড়া কারাগারের ভেতরে তিনি ‘রেডিও ওয়াইসিপি’ নামে একটি রেডিও অনুষ্ঠান চালুর সঙ্গে যুক্ত হন।
রেডিওটি শুধু কারাগারের ভেতরেই শোনা যেত। বন্দীদের জন্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, খবর, গান ও হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। তিন-চারজন বন্দী অনুষ্ঠানের চিত্রনাট্য লিখতেন। সঞ্জয় কখনো উপস্থাপনা করতেন, কখনো অভিনয় ও কৌতুক পরিবেশন করতেন।
এই কাজের জন্যও সঞ্জয় নির্ধারিত মজুরি পেতেন। রুপালি পর্দার একজন জনপ্রিয় অভিনেতা কারাগারের ছোট্ট একটি রেডিও অনুষ্ঠানের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।
সঞ্জয় পরে জানিয়েছেন, কারাগারে তিনি একটি নাট্যদলও গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ছিলেন সেই দলের পরিচালক। হত্যা মামলায় দণ্ডিত কয়েকজন বন্দী ছিলেন তাঁর অভিনেতা। কারাগারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতেন তিনি।
২০১৩ সালে ইয়েরওয়াড়া কারাগারের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন সঞ্জয়। বন্দীদের সঙ্গে মঞ্চে উঠে পরিবেশনা করেন তিনি। চলচ্চিত্রের তারকা পরিচয় থেকে দূরে কারাগারের বন্দীদের সঙ্গে তাঁর সেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
লিখেছিলেন কবিতা
কারাগারের নিঃসঙ্গ সময়ে লেখালেখিও করেছেন সঞ্জয় দত্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই সহবন্দীর সহায়তায় তিনি হিন্দিতে কয়েক শ কবিতা ও দ্বিপদী লিখেছিলেন। সেগুলো নিয়ে ‘সালাখেঁ’ নামে একটি বই প্রকাশের পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।
কারাগারের অভিজ্ঞতা, অপরাধবোধ, পরিবার থেকে দূরে থাকা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের উপলব্ধি—এসবই তাঁর লেখার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
বইটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত না হলেও লেখালেখি যে তাঁকে মানসিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল, সে কথা পরে জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা।
পরিবারের জন্য অপেক্ষা
কারাগারের কঠোর নিয়মের চেয়েও সঞ্জয়ের জন্য বেশি কষ্টের ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। স্ত্রী মান্যতা এবং যমজ সন্তান ইকরা ও শাহরানের বড় হয়ে ওঠার অনেক মুহূর্ত তিনি দেখতে পারেননি।
নির্ধারিত দিনে পরিবারের সদস্যরা সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। স্বল্প সময়ের সেই সাক্ষাৎ শেষ হওয়ার পর তাঁকে আবার সেলে ফিরে যেতে হতো। পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন, সন্তানদের কাছে পাওয়া কিংবা নিজের বাড়িতে ঘুমানোর মতো সাধারণ বিষয়গুলোই তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছিল।
কারাগারের দিনগুলো সঞ্জয়কে বুঝিয়েছিল, মানুষের কাছে স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান। মুক্তির পর তিনি বলেছিলেন, পাঁচ বছরের সাজা নয়, তাঁর কাছে মনে হয়েছিল ২৩ বছর পর তিনি মুক্ত হয়েছেন। কারণ, ১৯৯৩ সালে মামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই আইনি অনিশ্চয়তা তাঁর জীবনকে অনুসরণ করেছিল।
প্যারোল ও বিতর্ক
কারাবাসের সময়ে স্ত্রী মান্যতার অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে সঞ্জয় কয়েক দফা প্যারোল ও ফার্লো পেয়েছিলেন। এ নিয়ে ভারতে তীব্র বিতর্ক হয়। সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, একজন তারকা হওয়ার কারণেই কি তিনি অন্য বন্দীদের তুলনায় বেশি সুযোগ পাচ্ছেন?
পরে মহারাষ্ট্র সরকার জানায়, নিয়ম অনুসারেই সঞ্জয়কে ছুটি ও সাজা মওকুফ দেওয়া হয়েছিল। বোম্বে হাইকোর্টও সরকারি নথি পর্যালোচনা করে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাননি। তবে বন্দীদের প্যারোল ও ফার্লোর আবেদন নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।
ভালো আচরণের ভিত্তিতে সঞ্জয়ের সাজা থেকে ২৫৬ দিন বা ৮ মাস ১৬ দিন মওকুফ করা হয়েছিল বলে সরকার জানায়।
মুক্তির সকাল
২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইয়েরওয়াড়া কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান সঞ্জয় দত্ত। আগের রাতটি নীরবে কাটিয়েছিলেন তিনি। সকালে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন কারাগারের ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসেন, প্রথমে মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। এরপর ফিরে দাঁড়িয়ে কারাগারের দিকে স্যালুট জানান। বাইরে স্ত্রী মান্যতা, সন্তান ও ঘনিষ্ঠজনেরা অপেক্ষা করছিলেন।
কারাগার থেকে বেরিয়ে সঞ্জয় বলেছিলেন, স্বাধীনতার পথে হাঁটা সহজ নয়। এরপর তিনি মুম্বাইয়ে ফিরে সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরে যান। সেখান থেকে যান মা নার্গিসের সমাধিতে। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর দিনে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন তিনি।
সব মিলিয়ে বিচারাধীন বন্দী ও দণ্ডিত কয়েদি হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে সঞ্জয় কারাগারে ছিলেন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের শেষ দফায় ইয়েরওয়াড়া কারাগারে কাটান প্রায় ৪২ মাস।
কারাগার তাঁকে যা শিখিয়েছিল
মুক্তির পর সঞ্জয় দত্ত বলেন, কারাগারে বসে শুধু নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সেখান থেকে কিছু শেখার চেষ্টা করতে হয়।
কারাগারের জীবন সঞ্জয়কে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের মূল্য শিখিয়েছিল। কাগজের ব্যাগ তৈরি, কাঠের কাজ, রেডিও অনুষ্ঠান, নাট্যদল কিংবা লেখালেখি—প্রতিটি কাজের মধ্যেই তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় জানিয়েছেন, কারাবাস তাঁকে আধ্যাত্মিকতার দিকেও নিয়ে গিয়েছিল। প্রার্থনা ও আত্মসমালোচনা সেই কঠিন সময় কাটাতে তাঁকে সাহায্য করেছে।
সঞ্জয়ের ভাষায়, জীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে অনুশোচনায় ডুবে থাকার পরিবর্তে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
‘সঞ্জু’ নিয়ে সমালোচনা
সঞ্জয় দত্তের উত্থান-পতনের জীবন নিয়ে ২০১৮ সালে পরিচালক রাজকুমার হিরানি নির্মাণ করেন ‘সঞ্জু’। ছবিতে সঞ্জয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন রণবীর কাপুর। বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায় ছবিটি।
তবে ছবিটি নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, সঞ্জয় দত্তের মাদকাসক্তি, অস্ত্র মামলা এবং ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত তদন্তের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো ছবিতে অনেকটাই সহানুভূতিশীল ও হালকা করে দেখানো হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, চলচ্চিত্রটি সঞ্জয়ের ভুল ও দায়ের চেয়ে তাঁকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে নির্মাতাদের দাবি ছিল, ছবিটি কোনো আইনি মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নয়; বরং একজন মানুষের পতন, সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
বারবার ফিরে আসার নাম সঞ্জয় দত্ত
মুক্তির পর আবার অভিনয়ে ফেরেন সঞ্জয় দত্ত। শুরুতে তাঁর কয়েকটি ছবি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি; কিন্তু তিনি থামেননি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের পর্দার ব্যক্তিত্বকেও বদলেছেন।
‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এর অধীরা চরিত্রে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সামনে অন্য রূপে হাজির হন সঞ্জয়। ভারী বর্ম, ভয়ংকর চেহারা ও দৃঢ় উপস্থিতিতে ছবির নায়ক যশের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। এরপর হিন্দির পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় ছবিতে খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর চাহিদা আরও বেড়েছে।
সঞ্জয় দত্তের জীবন তাই শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকার সাফল্যের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্ত, তার পরিণতি, শাস্তি, অনুশোচনা এবং নতুন করে বাঁচার গল্প।
একসময় বাবার পায়ে পড়ে সঞ্জয় বলেছিলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে আমার।’ সেই ভুলের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও কারাবাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু কারাগারের ছোট্ট সেলে বসেও তিনি কাগজের ব্যাগ তৈরি করেছেন, রেডিও অনুষ্ঠান চালিয়েছেন, নাটকের দল গড়েছেন এবং কবিতা লিখেছেন।
আজ জন্মদিনে সঞ্জয় দত্তকে ঘিরে তাই শুধু ‘রকি’, ‘খলনায়ক’, ‘বাস্তব’ কিংবা ‘মুন্না ভাই’-এর স্মৃতিই ফিরে আসেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, দেখা গেছে কয়েদি নম্বর ১৬৬৫৬-এর গল্পও—অনেকে সেসব দিনের স্মৃতিচারণা করেছেন। সে সময়ের ছবি শেয়ার করেছেন।