যৌন সম্পর্কের পর খুন, সিরিয়াল কিলার হয়ে চমকে দিলেন মামুট্টি

‘কালামকাভাল’–এ মামুট্টি। আইএমডিবি

বয়স ৭৪ বছর, সিনেমা করেছেন চার শতাধিক, তবু প্রতিবারই তাঁকে আবিষ্কার করতে হয় নতুনভাবে। এই বয়সে দক্ষিণি সিনেমার তারকা মামুট্টি করলেন ‘নারী লোভী’ এক ক্রমিক খুনির (সিরিয়াল কিলার) চরিত্র! তা-ও আবার সেই সিনেমার প্রযোজকও তিনি। মামুট্টি ছবির নায়ক নন, খলনায়ক। অভিনয়, অভিব্যক্তি আর নিজের নায়কোচিত উপস্থিতি দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন নতুন অনেকেই আসতে পারেন, কিন্তু মামুট্টি এখনো আছেন আগের মতোই। তাই জিতিনকে জোশের অ্যাকশন থ্রিলার ‘কালামকাভাল: দ্য ভেনম বিনিথ’ হয়ে উঠল উপভোগ্য এক সিনেমা। অভিষিক্ত এই নির্মাতা জিষ্ণু শ্রীকুমারের সঙ্গে সিনেমাটির চিত্রনাট্যও লিখেছেন।

একনজরে
সিনেমা: ‘কালামকাভাল’
ধরন: থ্রিলার
পরিচালনা: জিতিন কে জোসে
অভিনয়: মামুট্টি, ভিনায়াকান
স্ট্রিমিং: সনি লিভ
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিট

ছবির প্রথম ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ মিনিটের একটি অংশ আছে, যাকে অনায়াসেই বলা যায় গত বছরের মালয়ালম সিনেমার সবচেয়ে পরিশীলিত দৃশ্যধারা। একে ঠিক দৃশ্য না মন্তাজ—কোনো সংজ্ঞায় ফেলা কঠিন। এখানে চিত্রনাট্য আর সম্পাদনার মাঝের সীমারেখা এতটাই অদৃশ্য যে সিনেমা কীভাবে কাজ করে—তা যেন চোখের সামনেই ভেঙে নতুন করে গড়ে ওঠে। এই অংশে ধরা পড়ে এক নিষ্ঠুর সিরিয়াল কিলারের কার্যপ্রণালি। তার শিকারদের সংখ্যা এত বেশি যে তা একটি ছোট গ্রামের জনসংখ্যাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।

এই হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রে রয়েছে স্ট্যানলি—মামুট্টির অভিনীত চরিত্র। এক শিকার থেকে আরেক শিকারে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছদ্মনাম বদলে যায়, গির্জা রূপ নেয় মন্দিরে, আর এক নারীর ট্র্যাজেডি আরেক নারীর গল্পের সঙ্গে অদলবদল হয়ে যায়। সবকিছুই ঘটে একই টাইমলাইনের ভেতর, একই অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ছায়ায়। স্ট্যানলি ভুয়া নম্বর ব্যবহার করে তামিলনাড়ু ও কেরালার অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করেন। এরপর হোটেল বা লজে যৌন সম্পর্ক করেন, এরপরেই সেই নারীকে অভিনব সব উপায়ে খুন করেন।

‘কালামকাভাল’–এর পোস্টার থেকে

পরিচালক ছবিটিকে ভাগ করেছেন কয়েকটি অধ্যায়ে—স্ট্যানলি দাসের জীবনের অধ্যায় হিসেবে। পুলিশ কর্মকর্তা নাথ বা জয়কৃষ্ণনের (ভিনায়কান) তদন্ত যত এগোয়, স্ট্যানলির দুঃসাহসও তত বাড়তে থাকে। গল্পের বড় একটি অংশ কেরালা-তামিলনাড়ু সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠে। দুই রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে শিকার ধরার এই যাত্রায় দুই চরিত্রের দ্বৈত সত্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক মুহূর্তে আমরা দেখি এক গৃহস্থ মানুষকে, পরক্ষণেই তার ভেতর জেগে ওঠে এক নির্মম খুনি। আবার ঠিক পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে পরবর্তী চালের পরিকল্পনা করে।

বাইরে থেকে সে এক সুখী গৃহস্থ, অথচ একই সঙ্গে সে নির্বিচারে পরকীয়ায় জড়ানো এক নির্মম সিরিয়াল কিলার, যে কেবল হত্যার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়। তার এক প্রেমিকা দীপাকে (শ্রুতি রামাচন্দ্রন) শ্বাস রোধ করে হত্যার মুহূর্তে সে বলে, ‘ঝুঁকি যত বেশি, তৃপ্তিও তত বেশি।’ স্ট্যানলি খুনের জন্য বেছে নেয় বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বিয়ের উপযুক্ত বয়সী নারীদের।

‘কালামকাভাল’ শুধু থ্রিলার নয়, এটি একই সঙ্গে একটি চরিত্র-অধ্যয়নও। একদিকে এটি স্ট্যানলি ও তদন্তকারী জয়কৃষ্ণনের (ভিনায়াকান) মধ্যে বুদ্ধির লড়াই, অন্যদিকে দুই প্রায় সমজাতীয় মানসিকতার মানুষের প্রতিচ্ছবি।

সিরিয়াল কিলার ঘরানার বহু পরিচিত কাঠামো ব্যবহার করলেও ‘কালামকাভাল’ আলাদা হয়ে ওঠে দৃশ্য থেকে দৃশ্যে যাওয়ার অনবদ্য সাবলীলতায় আর পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে। একটি ফোনকল থেকে কেমন করে দৃশ্য কেটে আবার সেই ফোনকলেই ফিরে আসা হয়—এমন সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তই ছবিটিকে ব্যতিক্রমী করে তোলে। ফরেনসিক কর্মকর্তার কাছ থেকে স্ট্যানলি যখন নতুন এক শিকার ধরার কৌশল জানতে পারে, তখন টাইমলাইন ও চরিত্র বদলের ভেতর দিয়ে দর্শক ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে, এই একটি মুহূর্ত তৈরি করতে কতগুলো সিনেমাটিক উপাদান নিখুঁতভাবে একসঙ্গে কাজ করেছে।

আরও পড়ুন

এই নিখুঁততা সম্ভব হয়েছে, কারণ চিত্রনাট্য একেবারে শুরু থেকেই বীজ বপন করে রাখে। পুরোনো তামিল ছবির গান সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তে বাজতে থাকে, সিগারেটেরও এখানে একটি চরিত্রগত যাত্রা আছে। এমনকি সিগারেটের ধোঁয়ার রিং এখানে অন্য অনেক ছবির সুপারস্টার ক্যামিওর চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

ভিনায়াকান নিঃসন্দেহে ছবির চালিকা শক্তি। এত জটিল একটি কাঠামোকে তিনি দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন। কিন্তু এত বছরের অভিনয়জীবনের পরেও মামুট্টি এখানে এমন এক রূপে ধরা দেন, যা আগে দেখা যায়নি। এক দৃশ্যে নতুন অস্ত্রের কথা শুনে তার চোখে কৌতূহল থেকে ধীরে ধীরে যে বিকৃত হাসি ফুটে ওঠে, তা ভোলার মতো নয়। এই ছবিতে তিনি এক নির্মম খুনি—তবু সেই নিষ্ঠুরতার মধ্যেই আছে একধরনের শৌখিন ভিলেনি আকর্ষণ। এমন একটি চরিত্র, যাকে ঘৃণা করার কথা, কিন্তু অজান্তেই দর্শক আরও বেশি করে মামুট্টিকে ভালোবেসে ফেলে।

‘কালামকাভাল’ শুধু থ্রিলার নয়, এটি একই সঙ্গে একটি চরিত্র-অধ্যয়নও। একদিকে এটি স্ট্যানলি ও তদন্তকারী জয়কৃষ্ণনের (ভিনায়াকান) মধ্যে বুদ্ধির লড়াই, অন্যদিকে দুই প্রায় সমজাতীয় মানসিকতার মানুষের প্রতিচ্ছবি। গল্প আমাদের বিশ্বাস করায়, এত ভয়ংকর একজন অপরাধীকে ধরতে হলে তদন্তকারীকেও তারই মতো একরকম হতে হয়। তাই সাপের মতো শিকারকে পেঁচিয়ে ধরা কিংবা প্যাঁচা হয়ে রাতের পর রাত অপেক্ষা করার রূপকগুলো শুধু রহস্য বাড়ানোর জন্য নয়; বরং এই দুই চরিত্রের মানসিক গঠনের মিল বোঝানোর জন্যই ব্যবহৃত।

‘কালামকাভাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এই ছবির আরেকটি বড় শক্তি হলো—এটি সিরিয়াল কিলারের মানসিকতা ব্যাখ্যা করতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে না। এখানে খুনির প্রতি সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা নেই। শৈশবের ট্রমা দেখানোর বহুল চর্চিত ব্যাপারও নেই; বরং তদন্তকারী কর্মকর্তা জয়কৃষ্ণনের শৈশবের গল্প শুনতে শুনতেই আমরা চোখ বুলিয়ে নিই স্ট্যানলির পুরোনো বাড়ি, তার শৈশবের ছবিগুলো—যেগুলো নীরবেই বলে দেয়, কীভাবে সে আজকের স্ট্যানলি হয়ে উঠেছে।

মুজিব মাজিদের সংগীত আর ফয়সাল আলীর চিত্রগ্রহণ ছবিটিকে প্রায় দমবন্ধ করা অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। সস্তা লজ, গাড়ির ভেতরের দৃশ্য—সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের গোলকধাঁধা তৈরি হয়, যেখান থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই। কাগজ পোড়ার শব্দের মতো অস্বস্তিকর সাউন্ড ডিজাইন প্রতিটি নতুন শিকারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অর্থ তৈরি করে। এমনকি পুরোনো মেরুন রঙের একটি হোন্ডা অ্যাকর্ড গাড়িও দর্শকের মনে অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

ভিনায়াকান নিঃসন্দেহে ছবির চালিকা শক্তি। এত জটিল একটি কাঠামোকে তিনি দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন। কিন্তু এত বছরের অভিনয়জীবনের পরেও মামুট্টি এখানে এমন এক রূপে ধরা দেন, যা আগে দেখা যায়নি। এক দৃশ্যে নতুন অস্ত্রের কথা শুনে তার চোখে কৌতূহল থেকে ধীরে ধীরে যে বিকৃত হাসি ফুটে ওঠে, তা ভোলার মতো নয়। এই ছবিতে তিনি এক নির্মম খুনি—তবু সেই নিষ্ঠুরতার মধ্যেই আছে একধরনের শৌখিন ভিলেনি আকর্ষণ। এমন একটি চরিত্র, যাকে ঘৃণা করার কথা, কিন্তু অজান্তেই দর্শক আরও বেশি করে মামুট্টিকে ভালোবেসে ফেলে।

‘কালামকাভাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

তবে ‘কালামকাভাল’ পুরোপুরি ‘পারফেক্ট’ নয়। ছন্দের জায়গায় এসে  কিছুটা হোঁচট খায়। প্রথম এক ঘণ্টা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগোলেও চিত্রনাট্য ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। রাজনৈতিক চালচিত্র, সমাজের নীরবতা আর ব্যক্তিগত অপরাধবোধ—এমন নানা বিষয় উঠে আসে, কিন্তু সব কটি সমান গুরুত্ব পায় না। কিছু দৃশ্য আবহ তৈরি করলেও গল্প এগোয় খুব সামান্য, ফলে সেই জায়গায় গতি কমে যায়, যেখানে আসলে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন ছিল।

তবে অনেক কারণেই ‘কালামকাভাল’ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। নির্মাতা যদি ছবির শুরুতেই হাতের প্রায় সব তাস খুলে দেন, তাহলে দর্শকের সামনে আর কীই-বা অপেক্ষা করে? দেখতে বসে দর্শককে কোনো মুহূর্তেই এই প্রশ্নে ভুগতে হয় না—খুনি কে। কারণ, এটি এমন এক পুলিশি তদন্ত থ্রিলার, যেখানে সিরিয়াল কিলারের পরিচয় শুরু থেকেই দর্শকের স্পষ্ট, শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছেই তা অজানা। তারপরও দুর্দান্ত চিত্রনাট্য, দক্ষ পরিচালনা আর অভিনয় গুণেই  ‘কালামকাভাল’ বুঝিয়ে দেয় মালয়ালম সিনেমা এখনো থ্রিলার ঘরানায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে সক্ষম।