ব্যাডমিন্টন কোর্ট থেকে বলিউডে, ৪০ বছরে দীপিকার অজানা–জানা

দীপিকা পাড়ুকোন। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বেঙ্গালুরুর আশির দশক। র‌্যাকেট হাতে কোর্টে নামা একটি কিশোরী—লক্ষ্য একটাই, বাবার মতোই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ভোরে অনুশীলন, স্কুল, আবার সন্ধ্যায় কোর্ট—জীবনটা তখন পুরোই খেলাধুলা আর শৃঙ্খলার। কেউ ভাবতে পারেনি, এই কোর্টের মাটি থেকেই একদিন পথ ঘুরে যাবে ক্যামেরার আলোয়; অ্যাথলেটের জায়গায় জন্ম নেবে বলিউড তারকা। বিজ্ঞাপন, ফটোশুট, র‍্যাম্প—সব মিলিয়ে খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে উঠলেন আলোচিত মুখ।

তিনি দীপিকা পাড়ুকোন। আজ ৫ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন। ৪০ পূর্ণ হলো তাঁর। ১৯৮৬ সালের এই দিনে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম, বড় হওয়া বেঙ্গালুরুতে। বাবা ভারতের ব্যাডমিন্টন তারকা প্রকাশ পাড়ুকোন, মা উজ্জ্বলা; ছোট বোন অনিশা পেশাদার গলফার। জাতীয় পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন খেলেছেন নিজেও। আর সেই কোর্ট থেকেই একসময় শুরু তাঁর বিশ্বমঞ্চের যাত্রা।

‘ওম শান্তি ওম’ থেকে তারকার জন্ম
দীপিকা প্রথম অভিনয়শিল্পী হিসেবে দেখা দেন কন্নড় ছবি ‘ঐশ্বরিয়া’-তে (২০০৬)। তবে মূলধারার হিন্দি ছবিতে তাঁর আসল অভিষেক ২০০৭ সালের ব্লকবাস্টার ‘ওম শান্তি ওম’-এ, শাহরুখ খানের বিপরীতে। প্রথম ছবিতেই দ্বৈত চরিত্র, বড় বাজেটের ছবি, বিশাল প্রচারণা আর ভারতজুড়ে নতুন এক মুখ নিয়ে কৌতূহল। ‘ওম শান্তি ওম’-এর সাফল্য দীপিকাকে মুহূর্তেই তারকাখ্যাতির শিখরে তুলে দেয়।

‘ওম শান্তি ওম’ ছবিতে দীপিকা পাড়ুকোন ও শাহরুখ খান। আইএমডিবি

এ ছবির জন্যই দীপিকা জিতে নেন ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগত নায়িকা পুরস্কার। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এরপর একে একে আসে ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’, ‘লাভ আজ কাল’, ‘ককটেল’, ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’—টানা জনপ্রিয়তার ভেলায় ভেসে যেতে থাকেন তিনি। একসময় সমালোচকেরাও বলতে শুরু করেন, বক্স অফিস-নির্ভর বড় ছবিতে নায়িকা হিসেবে সবচেয়ে ‘নির্ভরযোগ্য’ নামগুলোর একটি এখন দীপিকা পাড়ুকোন।

সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘গোলিয়োঁ কি রাসলীলা রাম-লীলা’, ‘বাজিরাও মাস্তানি’আর ‘পদ্মাবত’-এর মতো ছবিতে দীপিকার অভিনয় তাঁকে শুধু বাণিজ্যিক তারকা রাখেনি, দিয়েছে শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীর স্বীকৃতিও।

২০১৫ সালে ‘পিকু’-তে বিদ্যা চরিত্রে দীপিকার অভিনয় বলিউডে এক আলাদা মোড়। গ্ল্যামার-নির্ভর নায়িকা হয়েও সেখানে তিনি একেবারে সাধারণ, সংবেদনশীল, দায়িত্ববোধে জর্জর মেয়ের চরিত্রে নিজেকে ভেঙে ফেলেছেন। অনেক সমালোচকের চোখে, এ ছবি থেকেই দীপিকা শুধু ‘স্টার’ নন, পূর্ণাঙ্গ ‘অভিনেত্রী’ হিসেবেও নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন।

দীপিকা পাড়ুকোন। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

অন্ধকার থেকে আলো: মানসিক স্বাস্থ্যের মুখপাত্র
বাইরে থেকে সবই তখন ঝলমলে—সুপারহিট ছবি, বিজ্ঞাপন, পুরস্কার, রেড কার্পেট। অথচ ২০১৪-১৫ সালের দিকে নিজের জীবনের কঠিনতম সত্যটা সামনে নিয়ে আসেন দীপিকা। জানান, তিনি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন—নিত্যকার কাজের মধ্যেও হঠাৎ হঠাৎ কান্না পেত, কিছুই ভালো লাগত না, বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করত না।

মানসিক অসুস্থতা নিয়ে ভারতীয় সমাজে যখন এখনো নীরবতা, লজ্জা আর গোঁড়ামিই প্রধান, তখন প্রথম সারির এক তারকা নিজের সংগ্রামের কথা বলতে এগিয়ে এলেন। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই সামনে রেখে তিনি গড়ে তোলেন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লাইভ লাভ লাফ ফাউন্ডেশন’। লক্ষ্য—ডিপ্রেশন ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, চিকিৎসার সুযোগ ও পরামর্শের পথ সহজ করা, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। দীপিকা নিজে বহুবার বলেছেন, ‘আমার কথা শুনে যদি মাত্র একজন মানুষও সাহায্য চাইতে সাহস পায়, তা–ও আমার কাজ সার্থক।’
এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ক্রিস্টাল পুরস্কার পেয়েছেন দীপিকা। পরে যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের তালিকায়ও—মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর অবস্থান ও কাজের জন্য।

বলিউড থেকে হলিউড, বিশ্বমঞ্চ
দীর্ঘদিন বলিউডকেন্দ্রিক কাজের পর ২০১৭ সালে ভিন ডিজেলের বিপরীতে ‘এক্সএক্সএক্স: রিটার্ন অব জেন্ডার কেজ’-এ হলিউডে অভিষেক হয় দীপিকার। হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় মুখ হিসেবে তাঁর এই আন্তর্জাতিক পদচিহ্ন নতুন করে আলোচনায় এনে দেয় ভারতীয় অভিনেত্রীদের অবস্থান।

রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন। এএনআই

পরের বছরই দীপিকা জায়গা করে নেন বিখ্যাত সাময়িকী টাইমের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায়। ভারতীয় সিনেমা থেকে খুব কম নারী তারকারই এ তালিকায় নাম উঠেছে, তাঁদের একজন হয়ে দাঁড়ান দীপিকা। ২০২২ সালে তিনি অংশ নেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক হিসেবে; একই বছরে কাতারের দোহায় ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নেমে বিশ্বকাপের ট্রফি উন্মোচন করেন—এমন সম্মান পাওয়া প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী তিনি।

২০২৩ সালে অস্কার আসরে মঞ্চে উঠে পরিচয় করিয়ে দেন জনপ্রিয় ভারতীয় গান ‘নাটু নাটু’-কে । কালো গাউনে, প্রায় শাড়ির ধাঁচে সাজানো পোশাকে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে সেই গান ও সিনেমার পরিচিতি তুলে ধরার মুহূর্তটি তাঁর ক্যারিয়ারের আরেক স্মরণীয় অধ্যায়।

লুই ভুঁতো, কার্টিয়ের আর ফ্যাশন-দুনিয়ার দীপিকা
ভারতীয় তারকারা এখন আর শুধু সিনেমায় সীমাবদ্ধ নন; আন্তর্জাতিক ফ্যাশন-দুনিয়াতেও তাঁদের উপস্থিতি ক্রমে দৃশ্যমান। এই বদলের সামনের সারিতে অন্যতম মুখ দীপিকা পাড়ুকোন। ২০২০ সালে তিনি ফরাসি বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড লুই ভুঁতোর প্রথম ভারতীয় ‘হাউস অ্যাম্বাসেডর’ হন। এর দুই বছর পরই বিশ্বের বিখ্যাত গয়নার ব্র্যান্ড কার্টিয়ের তাঁকে বৈশ্বিক দূত হিসেবে ঘোষণা করে। একসঙ্গে দুটো বড় ফরাসি বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠানের ‘মুখ’ হওয়া ভারতীয় অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বলেই ধরা হয়।

প্যারিস ফ্যাশন সপ্তাহ, আন্তর্জাতিক সাময়িকীর প্রচ্ছদ, দুবাই-মাদ্রিদ-স্টকহোমের গালা—সব জায়গায় দীপিকার উপস্থিতি এখন অনেকটা সাংস্কৃতিক দূতের মতো। একদিকে ভারতীয় সৌন্দর্য, অন্যদিকে সমসাময়িক ফ্যাশনবোধ—এই দুইয়ের মিশেলে তিনি হয়ে উঠেছেন নতুন প্রজন্মের কাছে একধরনের অনুপ্রেরণা।

শুধু ব্র্যান্ডের মুখ হয়েই থেমে থাকেননি দীপিকা। ২০১৫ সালে নারীদের জন্য পোশাক ব্র্যান্ড ‘অল অ্যাবাউট ইউ’ আর ২০২২ সালে ত্বক পরিচর্যার ব্র্যান্ড ‘এইটি টু ডিগ্রি ই’ বাজারে আনেন দীপিকা। ব্যবসায়ী পরিচয়ও তাই এখন তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘পাঠান’ থেকে ‘কল্কি ২৮৯৮’
গত কয়েক বছরেও বক্স অফিসে দাপট কমেনি দীপিকার। ২০২৩ সালে শাহরুখ খানের বিপরীতে গুপ্তচরধর্মী বড় বাজেটের ছবি ‘পাঠান’-এ তাঁর চরিত্র—অ্যাকশন আর গ্ল্যামারের মিলিত উপস্থিতি—দর্শকের নজর কাড়ে। একই বছর ‘জওয়ান’-এ তাঁর ছোট অথচ স্মরণীয় উপস্থিতি আরও একবার প্রমাণ করে, পর্দায় অল্প সময় থাকলেও তিনি কীভাবে প্রভাব রেখে যেতে জানেন। ২০২৪ সালে হৃতিক রোশনের সঙ্গে ‘ফাইটার’-এ বিমানবাহিনীর পাইলটের চরিত্র, পরের ধাপে নাগ অশ্বিনের বহু আলোচিত বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ছবি ‘কল্কি ২৮৯৮’—সব মিলিয়ে তিনি এখন ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবির সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

আগামী দিনে রয়েছে একাধিক বড় প্রজেক্ট, যেখানে দীপিকাকে একদিকে অ্যাকশন তারকা, অন্যদিকে আবেগপূর্ণ চরিত্র—অভিনেত্রী হিসেবে দেখার অপেক্ষায় আছেন দর্শকেরা।

ব্যক্তিজীবন, ভালোবাসা আর মাতৃত্বের নতুন অধ্যায়
ক্যারিয়ারের বড় অংশ কেটেছে মুম্বাইভিত্তিক হিন্দি ছবিতে। তবু নিজের শিকড় আর সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে কখনো দ্বিধায় ভোগেন না দীপিকা। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রথমত আমি ভারতীয়, তারপরই সবকিছু।’ দক্ষিণ ভারতের পরিবার, বাংলা মাধ্যম নয়, কিন্তু স্থানীয় ভাষা, কন্নড় ঘরানা, বহুসংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠা—সব মিলিয়ে তাঁর পরিচয় বরাবরই মিশ্র, বহুবর্ণ। তারপরও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার তিনি শাড়িকেই বেছে নিয়েছেন নিজের পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে। কান, অস্কার, দাভোস—অনেক সময়ই তাঁকে দেখা গেছে ভারতীয় পোশাকে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাশনের পাশাপাশি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক গর্বেরও বহিঃপ্রকাশ।

আরও পড়ুন

সহ–অভিনেতা রণবীর সিংয়ের সঙ্গে দীপিকার পরিচয় ও প্রেম শুরু ছবির সেটে। দীর্ঘ কয়েক বছরের সম্পর্কের পর ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ইতালির লেক কোমো অঞ্চলে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে বিয়ে করেন দুজন। হিন্দু ও শিখ—দুই রীতিতেই সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দীপিকার কোলজুড়ে আসে কন্যাসন্তান, নাম দুয়া—আরবি-উর্দুতে যার অর্থ প্রার্থনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট্ট এক কার্ডে লিখে খবরটি ভাগ করে নেন তাঁরা, ‘ওয়েলকাম বেবি গার্ল, ০৮.০৯.২০২৪।’ এক লাইনের সে ঘোষণাই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

পরে এক আলাপে দীপিকা জানান, অনেক ভেবেচিন্তে মেয়ের নাম রেখেছেন তাঁরা, নামটির অর্থ আর ধ্বনি—দুটোই তাঁর খুব প্রিয়। তিনি আরও বলেন, মাতৃত্ব তাঁর জীবনের ‘সবচেয়ে আনন্দের এবং দায়িত্বের’ সময়। ছোটবেলার একটি কথা টেনে এনে বলেন, ছোট বোন অনিশার জন্মের পর থেকেই তাঁর মনে হয়েছিল, একদিন তিনি নিজেও মা হতে চান।

এখন কাজের ব্যস্ততা, দীর্ঘ শুটিং শিডিউল, আন্তর্জাতিক সফর—সবকিছুর মধ্যেও মেয়ের জন্য সময় বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি; আবার অন্যদিকে নিজের গোপনীয়তা আর সন্তানের ব্যক্তিগত জীবন রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন।

নিজের মতো হয়ে থাকা
শুরুটা ছিল ব্যাডমিন্টন কোর্টে, তারপর বিজ্ঞাপন আর ফটোশুট, পরে একের পর এক সিনেমা। রোমান্টিক নায়িকা, ঐতিহাসিক চরিত্র, আধুনিক শহুরে তরুণী, ভগ্নমনস্ক মেয়ে, গুপ্তচর, যোদ্ধা—নানা চরিত্রের ভেতর দিয়ে নিজেকে বদলে নিয়েছেন দীপিকা পাড়ুকোন।

আজ তিনি একদিকে সুপারস্টার অভিনেত্রী, অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী, সফল উদ্যোক্তা, আবার নতুন মা। এত সব পরিচয়ের ভিড়েও তিনি বারবার যে কথাটা মনে করিয়ে দেন, তা হলো নিজের প্রতি সৎ থাকা। তাঁর ভাষায়, সফলতা মানে এখন ‘যতটা সম্ভব স্বচ্ছ, সৎ আর নিজের মতো হয়ে থাকা’।