সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি এখন জনপ্রিয় নায়িকা, ১২০ কোটি টাকার মালিক

কাজল আগরওয়াল। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রায় দুই দশক ধরে তেলেগু ও তামিল সিনেমার দর্শকদের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন তিনি। অনেক ব্লকবাস্টার, দক্ষিণ ভারতের প্রায় সব বড় তারকার সঙ্গে কাজ, কোটি কোটি ভক্ত আর বিলাসবহুল জীবন—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন রূপকথার গল্প। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা, ব্যর্থতা এবং নিজেকে বারবার প্রমাণ করার সংগ্রাম। আজ ১৯ জুন, কাজল আগরওয়ালের জন্মদিন। এই দিনে ফিরে দেখা যাক মুম্বাইয়ের এক সাধারণ মেয়ের দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হওয়ার গল্প।

মুম্বাইয়ের মেয়ে থেকে স্বপ্নের পথে
১৯৮৫ সালের ১৯ জুন ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন কাজল আগরওয়াল। তাঁর পরিবার মূলত পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত। বাবা বিনয় আগরওয়াল ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা সুমন আগরওয়াল ছিলেন একজন কনফেকশনারি উদ্যোক্তা। পরিবারের পরিবেশ ছিল আধুনিক ও শিক্ষাবান্ধব। মুম্বাইয়ের সেন্ট অ্যানস হাইস্কুলে পড়াশোনা শেষে তিনি জয় হিন্দ কলেজ এবং পরে কে সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল ফ্যাশন ও মিডিয়ার প্রতি। অনেকেই ভাবতেন, তিনি হয়তো বিজ্ঞাপন বা মার্কেটিং জগতে ক্যারিয়ার গড়বেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে।
তখন বলিউডে নতুন মুখের ভিড়। প্রতিদিন শত শত তরুণ-তরুণী অডিশন দিচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশই হারিয়ে যাচ্ছেন কয়েক বছরের মধ্যে। কাজলও ছিলেন সেই অসংখ্য স্বপ্নবাজের একজন।

বলিউডে ছোট্ট শুরু
২০০৪ সালে হিন্দি ছবি ‘কিউ! হো গায়া না...’-এর মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক ঘটে কাজলের। ছবির প্রধান চরিত্রে ছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই ও বিবেক ওবেরয়। কাজলের ভূমিকা ছিল খুবই ছোট। দর্শকদের অধিকাংশই তাঁকে খেয়াল করেননি। অনেকের জন্য এমন অভিষেক হতাশার কারণ হতে পারত। কিন্তু কাজল বুঝেছিলেন, বড় সুযোগ এক দিনে আসে না। ছোট পদক্ষেপ থেকেই শুরু করতে হয়।

তবে বলিউড তখন কাজলের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বড় ব্যানারের ছবিতে সুযোগ মিলছিল না। নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার রাস্তা কঠিন হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই তাঁর জীবনে আসে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা।

কাজল আগরওয়াল
ইনস্টাগ্রাম

দক্ষিণে নতুন সূচনা
২০০৪ সালেই তেলেগু ছবি ‘লক্ষ্মী কল্যাণম’-এ অভিনয়ের সুযোগ পান কাজল। ভাষা জানতেন না, সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন, কাজের ধরনও আলাদা। কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা হননি তিনি।

প্রথম দিকে দক্ষিণে কাজ করা সহজ ছিল না। শুটিং সেটে ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেক সময় অন্যদের সাহায্য নিতে হতো। সংলাপ মুখস্থ করতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হতো। এমনও হয়েছে, একটি দৃশ্য ঠিকভাবে দিতে দিনের পর দিন অনুশীলন করেছেন।

তবে ধীরে ধীরে কাজল বুঝতে পারেন, দক্ষিণি চলচ্চিত্রশিল্পে প্রতিভার মূল্যায়ন হয়। এখানে বাইরের রাজ্যের অভিনেত্রী হয়েও নিজের জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
২০০৭ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দামামা’। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। প্রথমবারের মতো দর্শক ও নির্মাতারা কাজলকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করেন।

যে ছবি বদলে দিল সবকিছু
প্রত্যেক তারকার জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্ট থাকে। কাজল আগরওয়ালের ক্ষেত্রে সেই ছবির নাম ‘মাগাধীরা’। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি পরিচালনা করেন এস এস রাজামৌলি। নায়ক ছিলেন রামচরণ। পুনর্জন্মের কাহিনি নিয়ে নির্মিত ছবিটি মুক্তির পর দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন যুগের সূচনা করে।

ছবিতে রাজকুমারী মিত্রাবিন্দার চরিত্রে কাজলের অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। তাঁর সৌন্দর্য, পর্দায় উপস্থিতি এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা নতুনভাবে আলোচনায় আসে।
‘মাগাধীরা’ শুধু একটি হিট ছবি ছিল না, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। ছবিটি বহু বছরের বক্স অফিস রেকর্ড ভেঙে দেয়। রাতারাতি কাজল দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন অভিনেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

‘মাগাধীরা’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

একের পর এক সুপারহিট
‘মাগাধীরা’র পর শুরু হয় কাজলের সোনালি অধ্যায়। তিনি অভিনয় করেন ‘ডার্লিং’, ‘মিস্টার পারফেক্ট’, ‘বৃন্দাবনম’, ‘বিজনেসম্যান’, ‘বাদশাহ’, ‘টেম্পার’, ‘কয়েদি নম্বর ১৫০’, ‘সরদার গাব্বার সিং’, ‘জিলা’, ‘থুপ্পাক্কি’, ‘মার্সাল’সহ অসংখ্য আলোচিত ছবিতে। দক্ষিণ ভারতের প্রায় সব বড় তারকার বিপরীতে তাঁকে দেখা গেছে।

প্রভাসের সঙ্গে কাজলের জুটি ছিল দর্শকদের অন্যতম পছন্দের। ‘ডার্লিং’ ও ‘মিস্টার পারফেক্ট’ আজও ভক্তদের কাছে জনপ্রিয়। মহেশ বাবুর সঙ্গে ‘বিজনেসম্যান’ ছবিতে তাঁর রসায়ন প্রশংসিত হয়। জুনিয়র এনটিআরের সঙ্গে ‘বৃন্দাবনম’ ও ‘বাদশাহ’ তাঁকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তামিল সিনেমায় বিজয়ের সঙ্গে তাঁর জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘থুপ্পাক্কি’ ও ‘মার্সাল’—দুটি ছবিই বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়।

বলিউডে প্রত্যাবর্তন
দক্ষিণে তারকাখ্যাতি অর্জনের পর কাজল আবার বলিউডে ফেরেন। ২০১১ সালে মুক্তি পায় ‘সিংহাম’। ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন অজয় দেবগন। রোহিত শেঠি পরিচালিত ছবিটি বক্স অফিসে ঝড় তোলে। ভারতজুড়ে দর্শকরা প্রথমবারের মতো কাজল আগরওয়ালকে বড় পরিসরে চিনতে শুরু করেন।
পরে ‘স্পেশাল ২৬’ ছবিতেও অভিনয় করেন কাজল। তবে বলিউডে নিয়মিত ক্যারিয়ার গড়ার পরিবর্তে দক্ষিণি চলচ্চিত্রেই বেশি মনোযোগ দেন।
অনেকের মতে, এটি ছিল কাজলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ, দক্ষিণে তিনি ছিলেন প্রধান নায়িকা আর বলিউডে তাঁকে নতুন করে প্রতিযোগিতায় নামতে হতো।

কাজল আগরওয়াল
ইনস্টাগ্রাম

সাফল্যের আড়ালের সংগ্রাম
বাইরে থেকে দেখলে কাজলের ক্যারিয়ারকে নিখুঁত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না।

দীর্ঘ সময় কাজলকে ‘গ্ল্যামারাস নায়িকা’ তকমা নিয়ে সমালোচনা শুনতে হয়েছে। অনেক সমালোচক বলতেন, তিনি শুধু বাণিজ্যিক ছবির জন্য উপযুক্ত।
কাজল এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন কাজের মাধ্যমে। তিনি ধীরে ধীরে অভিনয়ের পরিধি বাড়িয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে তিনি শুধু সুন্দর মুখ নন, দক্ষ অভিনেত্রীও।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিযোগিতা। দক্ষিণি চলচ্চিত্রে একই সময়ে ছিলেন সামান্থা, নয়নতারা, আনুশকা শেঠি, তামান্না ভাটিয়ার মতো শক্তিশালী তারকারা। এত প্রতিযোগিতার মধ্যেও টানা এক দশকের বেশি সময় প্রথম সারিতে থাকা সহজ কাজ নয়।

কাজল আগরওয়াল
ইনস্টাগ্রাম থেকে

ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায়
কাজল বরাবরই ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনার বাইরে রাখতে পছন্দ করেছেন। ২০২০ সালে তিনি বিয়ে করেন ব্যবসায়ী গৌতম কিচলুকে। করোনা মহামারির সময় সীমিত আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেই বিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে। ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দেন প্রিয় তারকাকে। ২০২২ সালে তাঁদের সংসারে আসে পুত্রসন্তান নীল কিচলু।
মা হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, কাজল হয়তো অভিনয় থেকে দূরে সরে যাবেন। কিন্তু তিনি দ্রুত কাজে ফিরে আসেন। একই সঙ্গে মাতৃত্ব ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন।

আরও পড়ুন

সম্পদের পরিমাণ
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অভিনয়, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন কাজল আগরওয়াল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৮–১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৯৫–১২০ কোটি টাকার সমান।

মুম্বাইয়ে কাজলের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া একাধিক দামি গাড়ি, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকেও নিয়মিত আয় করেন তিনি।
তবে সহকর্মীরা বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে কাজল আশ্চর্য রকমের সাধারণ। আড়ম্বরের চেয়ে পরিবার ও কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

ইন্ডিয়া টুডে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে