৪ হাজার কারাবন্দী যে সিনেমার গল্প লিখেছেন
বলিউডের সিকুয়েলের ধারণা নতুন নয়; কিন্তু এমন গল্প খুব কমই আছে, যেখানে একটি ব্লকবাস্টার ছবির দ্বিতীয় কিস্তির বীজ রোপিত হয়েছে জেলের ভেতরে; আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন সঞ্জয় দত্ত। প্রায় তিন দশক আগে মুক্তি পাওয়া ‘খলনায়ক’ আজও জনপ্রিয়। আর সেই ছবির উত্তরাধিকার নিয়ে আবার ফিরতে চলেছে ‘খলনায়ক রিটার্নস’। নতুন সময়ের ভাষায় পুরোনো চরিত্রের পুনর্জন্ম। এই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা শুধু সিনেমার নয়; বরং এক মানুষের ব্যক্তিগত যাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
জেলের ভেতরে ‘বল্লু’–কে ফিরে পাওয়া
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। ব্যক্তিগত ও আইনি জটিলতায় জর্জরিত জীবন, আর তারই অংশ হিসেবে জেলে কাটানো সময়—এই অধ্যায়টি সঞ্জয় দত্তের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও কঠিন সময়গুলোর একটি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সেই অন্ধকার সময়ই হয়ে ওঠে এক সৃষ্টিশীল মুহূর্তের সূচনা।
সঞ্জয় দত্ত নিজেই জানিয়েছেন, জেলের ভেতরে তিনি প্রায়ই গান বাজাতেন। আর তখনই তিনি লক্ষ করেন, সহবন্দীরা বারবার শুনতে চাইতেন ‘খলনায়ক’-এর গান। সেই ছবির প্রতি তাঁদের উন্মাদনা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করে, ‘এই গল্প কি আবার বলা যায়?’
একদিন কৌতূহলবশত তিনি জেলের প্রায় চার হাজার বন্দঅকে প্রশ্ন করেন, ‘যদি “খলনায়ক” আবার বানানো হয়, দেখবে?’ উত্তর আসে একসঙ্গে, ‘হ্যাঁ।’ এ যেন এক অদ্ভুত গণভোট, যেখানে দর্শক নেই, আছে বন্দী; নেই প্রেক্ষাগৃহ, আছে কারাগারের দেয়াল। কিন্তু সেখানেই জন্ম নেয় একটি সম্ভাবনা।
চার হাজার ধারণা, একটি সিনেমা
এরপর যা ঘটে, তা আরও অবিশ্বাস্য। সঞ্জয় দত্ত সহবন্দীদের বলেন, তাঁরা যেন ছবির জন্য নিজেদের আইডিয়া লিখে দেন। ফলাফল, চার হাজারেরও বেশি এক পাতার গল্প!
এ ঘটনা শুধু কৌতূহলোদ্দীপক নয়; বরং চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এক বিরল উদাহরণ। এত মানুষের ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা—সব মিলিয়ে যেন এক বিশাল ভান্ডার।
সব কটি আইডিয়া পড়তে সময় লেগেছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু সেই হাজারো চিন্তার ভিড় থেকে একটি ধারণা সঞ্জয়কে নাড়া দেয়। সেটিই হয়ে ওঠে ‘খলনায়ক রিটার্নস’-এর ভিত্তি।
পুরোনো গুরু, নতুন পথ
জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর, প্রথম সুযোগেই সঞ্জয় দত্ত যোগাযোগ করেন ছবির মূল নির্মাতা সুভাষ ঘাইয়ের সঙ্গে। গল্প শুনে ঘাইও উচ্ছ্বসিত হন। তাঁর এককথার জবাব, ‘এটা বানানো উচিত।’
এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ‘খলনায়ক’ শুধু একটি ছবি ছিল না, এটি ছিল একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। ‘বল্লু’ চরিত্রটি যেমন নায়ক-খলনায়কের সীমারেখা ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি নতুন ছবিতেও সেই জটিলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
সঞ্জয় জানান, তাঁর প্রযোজনা সংস্থা ‘থ্রি ডাইমেনশন মোশন পিকচার্স’এবং প্রযোজক ‘অ্যাসপেক্ট এন্টারটেইনমেন্ট’ যৌথভাবে ছবিটির সিকুয়েলের স্বত্ব কিনে নিয়েছেন পরিচালক সুভাষ ঘাই এবং তাঁর সংস্থা ‘মুক্তা আর্টস’থেকে। এই ছবির প্রথম ভাগে দেখা গিয়েছিল মাধুরী দীক্ষিত ও জ্যাকি শ্রফকে। খবর, সিকুয়েলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘খলনায়ক রিটার্নস’। ইতিমধ্যেই নাকি তৈরি হয়ে গেছে ছবির প্রথম ঝলকও।
এই প্রসঙ্গে সঞ্জয় বলেন, ‘“খলনায়ক”-এর যাত্রা দীর্ঘ। সুভাষজি না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। তিনি একজন কিংবদন্তি। এই নতুন ছবিতেও তিনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন।’
‘বল্লু’—এক চরিত্রের দীর্ঘ ছায়া
১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘খলনায়ক’ বলিউডে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল। এখানে নায়ক আর খলনায়কের বিভাজন এতটা সরল ছিল না। সঞ্জয় দত্তের ‘বল্লু’ চরিত্রটি ছিল ভয়ংকর, তবু আকর্ষণীয়—একজন অপরাধী, কিন্তু মানবিক টানাপোড়েনে ভরা।
এই চরিত্রই আজও দর্শকের মনে জায়গা করে আছে। আর সেই কারণেই ‘খলনায়ক রিটার্নস’ শুধু নস্টালজিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে নয়; বরং চরিত্রের গভীরতা নিয়েই নতুন করে দর্শকের সামনে আসতে চায়।
বন্দীদশা থেকে মুক্তির দর্শন
এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সঞ্জয় দত্তের ব্যক্তিগত উপলব্ধি। জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, একসময় তিনি মুক্তির জন্য অস্থির হয়ে উঠতেন। কিন্তু এক কারারক্ষীর পরামর্শ, ‘আশা করা বন্ধ করুন, সময় নিজেই কেটে যাবে’ তাঁর ভাবনাকে বদলে দেয়।
এই উপলব্ধি শুধু ব্যক্তিগত নয়; বরং দর্শনগতও। হয়তো এই অভিজ্ঞতাই ‘খলনায়ক রিটার্নস’-এর গল্পে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক স্তর যোগ করবে।
যদিও নির্মাতারা এখনো স্পষ্ট করেননি ‘খলনায়ক রিটার্নস’ ঠিক কী ধরনের ছবি হবে—সরাসরি সিকুয়েল হবে, নাকি নতুনভাবে কল্পনা করা হবে গল্প। ছবির চিত্রনাট্য এখনো তৈরি হয়নি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে