৩৬ বছর ধরে একই উদ্যমে কাজ করার রহস্য
‘ওয়েলকাম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় ছবি ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ দিয়ে দীর্ঘ সময় পর একসঙ্গে পর্দায় এসেছেন অক্ষয় কুমার ও রাভিনা ট্যান্ডন। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু কথা বলেছেন অক্ষয় কুমার।
আড্ডার শুরুতে উঠে আসে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ ছবির একটি ভোজপুরি গানের কথা। এই গানে ভোজপুরি অভিনেত্রী অক্ষরা সিংয়ের সঙ্গে তাঁর দারুণ রসায়ন ধরা পড়েছে। ভোজপুরি অভিনেতাদের বলিউডে আগে সে রকম গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এ প্রসঙ্গে অক্ষয় বলেন, ‘আমি কখনোই কোনো অভিনেতাকে ছোট করে দেখিনি, আর তা সমর্থনও করি না। অভিনেতা মানেই অভিনেতা, তিনি ভোজপুরি, হিন্দি বা গুজরাটি—যে ভাষার সিনেমাতেই কাজ করুন না কেন। আমাদের ছবিতে একটি সংলাপও আছে, “ভোজপুরি হলিউডের চেয়েও ভালো।” আমি সত্যিই এটা বিশ্বাস করি বলেই সংলাপটি বলেছি। ভোজপুরি গানের শুটিং করতে আমার দারুণ লেগেছিল। ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও এক দিনেই গানটির শুটিং শেষ করেছি।’
বর্তমান প্রজন্মের তারকারা তারকাবহুল ছবিতে অভিনয় করতে অনীহা দেখান। কোথাও কী তাঁরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন, এমন প্রশ্নে অক্ষয়ের জবাব, ‘এটা নিরাপত্তাহীনতার বিষয় নয়। প্রত্যেকের নিজের মতো ভাবনা থাকে। কেউ মনে করেন তাঁর সিদ্ধান্তই ঠিক, আমরাও মনে করি আমরা যা করছি, তা ঠিক। আমার মতে, সব ধরনের ছবিতেই কাজ করা উচিত। তবে কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই যে তারকাবহুলই চলবে, কিংবা একক নায়কনির্ভর ছবিই সফল হবে। কোনো ছবিরই নিশ্চিত হিট হওয়ার ফর্মুলা নেই।’
সাম্প্রতিক সময়ে বক্স অফিসে ছবির ব্যর্থতার প্রসঙ্গে অক্ষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাজেটকে। তাঁর ভাষায়, ‘ছবি নির্মাণে বাজেটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় নির্মাতারা বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। যশ চোপড়ার সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বাজেট হিট তো ছবি হিট।” যদি ছবির বাজেট ঠিক থাকে, তাহলে ছবি নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেবে। পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারের ভুল হতে পারে, কিন্তু সঠিক বাজেট অনেক ক্ষতি সামলে দিতে পারে। আমার ছবিগুলো সব সময় নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই তৈরি হয়। আমি নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, আমার কারণে যেন প্রযোজকের কোনো ক্ষতি না হয়।’
অভিনেতাদেরও প্রযোজকদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন, মনে করেন অক্ষয়। তিনি বলেন, ‘প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতার মধ্যে বোঝাপড়া থাকা খুব জরুরি। এই ছবির জন্য আমি প্রযোজকের কাছ থেকে এক টাকাও পারিশ্রমিক নিইনি। আমি শুধু একজন বিনিয়োগকারী ছিলাম। ছবিতে অনেক শিল্পী থাকা সত্ত্বেও ১১৫ কোটি রুপির বাজেটের মধ্যেই কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিদিন ২৪ জন অভিনেতা একসঙ্গে শুটিং করলেও সবাই সহযোগিতা করায় বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।’
কমেডি ছবির দুনিয়ায় জনপ্রিয় মুখ অক্ষয় কুমার। তাঁর মতে, এ ধরনের অভিনয়ই সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের। সুপারস্টারের ভাষায়, ‘কমেডিকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কখনোই প্রাপ্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। জনি লিভারের মতো শিল্পীকেও সেই সম্মান দেওয়া হয়নি, অথচ তিনি কমেডির প্রিন্সিপাল।’ অক্ষয় আরও বলেন, ‘মানুষকে কাঁদানো তুলনামূলকভাবে সহজ। আবেগপ্রবণ দৃশ্যের মাধ্যমে বা চোখে গ্লিসারিন দিয়ে মানুষকে কাঁদানো যায়। কিন্তু মানুষকে হাসানো অনেক বেশি পরিশ্রমের। আশা করি আগামী দিনেও আমার কমেডি ছবিগুলোর মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দিতে পারব।’
ইদানীং বলিউড ছবিতে সহিংসতা অনেক বেশি। অ্যাকশন ছবিতে সহিংসতার প্রসঙ্গে অক্ষয় কুমার বলেন, সবকিছুই ছবির গল্প ও নির্মাতার চাহিদার ওপর নির্ভর করে। তাঁর মতে, কিছু ছবিতে এমন উপাদানের প্রয়োজন হতে পারে, তবে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’-এ তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। অক্ষয়ের ভাষায়, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন ছবিতেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, যেখানে অযথা রক্তারক্তি বা বীভৎসতা থাকে না। একটা সীমা পর্যন্ত ঠিক আছে।’
একটার পর একটা ছবি ব্যর্থ হলেও তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবেন না বলে জানান অক্ষয়। তাঁর কথায়, ‘এটা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। আমরা কাজ করতে আসি, কাজ শেষ করি। কোনো ছবি ফ্লপ হলে সেটা আর বদলানো যায় না। শুধু বুঝতে চেষ্টা করি, কোথায় ভুল হয়েছিল, যাতে পরেরবার সেই ভুল না হয়। জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই। একটা পুরোনো কথা আছে, ঝড় এলে মাথা নিচু করে থাকতে হয়। ঝড় চলে যাওয়ার পরও বিনয়ী থাকাই ভালো। আমিও সেটাই মেনে চলি।’
টানা ৩৬ বছর ধরে একই উদ্যমে কাজ করার রহস্যও জানিয়েছেন এই অভিনেতা। তিনি বলেন, ‘এটা এখন আমার স্বভাবে পরিণত হয়েছে। সকালে উঠে কাজে বেরিয়ে পড়া, এই অভ্যাস আমি বাবার কাছ থেকে শিখেছি। তাঁকে বছরের পর বছর ভোরে উঠে কাজে যেতে এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে দেখেছি। সব সময় তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করেছি। এই অভ্যাসের কারণেই বছরে চারটি ছবি করতে পারি।’
অক্ষয় কুমারকে বলিউডের মিস্টার খিলাড়ি বলা হয়। এর পেছনে রয়েছে তাঁর জনপ্রিয় খিলাড়ি ফ্র্যাঞ্চাইজি। এই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারের শেষে অক্ষয় নিজের জনপ্রিয় খিলাড়ি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি খিলাড়ি ফ্র্যাঞ্চাইজির আরেকটি ছবি করতে চাই। তবে সেটাই হবে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির শেষ ছবি। নাম হবে আখেরি খিলাড়ি। এখন শুধু একটি ভালো চিত্রনাট্যের অপেক্ষায় আছি।’