ছেলের জন্মের খবর শুনে বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে অমিতাভ বচ্চন
১৯৭৬ সাল। বলিউডে তখন অমিতাভ বচ্চনের উত্থানের সময়। পর্দায় একের পর এক অ্যাকশন দৃশ্যে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ঠিক সেই সময়েই জীবনে আসে আরও বড় এক ঘটনা—অভিষেক বচ্চনের জন্ম। আর ছেলের জন্মের খবর যেন অমিতাভের মধ্যে বাড়তি এক সাহস জুগিয়েছিল। এমনকি সেই সময় শুটিং সেটে সত্যিকারের একটি বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের দৃশ্যেও অংশ নেন তিনি।
ঘটনাটি ‘খুন পসিনা’ সিনেমার শুটিংয়ের সময়কার। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের অ্যাকশন মাস্টার মোহন বাগ্গাদ জানিয়েছেন, সিনেমাটিতে অমিতাভের সঙ্গে বাঘের একটি দৃশ্য ছিল। আজকের দিনে এমন দৃশ্য কল্পনা করাই কঠিন। কিন্তু সত্তরের দশকে বলিউডের অ্যাকশন দৃশ্যে বাস্তব ঝুঁকি নেওয়া ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক।
মোহন বাগ্গাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘খুন পসিনা’র ওই দৃশ্যে অমিতাভের বদলে স্টান্টম্যানের কাজ করার কথা ছিল অন্য একজনের। কিন্তু তাঁর গায়ের রং অমিতাভের সঙ্গে মানানসই না হওয়ায় নির্মাতারা অন্য কাউকে খুঁজছিলেন। তখন অ্যাকশন পরিচালক বীরু দেবগনের দলের সদস্য মোহন বাগ্গাদকে প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বাঘের সঙ্গে কাজ করতে ভয় লাগছিল মোহন বাগ্গাদের। তবু রাজি হয়ে যান। কারণ, সেটি ছিল সাধারণ কোনো স্টান্ট নয়—ছিল সত্যিকারের বাঘকে ঘিরে দৃশ্য। সেই সময়ের অ্যাকশন দৃশ্য আর এখনকার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখন কম্পিউটার গ্রাফিকস, বিশেষায়িত নিরাপত্তাব্যবস্থা, স্টান্ট সমন্বয়কারী ও নানা ধরনের প্রযুক্তির সাহায্যে এমন দৃশ্য তৈরি করা হয়। কিন্তু সত্তরের দশকে অনেক ক্ষেত্রেই অভিনেতা ও স্টান্টম্যানদের বাস্তব ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হতো।
অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এমন অনেক দৃশ্যই পরে তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ভাবমূর্তির সঙ্গে মিশে যায়। ‘জঞ্জির’, ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’সহ একাধিক সিনেমায় তাঁর অ্যাকশননির্ভর চরিত্র তাঁকে হিন্দি সিনেমার অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করে। ‘খুন পসিনা’ও সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাগুলোর একটি।
তবে বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের ঘটনাটিকে আরও আবেগময় করে তুলেছিল সময়টা। কারণ, ওই সময় অমিতাভ শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না, সদ্য বাবা হয়েছেন তিনি। ১৯৭৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন অভিষেক। বাবা হওয়ার আনন্দ আর উত্তেজনার মধ্যেই অমিতাভকে শুটিংয়ে ফিরতে হয়েছিল।
মোহন বাগ্গাদের স্মৃতিচারণায় সেই আবহেরই প্রতিফলন পাওয়া যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অমিতাভ যেন নিজের ছেলের জন্মকে একধরনের শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। ‘আমার ঘরে একটি সিংহ জন্মেছে’—এমন ভাবনা তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল বলেই তিনি বাঘের মুখোমুখি হওয়ার মতো দৃশ্যেও পিছিয়ে যাননি—ঘটনাটিকে এমনভাবেই স্মরণ করেছেন তিনি।
অমিতাভের জীবনে অভিষেকের জন্ম যে বিশেষ একটি অধ্যায়, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। অমিতাভ ও জয়া বচ্চনের প্রথম সন্তান শ্বেতা বচ্চনের জন্মের কয়েক বছর পর তাঁদের পরিবারে আসেন অভিষেক। পরবর্তী সময়ে তিনিও অভিনয়ে আসেন এবং বাবার পথ অনুসরণ করে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
তবে ‘খুন পসিনা’র সেটের সেই বাঘের গল্প আজও আলাদা করে মনে রাখার মতো। কারণ, এটি শুধু একটি পুরোনো অ্যাকশন দৃশ্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিন্দি সিনেমার এমন একটি সময়, যখন পর্দায় বাস্তবতা দেখাতে গিয়ে তারকারা সত্যিই জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেন।
আর অমিতাভের ক্ষেত্রে ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে পিতৃত্বের আবেগও। ছেলের জন্মের আনন্দ নিয়ে শুটিংয়ে ফেরা এক তরুণ বাবা, সামনে সত্যিকারের বাঘ—তারপরও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কয়েক দশক পর সেই ঘটনা শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু বলিউডের সোনালি সময়ের অ্যাকশন ইতিহাসে এমন ঝুঁকিপূর্ণ গল্পের অভাব নেই।
সত্তরের দশকের সেই অমিতাভ আজ কিংবদন্তি। আর অভিষেকও এখন নিজেই বলিউডের পরিচিত অভিনেতা। বাবা-ছেলের এই দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার পেছনে তাই এমন অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে, যেগুলো সিনেমার পর্দায় কখনো দেখা যায়নি। ‘খুন পসিনা’র বাঘের গল্প তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে