৩৪০ কোটি আয়, তবু বছরের সবচেয়ে বড় ফ্লপ! ‘টক্সিক’ কেন লাভের মুখ দেখল না

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২৬ সালের অন্যতম বড় সিনেমা হওয়ার কথা ছিল যশ অভিনীত ‘টক্সিক: আ ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন-আপস’। বড় তারকা, বিশাল বাজেট, প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তি—সব মিলিয়ে ছবিটিকে ঘিরে প্রত্যাশার কমতি ছিল না। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি গীতু মোহনদাস পরিচালিত সিনেমাটি। বরং দুর্দান্ত উদ্বোধনের পর এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে যে এখন বছরের অন্যতম বড় আর্থিক ব্যর্থতা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে ‘টক্সিক’।

মুক্তির দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরও ছবিটির বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ৩৪০ কোটি রুপিতে আটকে আছে। ট্রেড বিশ্লেষক রমেশ বালা ইন্ডিয়া টুডেকে জানিয়েছেন, ছবিটির লোকসান ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি রুপির মধ্যে হতে পারে। তাঁর হিসাবে, ‘টক্সিক’ ছবিটি বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশই তুলতে পারেনি।

বড় বাজেটের ব্যর্থ সিনেমা হিসেবে ‘টক্সিক’-এর সঙ্গে এখন তুলনা করা হচ্ছে রামচরণ অভিনীত ‘গেম চেঞ্জার’ এবং প্রভাসের ‘আদিপুরুষ’-এর। তিনটি ছবিই বড় তারকা, বিশাল আয়োজন ও বিপুল বাণিজ্যিক প্রত্যাশা নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু বিনিয়োগের তুলনায় আয়—এ জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ‘টক্সিক’।

শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো
‘টক্সিক’-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা যে উদ্বোধনী আয় ছিল, তা নয়। বরং ছবিটি শুরু করেছিল ব্লকবাস্টারের মতোই।

চার বছর পর বড় পর্দায় যশের প্রত্যাবর্তন, বিশাল বাজেটের নির্মাণ, নয়নতারা ও কিয়ারার মতো তারকার উপস্থিতি এবং পরিচালক গীতু মোহনদাসের প্রতি দর্শকের আগ্রহ—সব মিলিয়ে মুক্তির আগেই তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উন্মাদনা। ছবিটি মুক্তির প্রথম দিন বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪০ কোটি রুপি আয় করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। ভারতে প্রথম দিনের আয় ছিল প্রায় ১০১ কোটি রুপি।

দ্বিতীয় দিন থেকেই ছবিটির হিসাব পাল্টে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয় দিনে ভারতের আয় নেমে আসে প্রায় ৩৭ কোটি রুপিতে। প্রথম সোমবার তা ১০ কোটির নিচে চলে যায়। এরপর পতন আরও তীব্র হয়েছে। মুক্তির ১৬তম দিনে ভারতে ছবিটির আয় ছিল মাত্র প্রায় ৪০ লাখ রুপি। বিশ্বব্যাপী দৈনিক আয়ও নেমে যায় এক কোটির নিচে।

১৫ দিন শেষে ‘টক্সিক’-এর বিশ্বব্যাপী মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৩৯ কোটি ৩২ লাখ রুপি। ১৬তম দিনে ভারতে যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৩৯ লাখ রুপি। ফলে দেশটিতে ছবিটির আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৮ কোটি ২৪ লাখ রুপি। এ পরিস্থিতিতে ৩৫০ কোটি রুপির বিশ্বব্যাপী আয়ও এখন কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

ট্রেড বিশ্লেষক রমেশ বালার ভাষায়, ‘টক্সিক’-এর বিশ্বব্যাপী শেয়ার প্রায় ১৫০ কোটি রুপি। ছবিটির আকার ও প্রত্যাশার তুলনায় এই অঙ্ক অত্যন্ত কম। শুধু কর্ণাটক নয়, ভারত ও বিদেশের বাজারেও ছবিটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এমনকি ব্রেক-ইভেন পয়েন্টেও পৌঁছাতে পারেনি।

কতটা বড় লোকসান
‘টক্সিক’-এর প্রকৃত বাজেট নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ছবিটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪৫০ কোটি রুপি বলা হয়েছে। প্রচার, মুক্তির খরচ, সুদসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে মোট বিনিয়োগ ৫০০ কোটি রুপি বা তারও বেশি হতে পারে।
এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে বিশ্বব্যাপী মাত্র প্রায় ৩৪০ কোটি রুপি আয় যথেষ্ট নয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো সিনেমার বিশ্বব্যাপী মোট আয় থেকে সরাসরি বাজেট বাদ দিয়ে লোকসান হিসাব করা যায় না। কারণ, বক্স অফিসের অর্থের একটি অংশ যায় প্রেক্ষাগৃহের মালিক, পরিবেশকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট, ডিজিটাল, সংগীতসহ বিভিন্ন স্বত্ব বিক্রি থেকেও আয় আসে। তাই ‘টক্সিক’-এর লোকসানের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তবু বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ছবিটির লোকসান ৩০০ কোটি রুপি থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি রুপি হতে পারে। হিসাবের উচ্চতম অঙ্কটি সত্যি হলে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় আর্থিক বিপর্যয় হয়ে উঠতে পারে।

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘গেম চেঞ্জার’ ও ‘আদিপুরুষ’-এর সঙ্গে তুলনা
বড় বাজেটের ব্যর্থ সিনেমা হিসেবে ‘টক্সিক’-এর সঙ্গে এখন তুলনা করা হচ্ছে ‘গেম চেঞ্জার’ ও ‘আদিপুরুষ’-এর।

রামচরণ অভিনীত ‘গেম চেঞ্জার’ও বিশাল বাণিজ্যিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ছবিটির বাজেট নিয়ে বিভিন্ন হিসাব থাকলেও তা সাধারণত ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি রুপির মধ্যে ধরা হয়। বিশ্বব্যাপী আয় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় ছবিটির লোকসান প্রায় ২০০ কোটি রুপি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রভাসের ‘আদিপুরুষ’-এর বাজেট আরও বেশি ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ছবিটির বাজেট ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি রুপি বলা হয়েছে। ‘রামায়ণ’ অবলম্বনে নির্মিত বিশাল এই সিনেমায় প্রভাসের মতো তারকা থাকলেও বিনিয়োগের তুলনায় প্রেক্ষাগৃহ থেকে পর্যাপ্ত অর্থ ফেরত আসেনি।

‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও চমকপ্রদ। কারণ, ‘গেম চেঞ্জার’ ও ‘আদিপুরুষ’-এর তুলনায় এর উদ্বোধন ছিল অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এরপর যে ধস নেমেছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ছবিটিকে বিপাকে ফেলেছে।

প্রথম দিনের পরই কেন এমন পতন
‘টক্সিক’-এর ব্যর্থতার ধরনটি অন্য রকম। কোনো সিনেমা দুর্বলভাবে শুরু করেও দর্শকের মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে পরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আবার মাঝারি উদ্বোধনের পর ধীরে ধীরে হিটও হতে পারে। ‘টক্সিক’ করেছে ঠিক উল্টোটা।
প্রথম দিনেই বিপুল আয় করে ছবিটি এমন একটি ধারণা তৈরি করেছিল যে সামনে আরও বড় সাফল্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু পরের দিন থেকেই দর্শকের আগ্রহে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ফলে প্রথম দিনের বিশাল আয় শেষ পর্যন্ত ছবিটির চূড়ান্ত ফলাফলে খুব একটা কাজে আসেনি।

‘টক্সিক’–এ যশ। এক্স থেকে

এর মধ্যে ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ ও ‘হনুমান অংশ’র মতো সিনেমাও বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করে। ওই সিনেমাগুলো দর্শক টানতে শুরু করলে ‘টক্সিক’ ধীরে ধীরে শো ও পর্দা হারাতে থাকে। এতে ছবিটির ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আরও কমে যায়।
অর্থাৎ একদিকে প্রথম দিনের পর দর্শক ধরে রাখা যায়নি, অন্যদিকে নতুন সিনেমার প্রতিযোগিতায় কমেছে শো ও স্ক্রিন। সব মিলিয়ে ছবিটির বক্স অফিস যাত্রা দ্রুত সংকুচিত হয়েছে।

ওটিটির হিসাবও গড়বড়
শুধু প্রেক্ষাগৃহের আয় নয়, ‘টক্সিক’-এর আর্থিক সমস্যার প্রভাব পড়েছে ওটিটি স্বত্বেও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তির আগে ছবিটির ডিজিটাল স্বত্ব বিক্রি করেনি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যাশা ছিল, সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে বড় সাফল্য পেলে পরে ওটিটি স্বত্ব আরও বেশি দামে বিক্রি করা যাবে; কিন্তু বক্স অফিসে ছবির পতন সেই পরিকল্পনাকেই উল্টো পথে নিয়ে যায়।

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

রমেশ বালার মতে, ওটিটি স্বত্ব আগে বিক্রি না করাই ছবিটির বড় আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ। তাঁর ভাষ্য, আগে স্বত্ব বিক্রি করা গেলে অন্তত ১০০ কোটি রুপির মতো ক্ষতি কমানো সম্ভব হতো। স্যাটেলাইট স্বত্বের কী হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। তাঁর কাছে খবর, এখন ওটিটি স্বত্বের দাম প্রায় ৩০ কোটি রুপি ধরা হচ্ছে, যা অত্যন্ত কম।
মুক্তির আগে ‘টক্সিক’-এর ওটিটি স্বত্বের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২০০ কোটি রুপি হতে পারে বলে আলোচনা ছিল; কিন্তু এখন বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেই অঙ্ক নেমে প্রায় ৩০ কোটি রুপিতে এসেছে। যদিও এ তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়, তবু এটি দেখাচ্ছে, প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমার পারফরম্যান্স কীভাবে তার অন্য স্বত্বের বাজারমূল্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সাধারণত কোনো সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা না করলে ডিজিটাল, স্যাটেলাইট ও সংগীতের স্বত্ব থেকে পাওয়া অর্থ ক্ষতির ধাক্কা কিছুটা সামলে দিতে পারে। কিন্তু ‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহে ভালো ব্যবসার আশায় ওটিটি স্বত্ব আটকে রাখার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

‘আদিপুরুষ’-এর চেয়েও বড় ব্যর্থতা
‘আদিপুরুষ’ একসময় ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বড় আর্থিক হতাশা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বিপুল বাজেটের বিপরীতে তুলনামূলক কম আয় ছবিটিকে বড় ঘাটতির মুখে ফেলেছিল। ‘গেম চেঞ্জার’ও দেখিয়েছে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল তারকানির্ভর সিনেমায় প্রত্যাশা পূরণ না হলে ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ‘টক্সিক’।

বর্তমান লোকসানের হিসাব সত্যি হলে ছবিটির আর্থিক ঘাটতি ‘আদিপুরুষ’ ও ‘গেম চেঞ্জার’—দুই সিনেমারই লোকসানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, এগুলো এখনো চূড়ান্ত হিসাব নয়। ডিজিটাল, স্যাটেলাইট, সংগীতসহ অন্যান্য স্বত্ব থেকে কত আয় হবে এবং ছবিটির প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় কত ছিল—তার ওপর শেষ পর্যন্ত প্রকৃত লোকসানের অঙ্ক নির্ভর করবে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে সন্দেহ নেই—প্রেক্ষাগৃহে ‘টক্সিক’-এর পারফরম্যান্স প্রত্যাশার তুলনায় ভয়াবহ রকমের খারাপ হয়েছে।

১০০ কোটির উদ্বোধন থেকে ৩৪০ কোটির সমাপ্তি
‘টক্সিক’-এর ব্যর্থতা যশের জন্যও বড় ধাক্কা। কারণ, সিনেমাটি এসেছে ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এর মতো বিশাল সাফল্যের পর। চার বছর পর বড় পর্দায় তাঁর প্রত্যাবর্তন, প্যান-ইন্ডিয়া বাজারকে লক্ষ্য করে নির্মাণ এবং বিপুল বাজেট—সব মিলিয়ে প্রত্যাশার মাত্রা ছিল অনেক উঁচু। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি ছবিটি।
সমস্যাটি শুধু একটি খারাপ সপ্তাহান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছবিটির আর্থিক পরিকল্পনা নির্ভর করেছিল একাধিক বিষয়ের ওপর—দীর্ঘস্থায়ী প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন, দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখা, যশের তারকা-ক্ষমতা, বিশাল বাজেটের যথাযথ বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্বত্ব থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়।

তবে একের পর এক সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এককথায়, ‘টক্সিক’-এর শুধু বক্স অফিসই ব্যর্থ হয়নি—ছবিটিকে ঘিরে তৈরি করা পুরো অর্থনৈতিক হিসাবই যেন একে একে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে