নায়িকাদের অশালীনভাবে উপস্থাপন, তামান্নার মন্তব্য নিয়ে নতুন বিতর্ক
রামচরণের বহুল আলোচিত ছবি ‘পেড্ডি’ মুক্তির পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন জাহ্নবী কাপুর। ছবিতে তাঁর অভিনীত ‘আচিয়াম্মা’ চরিত্রটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেক দর্শকের অভিযোগ ছিল, চরিত্রটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং গল্পে তাঁকে অশালীনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দর্শকদের এই প্রতিক্রিয়ার পর ছবি মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই নির্মাতারা দুঃখ প্রকাশ করেন। এবার ছবিটি থেকে বাদ পড়ছে কিছু বিতর্কিত দৃশ্য। এই বিতর্কে নতুন অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়ার মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
‘প্রশংসাসূচক নয়’; বরং ‘পিতৃতান্ত্রিক’
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম পরিচিত মুখ তামান্না ভাটিয়া। হিন্দি, তামিল ও তেলেগু—তিন শিল্পেই সমান স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছেন তিনি। কখনো বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা, কখনো অভিনয়নির্ভর চরিত্র, আবার কখনো আলোচিত নাচের গানের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তামান্না এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, যা শুধু তাঁর ক্যারিয়ারের নয়; বরং গোটা দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের দীর্ঘদিনের এক বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষায়, দক্ষিণি সিনেমায় নারী তারকাদের যে দৃষ্টিতে দেখা হয়, তা অনেক সময় ‘প্রশংসাসূচক নয়’; বরং ‘পিতৃতান্ত্রিক’। এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—নারী অভিনেত্রীরা কি এখনো মূলত পুরুষ দর্শকের বিনোদনের উপকরণ হিসেবেই বিবেচিত হন? নাকি সময় বদলেছে, কিন্তু ক্যামেরার ভাষা বদলায়নি?
নাচের গান নিয়ে তামান্নার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
বলিউডে ‘আইটেম গান’ শব্দটি বহুদিন ধরেই বিতর্কিত। অনেক অভিনেত্রীই এই শব্দ ব্যবহারে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তামান্নাও তাঁদের একজন। ফোর্বস ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি কখনো এসব গানকে ‘আইটেম সং’ হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে এগুলো মূলত ‘পার্টি সং’।
তামান্নার যুক্তি সহজ। অনেক সময় একটি সিনেমা দর্শকের মনে না থাকলেও সেই সিনেমার গান বছরের পর বছর জনপ্রিয় থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন কারিনা কাপুর খান ও ক্যাটরিনা কাইফের কথা।
‘ছাম্মাক ছাল্লো’, ‘শীলা কি জওয়ানি’ কিংবা ‘কামলি’—এই গানগুলো এখনো বিয়ে, পার্টি কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাজে। তামান্নার মতে, এসব গানে অভিনেত্রীরা দেবীর মতো উপস্থিতি তৈরি করেছেন। সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী হয়ে উঠেছে তাঁদের পারফরম্যান্স।
‘আমি ঘুম থেকে উঠেই গ্ল্যামারাস অনুভব করতে চাই’
অনেক অভিনেত্রী গ্ল্যামারকে পেশাগত প্রয়োজন হিসেবে দেখেন। তামান্না সেটিকে নিজের ব্যক্তিত্বের অংশ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, গ্ল্যামার তাঁর কাছে ক্যামেরার সামনে তৈরি করা কোনো চরিত্র নয়; বরং এটি তাঁর স্বভাবের অংশ।
এই বক্তব্য অনেকের কাছে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের পটভূমিতে এর তাৎপর্য আছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে নারী তারকাদের ক্ষেত্রে একটি দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করেছে।
একদিকে দর্শক তারকাদের গ্ল্যামার দেখতে চান, অন্যদিকে সেই গ্ল্যামারের জন্যই সমালোচনাও করেন। তামান্নার বক্তব্য সেই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধেই যেন একধরনের অবস্থান।
দক্ষিণি সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গি
তবে সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল দক্ষিণি সিনেমা নিয়ে তামান্নার মন্তব্য।
তামান্না বলেন, দক্ষিণ ভারতে কাজ শুরু করার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেন অনেক মানুষ এই শিল্পকে ‘একধরনের নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির’ জন্য সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, সেখানে এমন একটি ‘পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ রয়েছে, যা সব সময় নারীদের জন্য ইতিবাচক নয়। সিনেমায় ‘পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ একটি বহুল আলোচিত ধারণা। ব্রিটিশ চলচ্চিত্র গবেষক লরা মুলভে ১৯৭৫ সালে এই তত্ত্ব জনপ্রিয় করেন।
এ ধারণা অনুযায়ী, অনেক চলচ্চিত্রে ক্যামেরা এমনভাবে নারীদের উপস্থাপন করে, যেন তাঁরা মূলত পুরুষ দর্শকের দেখার জন্যই পর্দায় উপস্থিত। নারীর চরিত্র, চিন্তা বা অনুভূতির চেয়ে তাঁর শরীর ও সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তামান্নার মন্তব্য মূলত সেই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
দক্ষিণি সিনেমার নায়িকাদের চিরাচরিত সংকট
ভারতীয় মূলধারার দক্ষিণি সিনেমায় বহু বছর ধরে নায়িকাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নায়ক গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি লড়াই করেন, প্রতিশোধ নেন, সমাজ বদলান। আর নায়িকার কাজ অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে প্রেমে পড়া, গান গাওয়া বা নায়কের প্রশংসা করার মধ্যে। অবশ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি একই রকম নেই।
গত এক দশকে নয়নতারা, সাই পল্লবী, কীর্তি সুরেশ বা আনুশা শেঠির মতো অভিনেত্রীরা নারীকেন্দ্রিক সিনেমার মাধ্যমে এই ধারা বদলানোর চেষ্টা করেছেন। তবু বাণিজ্যিক ছবিতে পুরোনো ফর্মুলা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
বলিউড কি সত্যিই আলাদা
তামান্না মনে করেন, হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্প অন্তত অভিনেত্রীদের সামনে বিকল্প পথ খুলে দেয়।
কেউ চাইলে অভিনয়নির্ভর চরিত্র করতে পারেন, আবার কেউ চাইলে গ্ল্যামারাস বাণিজ্যিক ছবির তারকা হতে পারেন। আর যাঁরা দুটি ক্ষেত্রেই সফল হন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন প্রকৃত সুপারস্টার।
বলিউডেও যে নারীর বস্তুগত উপস্থাপন নেই, তা নয়। কিন্তু গত দুই দশকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।
বিদ্যা বালান, আলিয়া ভাট, কঙ্গনা রনৌত বা তাপসী পান্নুর মতো অভিনেত্রীরা প্রমাণ করেছেন যে নারীকে কেন্দ্র করেও বড় ছবি তৈরি করা সম্ভব।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে