বিকিনিতে না, প্রেম-বিয়ে থেকে নানা বিতর্কে ভরা পুনমের জীবন
মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন, তখন বলিউড ছিল অনেকটাই পুরুষশাসিত। তাঁর মধ্যেই ঠিকই নিজের ছাপ রেখেছিলেন তিনি। এই নায়িকা আর কেউ নন পুনম ধিলন। পরে ৯০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। আজ ১৮ এপ্রিল অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
১৯৭৯ সালে ‘নুরি’ ছবি দিয়ে সুপারহিট স্টার হয়ে উঠেছিলেন পুনম ধিলন। পরবর্তীকালে রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল সুপারহিট। ‘দর্দ’, ‘নিশান’, ‘জমানা’, ‘আওয়াম’ ছবিগুলো তাঁকে দর্শকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে রেখে দিয়েছে। পুনমের ছবি ‘রেডরোজ’ বক্স অফিসে সাফল্য না পেলেও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল।
‘কালা পাত্থর’, ‘বিবি ও বিবি’, ‘ইয়ে তো কামাল হ্যায়’, ‘তেরি মেহেরবানিয়া’, ‘কর্মা’, ‘বাটওয়ারা’, ‘কসম’, ‘সোনি মাহিওয়াল’ ছবিগুলোর পর পুনমকে একবার দেখার জন্য দর্শকদের ভিড় লেগে থাকত মুম্বাইয়ের বাড়ির সামনে।
শুরুর গল্প
পুনমের জন্ম ১৯৬২ সালের ১৮ এপ্রিল, ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। বাবা অ্যারোনটিকস ইঞ্জিনিয়ার, বোন ডাক্তার। কিন্তু বাড়ির অন্য মেয়েই হলেন বলিউড তারকা। ১৯৭৭ সালে ‘মিস ইন্ডিয়া’ হয়েছিলেন তিনি। একের পর এক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এই নায়িকাকে দেখা গেছে। ১৯৭৮ সালে যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ত্রিশূল’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে পা রেখেছিলেন পুনম। প্রথম ছবিতেই তিনি অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর, সঞ্জীব কুমার, হেমা মালিনীর মতো তারকাদের সঙ্গে। বলিউডে ‘ত্রিশূল’ ছবি দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এই নায়িকা। বক্স অফিসে সাফল্য পেয়েছিল সেটি। ‘গাপুচি গাপুচি’ গানটি হয়েছিল সুপারহিট।
তারপর আরও বহু ছবিতে অভিনয় করলেও প্রথম ছবি করার সময় অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবেননি পুনম। ছবি করা তাঁর কাছে একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যাপারই ছিল শুধু।
পুরোনো একটি সাক্ষাৎকারে পুনম বলেছিলেন, ‘প্রথম ছবি করছি এই ভেবে বা অভিনয়কেই পেশা করব ভেবে “ত্রিশূল”-এ কাজ করিনি। আমি একটা ছবি করতে চেয়েছিলাম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই। আমি তো পেশাদার ছিলাম না। স্কুলে পড়তাম। অভিনয়ের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। সিনেমার দৈর্ঘ্য, চরিত্র, গুরুত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।’ অভিনেত্রী জানান, বড় বড় তারকার সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিতে তাঁর ইগোর সমস্যা হয়নি। একটি ছবি করেই তিনি লেখাপড়ার জগতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তেমনটা করেছিলেন।
প্রথম ছবি ‘ত্রিশূল’ বক্স অফিসে সুপারহিট হওয়ার পর অনেক পরিচালকই আগ্রহী হন পুনমের সঙ্গে কাজ করতে। কিন্তু সুযোগ পান রমেশ তলওয়ার। তাঁর ‘নুরি’ ছবিতে নায়িকা হন পুনম। ‘নুরি’ ছবির সময়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রমেশ-পুনম। প্রথমে শুধু ‘ভালো বন্ধুত্ব’ থাকলেও পরে দুজনের সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় নেয়। পুনম ঠিক করেন এবার মুম্বাইয়ে থাকবেন কাজের সুবিধার জন্য। শোনা যায়, তাঁকে মুম্বাইয়ে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছিলেন রমেশ।
বিকিনিতে না
আলোচিত ‘ত্রিশূল’ সিনেমার শুটিংয়ের সময়ই ঘটে একটি ঘটনা, যা আজও মনে রেখেছেন। একটি গানের দৃশ্যে তাঁকে বিকিনি পরতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সোজাসাপটা জানিয়ে দেন, তিনি তা করবেন না। তাঁর যুক্তি ছিল, তিনি সাঁতার জানেন, এমনকি প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়েও সাঁতার কেটেছেন, কিন্তু সেই ধরনের পোশাকে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর নির্মাতারা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ সাঁতারের পোশাক দেওয়া হয়।
এই প্রসঙ্গে ছবির নির্মাতা যশ চোপড়ার স্ত্রী পামেলা চোপড়া পরে পুনমকে ‘দৃঢ়চেতা মেয়ে’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন, এত অল্প বয়সে পুনম নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
আশির দশকের আলোচিত নায়িকা
১৯৭৯ সালে ‘নুরি’ ছবি দিয়ে সুপারহিট স্টার হয়ে উঠেছিলেন পুনম ধিলন। পরবর্তীকালে রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল সুপারহিট। ‘দর্দ’, ‘নিশান’, ‘জমানা’, ‘আওয়াম’ ছবিগুলো তাঁকে দর্শকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে রেখে দিয়েছে। পুনমের ছবি ‘রেডরোজ’ বক্স অফিসে সাফল্য না পেলেও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল।
‘কালা পাত্থর’, ‘বিবি ও বিবি’, ‘ইয়ে তো কামাল হ্যায়’, ‘তেরি মেহেরবানিয়া’, ‘কর্মা’, ‘বাটওয়ারা’, ‘কসম’, ‘সোনি মাহিওয়াল’ ছবিগুলোর পর পুনমকে একবার দেখার জন্য দর্শকদের ভিড় লেগে থাকত মুম্বাইয়ের বাড়ির সামনে।
তামিল, কন্নড়, বাংলাতেও ছবি করেছেন পুনম। মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর জুটিও পছন্দ করতেন দর্শকেরা। বাংলায় ‘ন্যায়দণ্ড’ নামে একটি ছবি করেছিলেন তিনি।
জীবন কখনো সরল পথে চলে না। কিন্তু প্রতিটি অভিজ্ঞতা আপনাকে শক্ত করে তোলে।
বিয়ে, বিতর্ক থেকে হারিয়ে যাওয়া
প্রথম ছবি ‘ত্রিশূল’ বক্স অফিসে সুপারহিট হওয়ার পর অনেক পরিচালকই আগ্রহী হন পুনমের সঙ্গে কাজ করতে। কিন্তু সুযোগ পান রমেশ তলওয়ার। তাঁর ‘নুরি’ ছবিতে নায়িকা হন পুনম। ‘নুরি’ ছবির সময়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রমেশ-পুনম। প্রথমে শুধু ‘ভালো বন্ধুত্ব’ থাকলেও পরে দুজনের সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় নেয়। পুনম ঠিক করেন এবার মুম্বাইয়ে থাকবেন কাজের সুবিধার জন্য। শোনা যায়, তাঁকে মুম্বাইয়ে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছিলেন রমেশ।
তবে পুনমের দিক থেকে এই সম্পর্কে সায় ছিল না। রমেশের দুর্বলতা বুঝতে পেরে তিনি ধীরে ধীরে সরে আসেন। যশ চোপড়ার সঙ্গেও তাঁকে নিয়ে গুঞ্জন শোনা যায়। কিন্তু পুনম এই রটনা অস্বীকার করে এসেছেন বরাবর।
আর এক পরিচালককে নিজেই বিয়ে করতে চেয়েছিলেন পুনম। তিনি রাজ সিপ্পি। কিন্তু তখন রাজ বিবাহিত। তিনি পুনমের জন্য সংসার ভাঙতে রাজি ছিলেন না। পুনমও তাঁর জীবনে ‘দ্বিতীয় নারী’ হয়ে থাকতে চাননি।
১৯৮৮ সাল পুনমের জীবনে ঘটনাবহুল। ওই বছর তাঁর ব্রেকআপ হয় রাজ সিপ্পির সঙ্গে। আবার ওই বছরই বাবাকে হারান অভিনেত্রী। শোকবিধ্বস্ত পুনমের সঙ্গে এই সময় আলাপ হয় প্রযোজক অশোক থাকেরিয়ার। দুর্বল সময়ে সম্পর্ক গাঢ় হতে সময় লাগেনি।
এর পর থেকে দুই সন্তান নিয়ে চণ্ডীগড়ে এক আত্মীয়ের সঙ্গে থাকতেন পুনম। তাঁর সন্তানেরাই নাকি চাননি মা বলিউডে বেশি কাজ করুক। আস্তে আস্তে ছবি করা কমিয়ে দেন তিনি। পদ্মিনী কোলাপুরে ও রতি অগ্নিহোত্রীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। একসময় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন পুনম। সেখান থেকে বন্ধুরাই বের করে আনেন তাঁকে।
স্বল্প প্রেম পর্বের পর ১৯৮৮ সালেই বিয়ে করেন অশোক-পুনম। তবে এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান ছিলেন পুনমের ঘনিষ্ঠমহল। তাঁদের ধারণা ছিল, পুনম খুব তড়িঘড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে তাঁদের ধারণা ঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। পুনমের দাম্পত্য সুখের হয়নি। ১৯৯৮ সালে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। তবে শোনা যায় আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের অনেক আগে থেকেই আলাদা থাকেতন তাঁরা।
অশোক ও পুনম, দুজনেই নাকি জড়িয়ে পড়েছিলেন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে।
নতুন করে ফেরা
বিয়ের পরে কাজ থেকে বিরতি নেন পুনম। সময় দেন তাঁর মেয়ে পালোমা এবং ছেলে আনমোলকে। কিন্তু বেশিদিন ইন্ডাস্ট্রি থেকে দূরে থাকতে তাঁর ভালো লাগেনি। পুনম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জীবন কখনো সরল পথে চলে না। কিন্তু প্রতিটি অভিজ্ঞতা আপনাকে শক্ত করে তোলে।’
নব্বইয়ের দশকে কাজে ফিরে আসেন পুনম। এই পর্বে তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবি ১৯৯৭ সালে, ‘জুদাই’। অভিনয় করেছিলেন একটি অতিথি চরিত্রে।
এর পর থেকে দুই সন্তান নিয়ে চণ্ডীগড়ে এক আত্মীয়ের সঙ্গে থাকতেন পুনম। তাঁর সন্তানেরাই নাকি চাননি মা বলিউডে বেশি কাজ করুক। আস্তে আস্তে ছবি করা কমিয়ে দেন তিনি। পদ্মিনী কোলাপুরে ও রতি অগ্নিহোত্রীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। একসময় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন পুনম। সেখান থেকে বন্ধুরাই বের করে আনেন তাঁকে।
পরবর্তী সময় টিভি সঞ্চালিকার কাজ করেছেন পুনম। ২০০৪ সালে যোগ দেন রাজনীতিতে। ২০০৫ সালে মঞ্চেও কাজ করেছিলেন। তাঁকে বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবেও দেখা গেছে পরবর্তী সময়। সার্কের বাণিজ্য সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতা প্রশংসা পেয়েছে পরবর্তীকালে। তিনি ‘কালচারাল অ্যাম্বাসাডর’ ছিলেন। এ ছাড়া মেকআপ ভ্যানের ব্যবসাও আছে। সংস্থার নাম ‘ভ্যানিটি’।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, আনন্দবাজার অবলম্বনে