তামিল সিনেমার পরিচালকদের ‘হিমালয়’ ভারতীরাজা মারা গেছেন
তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা ভারতীরাজা মারা গেছেন। বয়সজনিত জটিলতায় আজ বুধবার (১০ জুন) চেন্নাইয়ের নিজ বাসভবনে তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তাঁর মৃত্যুতে এমন এক নির্মাতার অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো, যিনি তামিল সিনেমার গল্প বলার ভাষা বদলে দিয়েছিলেন। অনেকের মতে, তামিল সিনেমার ইতিহাসকে ‘ভারতীরাজার আগে’ ও ‘ভারতীরাজার পরে’—এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
‘ইয়াক্কুনার ইমায়াম’ (পরিচালকদের হিমালয়) নামে পরিচিত ভারতীরাজার ১৯৭৭ সালে ‘১৬ ভায়াথিনিলে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালনায় অভিষেক হয়। কমল হাসান ও শ্রীদেবী অভিনীত ছবিটিতে খল চরিত্রে ছিলেন রজনীকান্ত। মুক্তির পর এটি ব্যাপক ব্যবসাসফল হয় এবং আজও তামিল সিনেমার অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।
ভারতীরাজার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তামিল গ্রামের জীবনকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তাঁর আগে অধিকাংশ তামিল চলচ্চিত্রের শুটিং হতো স্টুডিও সেটে, আর গ্রাম ছিল কেবল গল্পের পটভূমি। কিন্তু ভারতীরাজা গ্রাম, সেখানকার মানুষ, তাদের সম্পর্ক, সংস্কৃতি, আনন্দ-বেদনা ও সামাজিক বাস্তবতাকে জীবন্ত চরিত্রে পরিণত করেন। ‘কিঝাক্কে পোগুম রেল’, ‘পুধিয়া ভারপুগাল’, ‘আলাইগাল ওইভাথিল্লাই’, ‘মান ভাসানাই’ ও ‘করুথাম্মা’সহ তাঁর বহু চলচ্চিত্র এই ধারার সাক্ষ্য বহন করে।
ভারতীরাজা গ্রামের মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্রে বৃষ্টি, মাঠ, নদী, মাটির গন্ধ, বাতাস, সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত কেবল দৃশ্য নয়, গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রকৃতিকে আবেগ প্রকাশের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে তিনি তামিল সিনেমায় নতুন ধারা শুরু করেন।
প্রেম ছিল ভারতীরাজার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বিষয়। তবে তাঁর প্রেমের গল্পগুলো ছিল সামাজিক বিধিনিষেধ, ধর্মীয় বিভাজন ও জাতপাতের বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষময়। ‘মুধাল মারিয়াধাই’-এ এক বিবাহিত গ্রামপ্রধান ও নিম্নবর্ণের এক নারীর সম্পর্ক, ‘আলাইগাল ওইভাথিল্লাই’-এ হিন্দু তরুণ ও খ্রিষ্টান তরুণীর প্রেম কিংবা ‘বেধাম পুধিথু’-তে ভিন্ন জাতের দুই তরুণ-তরুণীর সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।
নতুন প্রতিভা আবিষ্কারেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাধিকা, রাধা, আম্বিকা ও রেবতীর মতো অভিনেত্রীদের তিনি চলচ্চিত্রে পরিচিত করে তোলেন। নারী চরিত্রগুলোকে শক্তিশালী ও স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপনের জন্যও তিনি প্রশংসিত। একই সঙ্গে শিবাজি গণেশন ও কমল হাসানের মতো প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদেরও নতুনভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
পরিচালনা থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর অভিনয়ে মনোযোগ দেন ভারতীরাজা। ‘পান্ডাভার ভূমি’, ‘আয়ুধা এঝুথু’ এবং ধানুশ অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘তিরুচিত্রম্বলাম’-এ তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। পর্দার সামনে কিংবা পেছনে—দুই জায়গাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন।
ভারতীরাজা ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন।
এনডিটিভি অবলম্বনে