রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন, ‘লিলিপুট’কে তাড়িয়ে দিয়েছিল বলিউড
কম উচ্চতার কারণে ‘বামন’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রেমে পড়েও থেমে গিয়েছিলেন নিজেকে ‘অযোগ্য’ ভেবে—এম এম ফারুকী ওরফে লিলিপুটের সংগ্রামের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়।
হিন্দি সিনেমা বরাবরই শারীরিক ভিন্নতাকে দেখেছে করুণার চোখে, কখনো কখনো করেছে হাস্যরসের উপকরণ। ১৯৮০–এর দশকের বলিউড ছিল আরও নির্মম। সেই সময়েই গয়ার এক যুবক স্বপ্ন নিয়ে পা রেখেছিলেন বম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই)—নাম এম এম ফারুকী, যিনি পরে পরিচিত হন লিলিপুট নামে। মুম্বাইয়ে বহুদিন খোলা আকাশের নিচে কাটিয়েছেন, না খেয়ে দিন পার করেছেন, ছিল না মাথার ওপর ছাদ, ছিল না পরার মতো দ্বিতীয় একটি জামাও।
সম্প্রতি রেড এফএম পডকাস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিলিপুট জানান তাঁর জীবনের শুরুর সেই কষ্টের গল্প। গয়ায় থিয়েটার করতেন, শহরে তাঁকেই বলা হতো ‘সেরা অভিনেতা’। এক বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি বম্বে যান। একবার গেলে পুরো শহর কাঁপিয়ে দেবেন।’ কিন্তু দরিদ্র পরিবার থেকে আসা লিলিপুটের পক্ষে বম্বে যাওয়া তো স্বপ্নের মতোই।
ফারুকী বলেন, ‘আমাদের এত অভাব ছিল, শহরের ভেতর রিকশায় চড়ার টাকাও থাকত না। বম্বে যাওয়া তো দূরের কথা।’ তখনই এক বন্ধু, যিনি তাঁকে দ্বিতীয় মেহমুদ বানাতে চাইতেন, হাতে তুলে দেন ১৫০ রুপি—স্বপ্নের শহরে যাওয়ার ভাড়াটা। ‘কোথায় থাকব, কী খাব, এসব কিছুই ভাবিনি। পরিবারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য পাইনি,’ বলেন ফারুকী। তবে পরিবার কখনো তাঁকে অস্বীকার করেনি, যদিও সমাজ তাঁকে বারবার অপমানিত করেছে।
‘আমার বাড়ির লোকজন আমার উচ্চতা নিয়ে কষ্ট পেতেন ঠিকই, কিন্তু কখনো আমাকে উপেক্ষা করেননি। সমাজ অবশ্য ততটা দয়া দেখায়নি,’ বলেন লিলিপুট।
মুম্বাইয়ের বাস্তবতা ছিল আরও কঠিন। ‘খিদেয় কাতর হয়ে থাকতাম, রাস্তায় ঘুমাতাম,’ স্মৃতিচারণা করেন ফারুকী। তখন তাঁর একটাই জামা ছিল। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে একবার পাবলিক টয়লেটে গিয়ে গোসল করতাম, সেখানেই জামা ধুয়ে আবার ভেজা অবস্থায় গায়ে দিতাম। রোদে শুকাত সেগুলো, আমার শরীরেই।’
প্রথমে পৃথ্বী থিয়েটারে কিছু কাজ পেতে শুরু করেন, কিন্তু রুটিরুজির জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। এ সময়টায় ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, যারা তাঁকে অপমান করত পরোক্ষভাবে বা সরাসরি। ফারুকী বলেন, ‘বাসু চ্যাটার্জির এক সহকারী আমাকে সোজাসাপটা বলেছিলেন, সিনেমায় আপনি চলবেন না। আপনি ভালো অভিনেতা, কিন্তু কেউ আপনাকে সিনেমায় কাজ দেবে না। হিরোর ভাইয়ের চরিত্র, এমনকি পার্শ্বচরিত্রেও আপনাকে দেখা যাবে না।’
এই কথাগুলো খুব কষ্ট দিয়েছিল ফারুকীকে, ‘আমি তখন রাস্তায় ঘুমাচ্ছিলাম, কিন্তু আশা ছাড়িনি।’
সমাজেরও অন্য রকম নির্দয়তা দেখেছেন ফারুকী। গয়ার এক মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু ছোটবেলায় পা মচকে যাওয়ার কারণে শারীরিক গড়নে ভিন্ন ছিলেন, তাই নিজেই ভাবতেন, সে তাঁকে গ্রহণ করবে না। ফারুকী বলেন, ‘মেয়েটি খুব সুন্দর ছিল। আমি ভেবেছিলাম, আমার এমন অবস্থায় কেউ ভালোবাসবে না। সমাজ তো আগেই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’
চিকিৎসার মাধ্যমে উচ্চতা বেড়ে যাবে, এই বিশ্বাস ছিল লিলিপুটের। কিন্তু অপারেশনের আগে চিকিৎসক জানিয়ে দেন, ‘পা ঠিক হবে ঠিকই, কিন্তু উচ্চতা বাড়বে না।’ কথাটা হাসপাতালেই শুনে ফেলেছিলেন তিনি। লিলিপুট বলেন, ‘সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিই, আমি আর ভালোবাসব না। তখনই নিজেকে থামিয়ে দিই। কিন্তু সেই কষ্ট থেকে গেছে।’
আজকের ফারুকী ভারতের টেলিভিশন–দুনিয়ার এক পরিচিত মুখ। ‘জবান সাম্ভালকে’, ‘ওহ’ কিংবা ‘দেখ ভাই দেখ’–এর মতো জনপ্রিয় শোতে অভিনয় ও লেখালেখি করেছেন তিনি। সম্প্রতি তাঁকে দেখা গেছে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘মির্জাপুর’–এ।
ছোট আকারের শরীর নিয়ে সমাজ যাঁকে তুচ্ছ করেছিল, সেই মানুষ আজ কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন—শুধু প্রতিভা, অধ্যবসায় আর অদম্য সাহস দিয়ে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস