কলকাতা নিয়ে পঙ্কজের আলাদা আবেগ
গীতিনাট্য ‘লা-ইলাজ’ দিয়ে ১৫ বছর পর মঞ্চে ফিরেছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠি। মুম্বাই, দিল্লির পর কলকাতাতেও প্রশংসিত হয়েছে তাঁর ও স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠীর প্রযোজিত এই নাটক। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের এক রেস্তোরাঁয় নাটক, পরিবার, অভিনয় ও জীবনদর্শন নিয়ে দেবারতি ভট্টাচার্য-র সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
আলাপের শুরুতেই উঠে আসে ‘লা-ইলাজ’-এর কথা। পঙ্কজ ত্রিপাঠি জানালেন, তাঁর স্ত্রীর হাত ধরেই এই উদ্যোগের সূত্রপাত, ‘মৃদুলাই প্রথম বলেছিল, আমাদের ব্যানারের তলায় একটা নাটক করা উচিত। থিয়েটার আমাদের জীবনে এত কিছু দিয়েছে, তাই আমরাও যদি থিয়েটারকে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারি, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। থিয়েটারের বিশাল বাগানে আমরা শুধু এক ফোঁটা জল ঢালার চেষ্টা করেছি।’
‘মির্জাপুর’–এর ‘কালিন ভাইয়া’ জানালেন, নাটকটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের বড় অংশই ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’র প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের অনেকেই মুম্বাইয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করার জন্য সংগ্রাম করছেন। ‘আমরা চেয়েছিলাম, এই প্ল্যাটফর্মটা তাঁদের কাজে লাগুক। থিয়েটারের মাধ্যমে যদি শিল্পীরা পারিশ্রমিক পান, তাহলে তাঁদের লড়াইটা কিছুটা সহজ হবে,’ বলেন অভিনেতা।
কলকাতার দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় মুগ্ধ অভিনেতা, ‘এখানকার দর্শক সত্যিই খুব সমৃদ্ধ। শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁদের জ্ঞান, ব্যাপ্তি, উৎসাহ অনেক বেশি। আমরা চেয়েছিলাম তাঁদের আলাদা একটা অভিজ্ঞতা দিতে, আর মানুষের ভালোবাসা পেয়ে মনে হয়েছে, আমরা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছি।’
নাটকের পুরো দায়িত্বই যে স্ত্রী মৃদুলা সামলেছেন, সেটাও হেসে স্বীকার করেন পঙ্কজ, ‘ম্যামই সব সিদ্ধান্ত নেন। আমি শুধু সৃজনশীল দিকটা দেখি। ও বাড়ি থেকে রান্না করে ৩০ জনের জন্য খাবার পাঠায়। নাটকের দলের সবাই এখন আমাদের পরিবারের সদস্য।’ শুধু তা–ই নয়, দলের একজন সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাঁর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও করেছিলেন তাঁরা। পঙ্কজের কথায়, ‘শিল্পের কাজই হলো মানুষকে আরও মানবিক করে তোলা।
‘লা-ইলাজ’ নাটকের মাধ্যমেই অভিনয়ে পা রেখেছেন পঙ্কজ-মৃদুলার মেয়ে আশি ত্রিপাঠী। তবে ‘পঙ্কজ ত্রিপাঠীর মেয়ে’ পরিচয়ের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে অভিনেতার জবাব, ‘না, সে নিজেই নিজের পথ তৈরি করবে।’ মেয়েকে পুরো স্বাধীনতা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ‘অভিনয় করবে না ফিল্মমেকিং করবে না লেখালেখি—সবটাই ওর সিদ্ধান্ত,’ বলেন তিনি।
কলকাতা নিয়ে পঙ্কজের আলাদা আবেগ রয়েছে, ‘কলকাতা মানেই আমার কাছে শ্বশুরবাড়ি। এখানকার খাবার, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানুষ—সবই খুব ভালো লাগে।’ কলকাতায় ভবানীপুরের কাছে তাঁদের একটি ফ্ল্যাটও হয়েছে। ‘আগে হোটেল বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে হতো। এখন দুর্গাপূজার সময় নিজেদের বাড়িতে থাকব, ঘুরব, ঠাকুর দেখব,’ জানান অভিনেতা। এবার কলকাতায় পা রেখেই মাছের পাতুরি খেয়েছেন বলে মজা করে বলেন তিনি।
ফয়েজ মোহাম্মদ খান পরিচালিত গীতিনাট্য ‘লা-ইলাজ’-এ পঙ্কজকে ক্যামিও চরিত্রে দেখা গেছে। স্বল্প উপস্থিতিতেই দর্শকের মন জয় করেছেন তিনি। ১৫ বছর পর মঞ্চে ফেরার অভিজ্ঞতা নিয়ে পঙ্কজ বলেন, ‘এই নাটকটা করার পর আমার লোভ আরও বেড়ে গেছে। এখন ইচ্ছা করছে একটা ফুল লেংথ নাটক করি, যেখানে দেড় ঘণ্টা আমিই পারফর্ম করব।’ তাঁর কাছে থিয়েটার শুধুই অভিনয়ের জায়গা নয়, জীবনের শিক্ষাও। ‘থিয়েটার আমার ভিত্তি। এটা আমাকে শুধু অভিনেতা নয়, একজন ভালো মানুষও বানিয়েছে,’ বলেন তিনি। যদিও এই দীর্ঘ সময়ে থিয়েটারকে খুব একটা মিস করেননি বলেও জানান অভিনেতা, ‘সিনেমা আর ওটিটি নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে মিস করার সুযোগ আসেনি। তবে নিজে মঞ্চে অভিনয় না করলেও আমি নিয়মিত নাটকের দর্শক।’
বাংলা সিনেমায় কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন পঙ্কজ। ‘বাংলা বুঝি, কিন্তু বলতে পারি না। যদি হিন্দিভাষী কোনো চরিত্রের প্রস্তাব আসে, তাহলে অবশ্যই করতে চাই।’ নিজের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’ ও ‘নিউটন’-এর নাম। তবে তাঁর কথায়, ‘“নিউটন” আমাকে শুধু পরিচিতিই দেয়নি, একজন ভালো অভিনেতা হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে।’ এ রকম আরও ছবির মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের যাত্রাকে সমৃদ্ধ করতে চান পঙ্কজ।