বিয়ের পর হঠাৎ বদলে গেল সবকিছু
একসময় নিয়মিত অভিনয় করছিলেন। সিনেমায় প্রশংসিত হচ্ছিল তাঁর কাজ, টেলিভিশনেও তৈরি হয়েছিল পরিচিতি। কিন্তু বিয়ের পর হঠাৎই বদলে গেল সবকিছু। কাজ যেন একেবারে উধাও হয়ে গেল তাঁর জীবন থেকে। হাতে রইল না নতুন কোনো সিনেমা, না ধারাবাহিক। এমনকি একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়েছিল, অভিনয়জীবনে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, সব যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেছে।
এই অভিজ্ঞতার কথা সম্প্রতি আবারও বলেছেন অভিনেত্রী সোনি রাজদান। আশির দশকে বলিউডে অভিনয় শুরু করা সোনির ক্যারিয়ারে বিয়ের পরের সেই দীর্ঘ বিরতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় নয়; বরং সেই সময়ের চলচ্চিত্রশিল্পে নারী অভিনেত্রীদের ঘিরে থাকা সামাজিক ধারণারও প্রতিচ্ছবি।
১৯৮১ সালে ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক সোনির। এরপর ‘মান্ডি’, ‘সারাংশ’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। ‘সারাংশ’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। সিনেমার পাশাপাশি টেলিভিশনেও জনপ্রিয়তা পান। রমেশ সিপ্পির ‘বুনিয়াদ’ তাঁকে আরও পরিচিত করে তোলে।
তখন ক্যারিয়ার এগোচ্ছিল নিজের গতিতে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২০ এপ্রিল পরিচালক মহেশ ভাটকে বিয়ে করার পর বদলে যায় পরিস্থিতি।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে সোনি বলেন, বিয়ের সময় তিনি কাজ করছিলেন এবং সেই কাজ শেষও করেছিলেন। কিন্তু এরপর আর নতুন কোনো কাজ পাননি। তাঁর ভাষায়, সবকিছু যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, তাঁর কাছ থেকে সবকিছু চলে গেছে।
এর আগে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন সোনি। তাঁর দাবি, কোথাও কোথাও তাঁকে এমন প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল যে তিনি যেহেতু একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের স্ত্রী, তাই তাঁর আর কাজ করার প্রয়োজন কী। এই ধারণা তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছিল।
সোনির অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তখন একজন নারী অভিনেত্রীর বিয়েকে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর পেশাগত জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হতো। তিনি বিয়ের পরও অভিনয় করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চারপাশের দৃষ্টিভঙ্গি যেন তাঁর হয়ে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।
‘মহেশ ভাটের স্ত্রী’ পরিচয়ের আড়ালে অভিনেত্রী সোনি
বিয়ের পর সোনির সঙ্গে আরেকটি পরিচয় স্থায়ীভাবে জুড়ে যায়, তিনি পরিচালক মহেশ ভাটের স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে মেয়ের পরিচয়ও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়। অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের মা হিসেবে তাঁকে নতুন করে পরিচিত করতে শুরু করে গণমাধ্যম ও দর্শকের একটি অংশ।
কিন্তু সোনির নিজের আপত্তি ছিল এখানেই। কারণ, অভিনয়জীবনে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল আলিয়ার জন্মেরও অনেক আগে। নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতেই তিনি বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় নিয়ে কথা বলেছিলেন সোনি। জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে মূলত মহেশ ভাটের স্ত্রী হিসেবেই দেখা হয়েছে। ২০২৫ সালের আরেক সাক্ষাৎকারে আরও স্পষ্টভাবে তিনি বলেন, সারা জীবনই যেন তাঁকে ‘অন্য কারও কেউ’ হিসেবে দেখা হয়েছে। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই।
এই লড়াইয়ের জায়গাটিই সোনি রাজদানের ক্যারিয়ারকে আলাদা করে দেখার সুযোগ দেয়। কারণ, তিনি শুধু একজন পরিচালকের স্ত্রী বা একজন তারকা অভিনেত্রীর মা নন। তাঁর নিজের রয়েছে চার দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবন, প্রশংসিত বেশ কিছু চরিত্র এবং ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
‘বুনিয়াদ’ ফিরিয়ে দিয়েছিল কাজ
বিয়ের পরের কাজের খরা অবশ্য চিরস্থায়ী হয়নি। ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ‘বুনিয়াদ’ দিয়ে। রমেশ সিপ্পি ও জ্যোতি স্বরূপ পরিচালিত ধারাবাহিকটি ১৯৮৬ সালে দূরদর্শনে প্রচার শুরু হয়। দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ের গল্প নিয়ে তৈরি সিরিজটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
‘বুনিয়াদ’-এ সোনির অভিনয়ও দর্শকের নজর কাড়ে। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিকটি না এলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারত। ‘বুনিয়াদ’-এর পর আবার বেশ কিছু ভালো সিনেমায় কাজের সুযোগ পান তিনি।
অর্থাৎ যে সময়টিকে একসময় তিনি প্রায় ‘সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার’ সময় হিসেবে দেখেছিলেন, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ফিরে আসেন অভিনয়ে।
স্বামীর সিনেমাতেও মিলত না সহজ চরিত্র
মহেশ ভাটকে বিয়ে করার পর সোনির ক্যারিয়ার পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিল, বিষয়টি এমন নয়; বরং মহেশ ভাট নিজেই বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর অভিনয়ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে মহেশ ভাট সোনিকে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সোনির অভিনয়ের ধরন, শরীরী ভাষা ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি মূলধারার ভারতীয় সিনেমার প্রচলিত অভিনয়শৈলীর সঙ্গে সব সময় মেলে না। ফলে তাঁর প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার করার মতো চরিত্রও সব সময় পাওয়া যায়নি।
মজার বিষয়, মহেশ ভাটের সিনেমাতেও সোনি এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলোর পরিণতি ছিল বেশ করুণ। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে সোনি রসিকতা করে জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে এমন অনেক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিতেন, যেগুলো গল্পের মধ্যেই মারা যেত। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদেরও চোখে পড়েছিল।
‘রাজি’–তে মেয়ের মায়ের চরিত্রে
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর ২০১৮ সালের ‘রাজি’ সিনেমায় আবারও বড় পর্দায় আলোচনায় আসেন সোনি। সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন আলিয়া ভাটের মায়ের চরিত্রে। বাস্তব জীবনেও আলিয়া তাঁর মেয়ে হওয়ায় সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের আগ্রহ ছিল আরও বেশি।
তবে এখানেও তৈরি হয়েছিল একধরনের পরিচয়ের দ্বন্দ্ব। সোনির অভিনয় নিয়ে আলোচনা করার বদলে অনেক সময় তাঁকে শুধু ‘আলিয়া ভাটের মা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি যখন অভিনয়ে এসেছিলেন, তখন আলিয়ার জন্মই হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ‘ইয়োরস ট্রুলি’, ‘সংস অব প্যারাডাইস’-এর মতো কাজেও অভিনয় করেছেন সোনি। সিনেমার পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ ও চরিত্রনির্ভর বিভিন্ন কাজেও তাঁকে দেখা গেছে।
বদলে গেছে সময়
নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনাও করেছেন সোনি। তাঁর মতে, এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে তাঁর মেয়ে আলিয়া ভাটের প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব আগের মতো ক্যারিয়ার থামিয়ে দেওয়ার কারণ নয়।
চলতি বছর আরেকটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সময় বদলেছে দেখে তিনি খুশি। তাঁর মেয়ে এমন এক সময়ে কাজ করছেন, যখন একজন নারী একই সঙ্গে মা এবং সফল অভিনেত্রী হতে পারেন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে