নৃশংস, ভয়ংকর নায়কে আস্থা রাখছে বলিউড
বলিউডে ধীরে ধীরে এক নতুন ধরনের নায়ক উঠে এসেছে—যারা পুরোপুরি নিখুঁত নয়। ২০২৫ সাল থেকে এবং এখন ২০২৬-এ দুই সপ্তাহ পার হওয়া পর্যন্ত, ভারতের সিনেমা হলের পর্দাগুলো দখল করেছে এমন পুরুষ নায়কেরা, যারা মানুষের জীবনের জটিল সত্যগুলো দেখায়। এই চরিত্রগুলো প্রেমময় বা আদর্শবান নয়, বরং জীবনকে তার বাস্তবতায় দেখায়, যা হিন্দি সিনেমার প্রচলিত নায়কের চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
বাস্তবতার ছোঁয়া
বাস্তবে মানুষ জটিল, বিপরীতমুখী আর নানা আবেগের মিশেলে তৈরি। বলিউডও অবশেষে এই সত্যকে অবলম্বন করছে, তা রঙিন করে দেখানোর চেষ্টা না করেই। এখন নায়ককে আর ‘আদর্শ’ দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং এমন চরিত্রগুলো উঠে এসেছে, যারা চরিত্রে অন্ধকার প্রবৃত্তিকে প্রতিফলিত করে। সেই সব প্রবৃত্তি যা আমরা সাধারত স্বীকার করতে চাই না। এই নায়কেরা সিনেমার জন্য কখনো ছলচাতুরী করে না।
শুরু ‘কবীর সিং’ দিয়ে
২০১৯ সালে ‘কবীর সিং’ হিন্দি সিনেমায় নতুন ধারা শুরু করেছিল। শাহিদ কাপুর অভিনীত সার্জন কবীর সিং, এক ধ্বংসাত্মক চরিত্র। কিন্তু এই ‘বিষাক্ত চরিত্র’ এমনভাবে লেখা, যা দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় মনে করেছে। এই চরিত্রগুলো ঐতিহ্যবাহী হিরোর (যেমন ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’-এর প্রেম বা ‘দিল তো পাগল হ্যায়’-এর রাহুল) থেকে পুরোপুরি ভিন্ন।
কবীর সিংয়ের আকর্ষণ তাঁর নৈতিকতায় নয়, বরং তাঁর আবেগীয় খোলামেলা উপস্থাপনায়। তিনি তাঁর কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয়ে পর্যুদস্ত। সিনেমা তাঁর আচরণকে ক্ষমা করে না, কিন্তু তাঁকে সহজপাচ্যও করে না।
‘কবীর সিং’ দেখিয়েছে যে দর্শকেরা আর নিখুঁত ও আদর্শবান পুরুষের খোঁজে নয়, তারা বিতর্কিত চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট। দর্শকরা কেবল দেখেননি, তারা এই অসম্পূর্ণ চরিত্রের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন। এই খোলামেলা দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী সময়ে নতুন প্রজন্মের হিরোদের জন্য পথ তৈরি করেছে।
‘অ্যানিমেল’ ও পরবর্তী উদাহরণ ‘কবীর সিং’ যা শুরু করেছিলেন সেটা নিজের পরের ছবি ‘অ্যানিমেল’-এ আরও এক ধাপ এগিয়ে নেন নির্মাতা সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা। রণবীর কাপুর অভিনীত চরিত্রটি ও পুরো সিনেমা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও বিশ্বব্যাপী ৯০০ কোটি রুপি আয় করে।
‘অ্যানিমেল’ দেখিয়েছে কীভাবে প্রধান চরিত্রকে নৃশংস দেখিয়েও দর্শকদের সিনেমা দেখতে বাধ্য করা যায়। গত বছরের আলোচিত আরেকটি সিনেমা ‘ধুরন্ধর’ও সে পথেই হেঁটেছে। এটা আবারও প্রমাণ করেছে দর্শকেরা এখন নায়কের কাছ থেকে নৈতিকতার পাঠ নিতে চান না, বরং পর্দায় বাস্তবতার ছোঁয়া চান। ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায় রণবীর সিং করেছেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টের চরিত্র। চরিত্রটি নৃশংস, কোনো পরিকল্পনা নেই; নিজের মর্জিমাফিক চলে। যা আগের যুগের হিন্দি সিনেমার নায়কের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ২০০ কোটি রুপি আয় করেছে।
দক্ষিণী সিনেমার ভূমিকা
দক্ষিণী সিনেমা বলিউডের এই ‘নৃশংস’ ধারাকে শুধু অনুসরণ করেনি, বরং পথপ্রদর্শকও হয়েছে। ‘অর্জুন রেড্ডি’ (যে সিনেমার রিমেক ‘কবীর সিং’), ‘কেজিএফ’, ‘পুষ্পা’, ‘কাতরু ভেলিয়াদাই’, ‘লাভ’ ও ‘লাইগার’—এসব সিনেমা দেখিয়েছে যে হিরোরা খারাপ বা ভয়ংকর হলেও গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।
আসন্ন প্রকল্প ও নতুন হিরোরা বিশাল ভরদ্বাজ, সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গাসহ অন্যান্য পরিচালকের ছবিতেও দেখা যাবে নতুন ধারার নায়কদের। এসব সিনেমার মধ্যে শহীদ কাপুরকে দেখা যাবে ‘ও রোমিও’ ছবিতে। এ ছাড়া ‘টক্সিক’-এ যশ, ‘স্পিরিট’-এ প্রভাস, ‘কারা’য় ধনুশ অভিনীত চরিত্রগুলোও একই ধরনের।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রভাব
নায়কদের ‘নৃশংস’ হওয়ার পেছনে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা আছে। গত কয়েক বছরে মুক্তি পাওয়া বিভিন্ন ভারতীয় ওয়েব সিরিজ ও সিনেমায় এ ধরনের বহু নায়ক বা অ্যান্টি হিরো চরিত্র দেখা গেছে। যেমন বলা যায় ‘দাহাড়’-এ বিয়জ ভার্মা অভিনীত সিরিয়াল কিলারের চরিত্রটি।
বাস্তবতার জয়
একের পর এ ধরনের চরিত্রে নায়কদের হাজির করা হলে একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে, তাই নতুন সিনেমাগুলোতে নির্মাতারাও নানা বৈচিত্র্যের আশ্রয় নিচ্ছেন। নায়কদের নৃশংসতা আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তাদের দেওয়া হচ্ছে পুলিশ বা গুপ্তচারের চরিত্র।
এসব সিনেমায় অতি মাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক, অনেক সময়ই নারী চরিত্রগুলোকে হেয় করে দেখা হয়—সমালোচকদের এমন অভিযোগ আছে। কিন্তু এমন নায়কদের নিয়ে সিনেমা বানালে যেহেতু ব্যাপক ব্যবসা করে, নির্মাতারা তাই এসব সমালোচনা খুব একটা গায়ে মাখছেন না।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে