বিদ্যার পারিশ্রমিক দিতে নিজের বাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন দিয়া

দিয়া মির্জা ও বিদ্যা বালান। কোলাজ

একটি গল্প এতটাই পছন্দ হয়েছিল দিয়া মির্জার যে সেটি পর্দায় আনার জন্য নিজের প্রথম কেনা বাড়িটিও বন্ধক রাখতে হয়েছিল তাঁকে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কারণ, শুটিং শুরুর ঠিক আগে ছবিটির স্টুডিও ও অর্থদাতারা সরে গিয়েছিলেন। তবু পিছিয়ে যাননি দিয়া। ২০১৪ সালের ‘ববি জাসুস’ ছবিটি শেষ পর্যন্ত তৈরি করেছিলেন নিজের ঝুঁকিতে। ছবির প্রধান অভিনেত্রী বিদ্যা বালানের পারিশ্রমিকেও কোনো কাটছাঁট করতে চাননি। বরং দিয়েছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারিশ্রমিক—দিয়ার নিজের ভাষ্য এমনই।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে দিয়া জানান, ‘ববি জাসুস’ বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সবকিছু প্রায় প্রস্তুত ছিল। গল্প লেখা হয়ে গেছে, টিম তৈরি, এমনকি বিদ্যা বালানের মতো একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীও অভিনয়ে রাজি হয়েছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অর্থের জোগান বন্ধ হয়ে যায়। স্টুডিও ও বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে গেলে সামনে দাঁড়িয়ে যায় বড় প্রশ্ন—ছবিটি তাহলে কীভাবে হবে?
দিয়া তখন অন্য পথ বেছে নেন। নিজের প্রথম কেনা বাড়ি বন্ধক রাখেন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। তাঁর কাছে ছবিটি শুধু আরেকটি প্রযোজনা ছিল না; তিনি যে ধরনের গল্প বলতে চেয়েছিলেন, ‘ববি জাসুস’ ছিল তারই একটি সুযোগ। তাই অর্থের সংকটে ছবিটি থামিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না তিনি।

দিয়া মির্জা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

ছবিটির গল্পও ছিল সে সময়ের মূলধারার হিন্দি সিনেমার তুলনায় আলাদা। বিদ্যা অভিনয় করেছিলেন বিলকিস ‘ববি’ আহমেদ চরিত্রে—হায়দরাবাদের এক তরুণী, যার স্বপ্ন গোয়েন্দা হওয়া। নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে নানা ছোট-বড় সমস্যার মুখোমুখি হয় সে। বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধরে তদন্ত করা, অদ্ভুত সব কেস হাতে নেওয়া এবং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—এসব নিয়েই এগিয়েছে ছবির গল্প।

ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন সমর শেখ। বিদ্যার সঙ্গে ছিলেন আলী ফজল, অর্জুন বাজওয়া, সুপ্রিয়া পাঠক, রাজেন্দ্র গুপ্ত ও তনভি আজমি। প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন দিয়া মির্জা ও সাহিল সাংঘা। দিয়ার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বর্ন ফ্রি এন্টারটেইনমেন্টের অধীনে তৈরি হয়েছিল ছবিটি।

‘ববি জাসুস’-এর সঙ্গে দিয়ার সম্পর্ক অবশ্য শুটিং শুরুর আগেই তৈরি হয়েছিল। ২০১৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ছবিটির মূল ভাবনা নিয়ে প্রায় দেড় বছর কাজ করেছিলেন তাঁরা। গল্পটি ছিল এমন এক মেয়েকে ঘিরে, যে গোয়েন্দা হতে চায়। দিয়া বলেছিলেন, বিদ্যা চিত্রনাট্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু এই ছবির ক্ষেত্রে গল্প শোনার ২০ দিনের মধ্যেই তিনি অভিনয়ে সম্মতি দেন।
কিন্তু ছবির অর্থায়ন যখন ভেঙে পড়ল, তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেল। দিয়ার ভাষায়, দলের সামনে তখন একটাই প্রশ্ন—টাকা নেই, তাহলে ছবি হবে কীভাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের বাড়ি বন্ধক রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

‘ববি জাসুস’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

এখানেই তাঁর প্রযোজক হিসেবে আরেকটি সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। আর্থিক সংকটের মধ্যেও বিদ্যা বালানের পারিশ্রমিক কমানোর অনুরোধ করেননি দিয়া। বরং পুরো পারিশ্রমিকই দেন। দিয়ার দাবি, সেটি ছিল বিদ্যার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারিশ্রমিক।

দিয়ার যুক্তিটিও ছিল সরল। পুরো ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন বিদ্যা। গল্প, চিত্রনাট্য—সবকিছুর ভার তাঁর চরিত্রের ওপর। ফলে ছবির প্রধান অভিনেত্রীকে যথাযথ পারিশ্রমিক না দেওয়ার কারণ তিনি দেখেননি। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়েই তিনি গর্বিত।

‘ববি জাসুস’ অবশ্য প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি। দিয়ার নিজের অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তাই ছোট ছিল না। নিজের বাড়ি বন্ধক রাখা, ব্যাংকঋণ নেওয়া—সব মিলিয়ে ছবিটি তাঁর জন্য ছিল বড় ব্যক্তিগত ঝুঁকি। তবে পরে তিনি জানান, ধীরে ধীরে সেই ঋণ শোধ করতে পেরেছিলেন এবং বাড়ির বন্ধকও ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন।

ছবিটি বানানোর সময় দিয়ার জন্য আরেকটি সমস্যা ছিল অভিনয় ও প্রযোজনা—দুই পরিচয়কে ঘিরে ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁকে বলা হয়েছিল, প্রযোজনায় গেলে অভিনেত্রী হিসেবে কাজ কমে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কিছু সময়ের জন্য তাঁর অভিনয়ের সুযোগ সত্যিই কমে যায় বলে জানিয়েছেন দিয়া।

আরও পড়ুন

এক বড় প্রযোজকের কাছে অভিনয়ের সুযোগ চেয়েও অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। দিয়া জানিয়েছেন, তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি যেহেতু এখন প্রযোজক, তাই ধারণা করা হয়েছিল তিনি আর অভিনয়ে আগ্রহী নন। দিয়া তখন প্রশ্ন করেছিলেন—প্রযোজক হওয়া কি অভিনেত্রী হিসেবে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হয়ে দাঁড়াবে?

তাঁর মতে, সে সময় ভারতে একজন নারী প্রযোজককে ঘিরে এমন একটি ধারণা ছিল যে তিনি বুঝি আর ক্যামেরার সামনে থাকতে চান না। এই ধারণা ভাঙতে তাঁর সময় লেগেছে।

দিয়া মির্জার অভিনয়জীবনের শুরু ২০০১ সালে ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ দিয়ে। মডেলিং ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার পর বলিউডে পরিচিতি পান তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনার দিকেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০১০-এর দশকের শুরুতে সাহিল সাংঘার সঙ্গে বর্ন ফ্রি এন্টারটেইনমেন্ট গড়ে তোলেন তিনি।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে