দুবার বিয়ে–বিচ্ছেদ থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা, কোথায় হারিয়ে গেলেন চার্মিলা
একসময় মালয়ালম সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন চার্মিলা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন তিনি। তামিল পরিবারে জন্ম হলেও মালয়ালম চলচ্চিত্রই তাঁকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। কিন্তু কর্মজীবনের সাফল্যের সমান্তরালে ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক ঝড় বয়ে যায়। প্রেম, বিচ্ছেদ, ব্যর্থ দাম্পত্য, আত্মহত্যার চেষ্টা এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগ—সব মিলিয়ে চার্মিলার জীবন যেন সিনেমার চেয়েও নাটকীয়।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উঠে এসেছে কীভাবে চার্মিলা নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রেমই আমার জীবন নষ্ট করেছে।’
শিশুশিল্পী থেকে জনপ্রিয় তারকা
শিশুশিল্পী হিসেবে ১৯৭৯ সালে তামিল ছবি ‘নাল্লাথোরু কুদুম্বম’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন চার্মিলা। পরে ১৯৯১ সালে ‘ওয়িলাট্টাম’ ছবির মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একই বছর মালয়ালম সুপারস্টার মোহনলালের বিপরীতে ‘ধানম’ ও ‘আঙ্কেল বান’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। দুটি ছবিই তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
এরপর নির্মাতা ভারতনের ‘কেলি’ ছবিতে জয়ারামের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। একই সময়ে তামিল ও তেলুগু চলচ্চিত্রেও নিয়মিত কাজ করছিলেন।
বাবু অ্যান্টনির প্রেমে
১৯৯৪ সালে ‘কাদাল’ ছবির শুটিংয়ের সময় অভিনেতা বাবু অ্যান্টনির সঙ্গে চার্মিলার পরিচয়। পরে ‘রাজধানী’, ‘কাম্বোলাম’সহ একাধিক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মোট ছয়টি ছবিতে জুটি বেঁধেছিলেন তাঁরা।
চার্মিলার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার বছর তাঁদের সম্পর্ক ছিল এবং একসময় তাঁরা প্রায় একসঙ্গে থাকতেন। তবে তাঁর বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি। কারণ, হিসেবে তিনি বলেছিলেন, বাবু তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন এবং বাবাকে কেউ বাবু সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক তথ্য জানিয়েছিল।
এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে চার্মিলা বলেন, বাবু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। তবু তিনি কখনো বাবুকে খারাপ মানুষ মনে করেননি। বরং বাবুই ছিলেন তাঁর প্রথম প্রেম। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর মা তাঁকে রক্ষা করেন।
আরেক সাক্ষাৎকারে চার্মিলা স্মরণ করেন, শুটিংয়ের সময় তাঁর জন্য বাবু অ্যান্টনির ছোট ছোট যত্নশীল আচরণ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। একবার হোটেলের গিজার নষ্ট হয়ে গেলে বাবু নিজের কক্ষ থেকে গরম পানি এনে দিয়েছিলেন। আরেকবার গাড়ি না আসায় নিজের গাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর বাবা বাধা দেন। চার্মিলার মতে, বাবার কঠোর আচরণই তাঁকে আরও বেশি বাবুর দিকে টেনে নিয়েছিল।
তিনি পরে আক্ষেপ করে বলেন, বাবা যদি কঠোরতার বদলে ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতেন, তাহলে হয়তো তাঁর জীবন অন্য রকম হতে পারত।
বাবু অ্যান্টনির ভিন্ন দাবি
তবে চার্মিলার বক্তব্যের সঙ্গে বাবু অ্যান্টনির বক্তব্যের মিল নেই। একটি সাক্ষাৎকারে বাবু বলেন, তিনি কখনো কোনো অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন না। তাঁর দাবি, তিনি একজন কলেজছাত্রীর প্রেমে পড়েছিলেন এবং পরে তাঁকেই বিয়ে করেন। অনেক অভিনেত্রী তাঁর সঙ্গে প্রেমের দাবি করেছেন, কিন্তু সেসব বিষয়ে তাঁর কিছুই জানা নেই।
অন্যদিকে চিত্রনাট্যকার কালুর ডেনিস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, চার্মিলা ও বাবু অ্যান্টনির প্রেমের বিষয়টি চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই জানতেন। তিনি নিজেও চার্মিলাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর চার্মিলা ভয়াবহ মানসিক সংকটে পড়ে যান।
গোপন বিয়ে, ক্যারিয়ার বিসর্জন
বাবুর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর চার্মিলার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক কিশোর সত্যর সঙ্গে। দুজন গোপনে বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সম্পর্কও সুখের হয়নি।
চার্মিলার দাবি, বিয়ের পর কিশোর তাঁকে চলচ্চিত্রে অভিনয় ছেড়ে দিতে বলেন। তখন তিনি ক্যারিয়ারের শীর্ষে ছিলেন। এমনকি বিক্রম অভিনীত ‘সেতু’ ছবির প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল, স্বামী তা পছন্দ করবেন না।
পরে কিশোর চাকরির জন্য মধ্যপ্রাচ্যে চলে যান। দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার পর একসময় তিনি চার্মিলাকে জানান, এই সম্পর্ক আর চালিয়ে যেতে চান না। চার্মিলার অভিযোগ, জনপ্রিয়তার কারণেই কিশোর তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। পরে পারস্পরিক সম্মতিতে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।
দ্বিতীয় বিয়েও টিকল না
এরপর সফটওয়্যার প্রকৌশলী রাজেশকে বিয়ে করেন চার্মিলা। রাজেশ তাঁর চেয়ে আট বছরের ছোট ছিলেন। তাঁদের একটি ছেলে রয়েছে।
কিন্তু ধর্মীয় মতপার্থক্য এই সম্পর্কেও সমস্যা তৈরি করে। চার্মিলার ভাষ্য, রাজেশ চাইতেন তাঁদের ছেলে হিন্দু ধর্ম অনুসরণ করুক। কিন্তু চার্মিলা চাইতেন সন্তান খ্রিষ্টধর্মেই বড় হোক। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবে সন্তানের কারণে এখনো তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে।
পরে নিজের জীবন নিয়ে আত্মসমালোচনা করে চার্মিলা বলেন, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি প্রেমে জড়িয়েছেন, কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেননি।
হেমা কমিটির পর বিস্ফোরক অভিযোগ
২০২৪ সালে বিচারপতি হেমা কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর চার্মিলা মালয়ালম চলচ্চিত্রজগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ক্যারিয়ারের একপর্যায়ে অন্তত ২৮ জন তাঁর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছিলেন।
চার্মিলার অভিযোগ, এক প্রযোজক তাঁর বন্ধুদের নিয়ে তাঁকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেছিলেন। চার্মিলার দাবি, সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে এবং অভিনেতা বিষ্ণুকে একটি ছবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এখন কোথায় চার্মিলা?
একসময় দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ হলেও এখন আর নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করেন না চার্মিলা। মাঝেমধ্যে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের কিছু কাজ করতে দেখা যায় তাঁকে। তবে তাঁর অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনের উত্থান-পতনের গল্পই আজও আলোচনায় ফিরে আসে বারবার।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে