জেব্রা ক্রসিং এঁকে কর্মজীবন শুরু, বলিউডের বড় তারকা থাকেন ১ রুমের ফ্ল্যাটে
বলিউডে বছর বছর নতুন মুখ আসে, কেউ কেউ তারকা হয়ে ওঠেন, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়েও যান; কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করতেই পর্দার আবেগ যেন আরও গভীর হয়ে যায়—তাঁদের মধ্যে অন্যতম নানা পাটেকর। তাঁর অভিনয়ে থাকে চাপা আগুন, থাকে তীব্রতা। আবার বাস্তব জীবনেও তাঁর সংগ্রামের গল্পটা যেন কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়।
জীবিকার প্রয়োজনে কখনো তিনি রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেছেন, কখনো হাতের তুলিতে রং ছড়িয়ে সিনেমার পোস্টার এঁকেছেন। মাসের শেষে যেটুকু আয় হতো, তা ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। সেই সামান্য টাকায় সংসার, জীবন, স্বপ্ন—সবকিছু গুছিয়ে রাখাই ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই কষ্টই হয়তো তাঁকে শিখিয়েছে সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ আর বাস্তবতার শক্ত পাঠ।
শিল্পের ভেতরেই বেড়ে ওঠা সাদামাটা জীবন
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় অঞ্চল মুরুদ-জঞ্জিরায়। তাঁর বাবা ড্যাঙ্কর পাটেকর ছিলেন পেশাদার চিত্রশিল্পী। ঘরে-বাইরে সারা দিন রংতুলির সঙ্গে বড় হয়েছেন তিনি। শিশুকাল থেকেই তাঁর হাতে তুলি মানাত, ছবি আঁকার ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর শিল্পবোধ। পরে তিনি ভর্তি হন মুম্বাইয়ের সুপরিচিত শিল্প শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ‘শ্রী জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টস’-এ। সেখানে পড়াশোনা করতে করতেই তাঁর জীবনে যুক্ত হয় নাটকের জগৎ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা, চরিত্রের আবেগ ধারণ করা, দর্শকের প্রতিক্রিয়া অনুভব করা—এসব ধীরে ধীরে তাঁর ভিত গড়ে দেয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই অভিনেতার, যাঁকে আমরা আজ ‘নানা পাটেকর’ নামে চিনি।
যে মানুষটা এত বড় তারকা, তাঁর জীবনযাপন কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সাধারণ। আলোঝলমল বিলাসী জীবন, দামি গাড়ি কিংবা ব্র্যান্ড-অভ্যাস—এসবের কোনো আকর্ষণ তাঁর জীবনে নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, যা প্রয়োজন নেই, তা জীবনে রাখারও মূল্য নেই। মুম্বাইয়ের একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেই আজও তাঁর বসবাস। শোবার ঘরও মাত্র একটি।
কৃষকের দুঃসময়ে
নানা পাটেকরের জীবনের একটি বড় অধ্যায় তাঁর সামাজিক কাজ। মহারাষ্ট্রে যখন একের পর এক খরা দেখা দিল, তখন ফসল যেমন নষ্ট হলো, তেমনি ভেঙে পড়ল অসংখ্য কৃষক পরিবারের স্বপ্নও। ঋণের চাপে অনেক কৃষক যখন জীবনের আশাই হারিয়ে ফেলছেন, আত্মহত্যার খবর যখন প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে উঠছিল—ঠিক তখনই নানা পাটেকর সামনে এলেন নিঃশব্দে।
নানা পাটেকর গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের কষ্ট শুনেছেন, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে ১১২টি কৃষক পরিবারের হাতে অর্থসহায়তা তুলে দেন তিনি। পরে আরও ৭০০টির বেশি পরিবারের পাশে দাঁড়ান নিয়মিতভাবে। শুধু সাহায্যই দিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন কাজটা দীর্ঘমেয়াদে চলুক। তাই প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’।
এই সংস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করা হয়েছে খরাপীড়িত কৃষকদের সহায়তায়—কখনো পুনর্বাসনে, কখনো স্বনির্ভর হওয়ার উদ্যোগে। এসব কাজ করেছেন তিনি নিঃশব্দে—কোনো প্রচার ছাড়াই। তাঁর কাছে এটি ছিল দায়িত্ব, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা—যা তিনি ব্যক্তিজীবনেও খুব করে ধারণ করেন।
কারগিলের উত্তাল সময়ে সীমান্তে
অনেকেই জানেন না, নানা পাটেকরের জীবনে রয়েছে সৈনিকের অধ্যায়ও। নব্বইয়ের দশকে ‘প্রহার’ ছবিতে সেনা অফিসারের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’ ইউনিটের সঙ্গে তিন বছর ধরে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই প্রশিক্ষণ শুধু অভিনয়ের জন্যই নয়, তাঁর ভেতরে জাগিয়ে তোলে দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি। ১৯৯৯ সালে যখন কারগিল যুদ্ধ শুরু হয়, তিনি নিজেই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, দেশের হয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষার কথা।
পরে তাঁকে ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ড্রাস, কুপওয়াড়া, বারামুলা, সোপোরের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় তিনি সৈনিকদের পাশে ছিলেন। কখনো টহলের কাজে, কখনো সামরিক হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের সেবায়—তিনি ছিলেন নীরব সহযোদ্ধা। নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন—শ্রীনগরে যাওয়ার সময় তাঁর ওজন ছিল ৭৬ কেজি, ফিরে এসেছিলেন ৫৬ কেজি হয়ে। যুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলো আজও তাঁর জীবনের এক গর্বের অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে তাঁকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদেও উন্নীত করা হয়—যা বলিউডের একজন অভিনেতার জীবনে বিরল সম্মান।
পর্দায় নানারূপে নানা
নানা পাটেকরের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। প্রথম দিকে তিনি অভিনয় করতেন পার্শ্বচরিত্রে, তবে খুব দ্রুতই তাঁর অভিনয়ের শক্তি আলাদা হয়ে ওঠে। ‘পরিন্দা’তে তিনি যে তীব্র, ভয়ংকর ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তা বলিউডের দর্শককে যেন নতুন এক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করায়।
‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘ওয়াজুদ’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’—প্রতিটি ছবিতেই তিনি চরিত্রে ডুবে গেছেন পুরোটা দিয়ে। ‘ক্রান্তিবীর’-এ বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠা তাঁর গর্জন আজও দর্শকের মনে থেকে গেছে। ২০০০-এর দশকে ‘অ্যাব তক ছাপ্পান’-এ তিনি হয়ে ওঠেন কঠোর; কিন্তু ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক পুলিশ কর্মকর্তা।
চোখের দৃষ্টি, সংলাপের ভার ও চাপা শক্তি—সব মিলিয়ে এই চরিত্র হয়ে ওঠে তাঁর অভিনয়জীবনের আরেক শিখর। আবার তাঁর কমেডি-টাইমিং দর্শককে চমকে দেয় ‘ওয়েলকাম’-এ। ডন চরিত্র হয়েও তিনি আনেন এমন হাস্যরস, যা ভয় আর মজাকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়। তিনবার তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য—কখনো অতিরঞ্জন নেই, তবে তীব্রতা সব সময়ই স্পষ্ট। সংলাপ যেন তাঁর মুখে এসে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কঠোরের আড়ালে কোমল
‘অ্যাব তক ছাপ্পান’ ছবিতে যখন নানা পাটেকরকে দেখা যায় নির্ভীক, কঠোর স্বভাবের একজন পুলিশ কর্মকর্তা(সিনেমার ভাষা ‘এনকাউন্টার-অফিসার’) হিসেবে। তখন মনে হয়, মানুষটি যেন রাগ আর গম্ভীরতার জন্যই জন্মেছেন। পরিমিত, সংলাপে কোনো বাড়াবাড়ি না করে শুধু তাঁর চাহনি, গলা আর দমিত উত্তেজনা যেন পর্দা ভেদ করে দর্শকের গায়ে এসে লাগে। এই তীব্রতা মেশানো কর্তৃত্বই তাঁকে আলাদা করে।
কিন্তু শুধু চরিত্রেই নয়, বাস্তব জীবনেও নানা পাটেকর অনেক সময় এমনই সোজাসাপটা, নির্মোহ ও কঠিন স্বভাবের বলে পরিচিত। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অভিনয়ে না এলে হয়তো তাঁর রাগী আর অস্থির স্বভাব তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যেত। ছোটবেলায় তাঁর ভেতরে ছিল প্রবল চঞ্চলতা, ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অনেকেই তাঁকে ভয় পেতেন। তাঁর নিজের ভাষায়—তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না; বরং কাজ দিয়েই জবাব দিতেন।
তবু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে তাঁর ভেতরটা। অভিনয়ই তাঁর জন্য হয়ে উঠেছে আবেগ ঝাড়ার এক নিরাপদ জায়গা, রাগ; ক্ষোভ, অভিমান, আকুলতা—সব কিছু তিনি ঢেলে দেন চরিত্রের মধ্যে। এই অভিনয়ই তাঁকে শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর আত্মনিয়ন্ত্রণ। আর ঠিক এখানেই প্রকাশ পায় তাঁর আরেক দিক—ভেতরে–ভেতরে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল, মানুষের দুঃখ-কষ্টে সহজেই নরম হয়ে যাওয়া একজন মানুষ। তাই হয়তো পর্দায় বজ্রনিনাদের মতো হুংকার দিলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন কৃষকের পাশে, খরাপীড়িত মানুষের পাশে, যুদ্ধের দিনে সৈনিকের কাছেও এক নীরব সহযোদ্ধা। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, নিজেকে বদলে নেওয়ার, নিজের সঙ্গে লড়াই করারও এক বড় মাধ্যম।
‘নাটসম্রাট’ থেকে ‘ওয়েলকাম’
মারাঠি ছবি ‘নাটসম্রাট’-এ নানা পাটেকরের অভিনয়কে অনেকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করেন। ছবিতে তিনি একজন প্রবীণ মঞ্চ-অভিনেতার চরিত্রে—যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখেন, যাঁদের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন, সেই নিজের কাছের মানুষেরাই তাঁকে বুঝতে পারে না। অবসর নেওয়া এক শিল্পীর আত্মসম্মান, অহংকার, ভেঙে পড়া মন, অপমান, নিঃসঙ্গতা—এসব অনুভূতি তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে দর্শক যেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটেন এক গভীর একাকিত্বের পথে। সংলাপের ভেতরের কষ্ট, চোখের শূন্যতা, আর স্বরের ভার—সব মিলিয়ে ‘নাটসম্রাট’ শুধু একটি সিনেমা নয়, অভিনয়ের এক জীবন্ত পাঠশালা। অনেক সমালোচকই মনে করেন, ভারতীয় সিনেমায় বয়সী চরিত্রের এমন শক্তিশালী উপস্থাপনা খুব কমই দেখা গেছে।
এর আগেও নানা পাটেকর নিজেকে প্রমাণ করেছেন বিভিন্ন জটিল চরিত্রে। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ তিনি ছিলেন এক বধির-মূক বাবার চরিত্রে—যেখানে ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা ছিল না; কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল সীমাহীন। মুখে কোনো কথা নেই, তবু চোখ আর মুখভঙ্গির ভেতর দিয়ে তিনি যে আবেগ প্রকাশ করেছেন, তা আজও দর্শকের মনে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে ‘ওয়াজুদ’-এ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এক মানুষের চরিত্রে তিনি দেখিয়েছেন সম্পূর্ণ অন্য এক দিক—একই সঙ্গে অস্থির, আক্রমণাত্মক, আবার ভেতরে–ভেতরে ভীষণ ভাঙা। এই চরিত্র তাঁর অভিনয়ের বহুমাত্রিকতা আরও স্পষ্ট করে।
এমনকি ‘ওয়েলকাম’-এ ডন চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি দর্শককে চমকে দিয়েছেন অন্যভাবে। ‘ভয় জাগানো’ দাপুটে গ্যাংস্টার হয়েও তিনি এনে দিয়েছেন অদ্ভুত হাস্যরস, যেটা শুধু সংলাপ বা কৌতুক দিয়ে নয়, তাঁর টাইমিং, অভিব্যক্তি আর মাপা অভিনয়েই তৈরি হয়েছে। এসব চরিত্রই এক জায়গায় গিয়ে মিলেছে—নানা পাটেকর কখনো চরিত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে অভিনয় করেন না, তিনি চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যান পুরোটা নিয়ে। তাই তাঁর অভিনয় দেখা মানে কেবল গল্প দেখা নয়, একজন মানুষের গভীর মানসিক জগতের ভেতরে ঢুকে পড়া।
কোথায় আছেন, কেমন আছেন
ব্যক্তিজীবনে নানা পাটেকর বিয়ে করেছিলেন নীলকান্তি পাটেকরকে। জীবনযাপনে কখনো কখনো দূরত্ব এলেও তাঁরা পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখে চলেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে মালহার পাটেকর। ছেলে মালহার বড় হয়েছেন খুব সাধারণভাবে, বাবার মতোই প্রচারবিমুখ। তিনি চলচ্চিত্রজগৎ ও সামাজিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত।
আগে তো ছিলেনই, এখন নানা পাটেকর আরও বেছে বেছে কাজ করছেন। ২০২৪ সালে মুক্তি পেয়েছে অনিল শর্মার ‘বনবাস’। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে জড়িয়ে আছেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর কার্যক্রমে। জীবনের এত ওঠা–নামা, সাফল্য, সম্মান—সবকিছুর মধে৵ও তিনি বেছে নিয়েছেন এক শান্ত জীবন।