সুপারস্টার হয়েও সব ছেড়েছিলেন, আশ্রমে মালি হয়েছিলেন এই অভিনেতা
একসময় তাঁর চেহারা আর ব্যক্তিত্বের সামনে পর্দার অন্য তারকারাও ম্লান হয়ে যেতেন। খলনায়ক হিসেবে শুরু করে হয়ে উঠেছিলেন নায়ক, তারপর সত্তরের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় সুপারস্টার। ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’, ‘কুরবানি’, ‘দ্য বার্নিং ট্রেন’—একের পর এক সফল সিনেমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিনোদ খান্না।
শুরুর দিকে ‘মস্তানা’, ‘সচ্চা ঝুঠা’, ‘আন মিলো সাজনা’, ‘পুরব অউর পশ্চিম’ ও ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এর মতো সিনেমায় নেতিবাচক বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন বিনোদ। কিন্তু তাঁর চেহারা, কণ্ঠস্বর ও পর্দার উপস্থিতি দ্রুত দর্শকের নজর কাড়ে। বিশেষ করে ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এ ডাকাত জব্বর চরিত্রটি বিনোদকে আলাদা করে পরিচিত করে। একই সময়ে গুলজারের ‘মেরে আপনে’ তাঁকে নায়কোচিত চরিত্রের দিকে এগিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে ‘আচানক’-এ তাঁর অভিনয়ও ব্যাপক প্রশংসা পায়।
অর্থাৎ যে অভিনেতা একসময় নায়কের বিপরীতে দাঁড়াতেন, তিনিই ধীরে ধীরে দর্শকের প্রিয় নায়ক হয়ে উঠলেন।
কিন্তু ঠিক যখন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়, তখনই হঠাৎ সব ছেড়ে চলে গেলেন আধ্যাত্মিকতার পথে। ওশো রজনীশের শিষ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রমে কাটালেন প্রায় পাঁচ বছর। সেখানে তারকার পরিচয় ভুলে কাজ করেছেন মালি হিসেবে, থালাবাসন পরিষ্কার করেছেন। সেই সিদ্ধান্তে ভেঙে গিয়েছিল তাঁর প্রথম সংসারও।
তবু সেখানেই গল্প শেষ নয়। ফিরে এসে আবার সিনেমায় নিজের জায়গা তৈরি করেন বিনোদ। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রীও হন। ২০১৭ সালে ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুর পরও তাই তাঁর জীবন বলিউডের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী তারকাযাত্রার একটি হয়ে আছে। আজ তাঁর ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক সেই অবিশ্বাস্য জীবন।
পেশোয়ার থেকে মুম্বাই
১৯৪৬ সালের ৬ অক্টোবর অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারে জন্ম বিনোদ খান্নার। দেশভাগের পর পরিবার চলে আসে ভারতে। পরে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে কাটে তাঁর বেড়ে ওঠার সময়। পড়াশোনা করেন মুম্বাইয়ের সিডেনহাম কলেজে।
অভিনয়ে আসার পরিকল্পনা অবশ্য পরিবারের ছিল না। ব্যবসায়ী বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিক। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি আকর্ষণ ছিল বিনোদের। বোর্ডিং স্কুলে থাকার সময় ‘মুঘল-এ-আজম’ দেখার পর চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
১৯৬৮ সালে সুনীল দত্তর ‘মন কা মিত’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। নায়ক হিসেবে নয়, শুরুটা হয়েছিল পার্শ্বচরিত্র ও খলনায়ক হিসেবে।
ওশোর আশ্রমে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিনোদের ব্যক্তিগত জীবনেও। ১৯৭১ সালে বিয়ে করেছিলেন গীতাঞ্জলি খান্নাকে। তাঁদের দুই সন্তান—রাহুল ও অক্ষয় খান্না। বিনোদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৯০ সালে কবিতা দফতরিকে বিয়ে করেন বিনোদ। তাঁদের দুই সন্তান—সাক্ষী ও শ্রদ্ধা। বিনোদের ছেলে অক্ষয় খান্না পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, ছোটবেলায় বাবার সেই সিদ্ধান্ত বোঝা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। বড় হওয়ার পর তিনি বুঝতে চেষ্টা করেছেন, কী এমন ঘটেছিল যে তাঁর বাবা সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
খলনায়ক থেকে নায়ক
শুরুর দিকে ‘মস্তানা’, ‘সচ্চা ঝুঠা’, ‘আন মিলো সাজনা’, ‘পুরব অউর পশ্চিম’ ও ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এর মতো সিনেমায় নেতিবাচক বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন বিনোদ। কিন্তু তাঁর চেহারা, কণ্ঠস্বর ও পর্দার উপস্থিতি দ্রুত দর্শকের নজর কাড়ে।
বিশেষ করে ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এ ডাকাত জব্বর চরিত্রটি বিনোদকে আলাদা করে পরিচিত করে। একই সময়ে গুলজারের ‘মেরে আপনে’ তাঁকে নায়কোচিত চরিত্রের দিকে এগিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে ‘আচানক’-এ তাঁর অভিনয়ও ব্যাপক প্রশংসা পায়।
অর্থাৎ যে অভিনেতা একসময় নায়কের বিপরীতে দাঁড়াতেন, তিনিই ধীরে ধীরে দর্শকের প্রিয় নায়ক হয়ে উঠলেন।
অমিতাভের সঙ্গে টক্কর
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এসে বিনোদ খান্না শুধু জনপ্রিয় নন, বড় তারকা। ‘হেরা ফেরি’, ‘আমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘পারভারিশ’, ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’—একাধিক সিনেমায় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি।
দুজনের পর্দার রসায়নও ছিল আলাদা আকর্ষণের। ‘আমর আকবর অ্যান্টনি’-তে অমরের চরিত্রে বিনোদ ছিলেন সংযত ও দৃঢ়, আর অমিতাভের অ্যান্টনি ছিল বেশি হাস্যরসাত্মক। ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’-এও দুই তারকার বন্ধুত্ব দর্শকের মনে দাগ কাটে।
তখনকার সংবাদমাধ্যমে এমন কথাও উঠেছিল—বিনোদ খান্না অমিতাভ বচ্চনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। ১৯৮০ সালের ‘কুরবানি’ বিনোদের জনপ্রিয়তাকে আরও ওপরে নিয়ে যায়।
জনপ্রিয়তার শিখরে, হঠাৎ সব ছেড়ে দিলেন
এখানেই বিনোদ খান্নার জীবনের সবচেয়ে অবাক করা মোড়। ১৯৭৫ সালে ওশো রজনীশের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়। পরে আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। নিজের এক সাক্ষাৎকারে বিনোদ বলেছিলেন, অর্থ, খ্যাতি ও তারকাজীবন পাওয়ার পরও তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত—এরপর কী?
১৯৮২ সালে, ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায়, তিনি সিনেমা ছেড়ে ওশোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের রজনীশপুরমে চলে যান। সেখানে তিনি কোনো তারকার মতো জীবন কাটাননি; বরং আশ্রমে বাগানের কাজ করতেন, থালাবাসন পরিষ্কার করতেন। ওশোর ব্যক্তিগত বাগানের মালি হিসেবেও কাজ করেছিলেন।
বিনোদকে দেওয়া হয়েছিল ‘স্বামী বিনোদ ভারতী’ নাম। আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাগানের পরিচর্যার কাজকেও তিনি ধ্যান ও সাধনার অংশ হিসেবে দেখতেন।
কেন এমন সিদ্ধান্ত
বছরের পর বছর ওশোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কেউ মনে করতেন, তারকাজীবনের প্রতি তাঁর অনীহা তৈরি হয়েছিল। আবার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যে এসেছে ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকটের কথাও।
২০২৬ সালে বিনোদের দ্বিতীয় স্ত্রী কবিতা খান্না জানান, পরিবারের একাধিক মৃত্যুর পর বিনোদের জীবনে আধ্যাত্মিকতার টান আরও গভীর হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের মৃত্যুর পর বিনোদ ওশোর কাছে গিয়ে সন্ন্যাস নেন। অন্যদিকে ওশোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মা আনন্দ শীলার পুরোনো স্মৃতিচারণায় বিনোদের দাম্পত্য সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
তবে বিনোদ নিজে তাঁর সিদ্ধান্তকে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নিজের মনকে বুঝতে এবং ধ্যানের গভীরে যেতে তাঁর মনে হয়েছিল, আশ্রমে গিয়ে পুরো সময় দেওয়া প্রয়োজন।
তারকার সিদ্ধান্তে ভেঙে গেল সংসার
ওশোর আশ্রমে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিনোদের ব্যক্তিগত জীবনেও। ১৯৭১ সালে বিয়ে করেছিলেন গীতাঞ্জলি খান্নাকে। তাঁদের দুই সন্তান—রাহুল ও অক্ষয় খান্না।
বিনোদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৯০ সালে কবিতা দফতরিকে বিয়ে করেন বিনোদ। তাঁদের দুই সন্তান—সাক্ষী ও শ্রদ্ধা।
বিনোদের ছেলে অক্ষয় খান্না পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, ছোটবেলায় বাবার সেই সিদ্ধান্ত বোঝা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। বড় হওয়ার পর তিনি বুঝতে চেষ্টা করেছেন, কী এমন ঘটেছিল যে তাঁর বাবা সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পাঁচ বছর পর পর্দায়
রজনীশপুরমের পতনের পর ভারতে ফিরে আসেন বিনোদ। ১৯৮৭ সালে ‘ইনসাফ’ ও ‘সত্যমেব জয়তে’ দিয়ে অভিনয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। আশ্চর্যের বিষয়, এত দীর্ঘ বিরতির পরও দর্শক তাঁকে ভুলে যায়নি।
এরপর ‘দয়াবান’, ‘চাঁদনি’, ‘লেকিন’সহ বেশ কিছু সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নায়ক থেকে ধীরে ধীরে চরিত্রাভিনেতার দিকে এগিয়ে যান। ‘ওয়ান্টেড’, ‘দাবাং’, ‘দাবাং ২’ এবং ‘দিলওয়ালে’র মতো সিনেমায় নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও পরিচিত থাকেন।
প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে বিনোদের অভিনীত সিনেমার সংখ্যা ১৪০-এর বেশি। ১৯৯৯ সালে পান ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। মৃত্যুর পর ২০১৮ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
রাজনীতির মঞ্চে
অভিনয় থেকে সরে গিয়ে জীবনের আরেক অধ্যায়ও শুরু করেছিলেন বিনোদ খান্না। ১৯৯৭ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবের গুরদাসপুর থেকে জয়ী হন। পরে একাধিকবার ওই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
২০০২ সালে বিনোদ ভারতের সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী হন। একই বছর তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ যে মানুষটি একসময় পর্দায় পুলিশের পোশাক পরে অভিনয় করতেন, তিনিই পরে বাস্তবের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সামলেছেন।
শেষ অধ্যায়
২০১৫ সালে ‘দিলওয়ালে’ সিনেমায় শেষবার বড় পর্দায় দেখা যায় তাঁকে। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল মুম্বাইয়ে ৭০ বছর বয়সে মারা যান বিনোদ খান্না।
বলিউডে অনেক তারকা এসেছেন, কিন্তু ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ে স্বেচ্ছায় সেই আলো থেকে সরে গিয়ে আবার ফিরে এসে নিজের জায়গা তৈরি করার মতো গল্প খুব বেশি নেই। বিনোদ খান্না সেই বিরল তারকাদের একজন।
হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে