কথা না বলেই শুটিং শেষ! ৪০ বছর পর জানা গেল নায়ক–নায়িকার অদ্ভুত আচরণের কারণ

সিনেমার দৃশ্যে কমল হাসান ও রতি অগ্নিহোত্রী। আইএমডিবি

পর্দায় তাঁরা নায়ক–নায়িকা। একসঙ্গে প্রেমের দৃশ্য করেছেন, আবেগঘন মুহূর্তে অভিনয় করেছেন। দর্শক দেখেছেন তাঁদের রসায়ন। কিন্তু ক্যামেরার পেছনে সম্পর্ক ছিল একেবারেই অন্য রকম। একই ছবিতে অভিনয় করেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেন না কমল হাসান ও রতি অগ্নিহোত্রী। এমনকি ‘হাই’ বা ‘হ্যালো’ বলেও সৌজন্য বিনিময় করেননি তাঁরা।

প্রায় চার দশক পর সেই অদ্ভুত ঘটনার কথা আবার সামনে এসেছে। সম্প্রতি সিদ্ধার্থ কাননের অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘দেখা পেয়ার তুমহারা’–এর লেখক রণবীর পুষ্প জানিয়েছেন, ১৯৮৫ সালের ওই ছবির শুটিংজুড়ে কমল ও রতি একে অপরের সঙ্গে কথা বলেননি। অথচ ক্যামেরা চালু হলে পেশাদার অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেদের কাজ ঠিকই করেছেন।

ঘটনার শুরু ছবিটির অভিনয়শিল্পী নির্বাচন নিয়ে। রণবীর পুষ্পর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘দেখা পেয়ার তুমহারা’–তে কমল হাসানের বিপরীতে কাকে নেওয়া হবে, তা নিয়ে অভিনেতার নিজের একটি পছন্দ ছিল। তিনি চেয়েছিলেন পুনম ধিলনকে নায়িকা হিসেবে নিতে। কিন্তু রণবীর পুষ্পর পছন্দ ছিল রতি অগ্নিহোত্রী।

শেষ পর্যন্ত রণবীরের পছন্দই চূড়ান্ত হয়। রতির বাবা তখন মেয়ের ক্যারিয়ার পরিচালনার পাশাপাশি তাঁর সচিবের দায়িত্বও পালন করতেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে রতিকে ছবিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন রণবীর। কিন্তু নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি—এ বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি কমল।

‘দেখা পেয়ার তুমহারা’র দৃশ্য। আইএমডিবি

রণবীরের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, কিছুদিন পর তাঁরা বুঝতে পারেন কমল ও রতি একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন না। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে কীভাবে ছবির কাজ শেষ হবে, সেই চিন্তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ঝামেলা ছাড়াই দুজন শুটিং চালিয়ে যান।

শুটিংয়ের পুরো সময় কমল ও রতির মধ্যে সেই নীরবতা বজায় ছিল। তাঁরা একবারের জন্যও একে অপরকে ‘হাই’ বা ‘হ্যালো’ বলেননি। অথচ ক্যামেরার সামনে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি যে দুই অভিনেতার মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ চলছে। দৃশ্য অনুযায়ী সংলাপ বলেছেন, আবেগ প্রকাশ করেছেন, পরস্পরের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।

এ ঘটনাটিই আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে ‘এক দুজে কে লিয়ে’–এর পুরোনো অধ্যায় মনে করলে। ১৯৮১ সালের সেই ছবিতে কমল হাসান ও রতি অগ্নিহোত্রী ছিলেন আলোচিত জুটি। ছবিতে তাঁদের প্রেমের গল্প দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু শুটিংয়ের সময় দুজনের সম্পর্ক নিয়ে নানা টানাপোড়েনের কথাও পরে সামনে আসে।
কমল তখন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রেও নিজের অবস্থান তৈরি করে ফেলেছেন। রতি ছিলেন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে থাকা তরুণ অভিনেত্রী। ফলে দুজনের ব্যক্তিত্ব ও কাজের ধরন নিয়েও সেটে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

‘দেখা পেয়ার তুমহারা’র দৃশ্য। আইএমডিবি

এর মধ্যেই কমলের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা আলোচনা চলছিল। তিনি তখন বাণী গণপতিকে বিয়ে করেছেন। একই সময়ে অভিনেত্রী সারিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের খবরও সংবাদমাধ্যমে আসতে থাকে। পরবর্তী সময়ে সারিকা অন্তঃসত্ত্বা হন। সেই সময় কমলের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল।

আর এ সময়েই রতির একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের বক্তব্যও দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল। রতি দাবি করেছিলেন, ‘এক দুজে কে লিয়ে’–এর শুটিংয়ের সময় এক রাতে কমলের ঘরে অন্য এক নারী ছিলেন। এমনকি ভোর চারটার দিকে এক নারীকে কমলের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। ঘটনাটি নিয়ে তখন নানা জল্পনা তৈরি হয়।

‘দেখা পেয়ার তুমহারা’র দৃশ্য। আইএমডিবি

পরে সিনেব্লিৎজ–এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কমল ওই মন্তব্যের জবাবও দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সে সময় স্ত্রী বাণী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না।
পুরোনো এই বিতর্কের সত্যতা নিয়ে নানা মত থাকলেও কমল ও রতির সম্পর্ক যে খুব একটা উষ্ণ ছিল না, পরবর্তী ঘটনাগুলো তার ইঙ্গিত দেয়। আর ‘দেখা পেয়ার তুমহারা’র সেটে সেই দূরত্ব যেন চূড়ান্ত রূপ নেয়।

আরও পড়ুন

কমল ও রতির গল্পে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মেও তাঁদের দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কমল হাসান ও সারিকার মেয়ে অক্ষরা হাসানের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন রতি অগ্নিহোত্রীর ছেলে তনুজ বিরওয়ানি। প্রায় চার বছর তাঁদের সম্পর্ক ছিল।

পরে তনুজও সিদ্ধার্থ কাননের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সম্পর্কে সঙ্গীর প্রতি সম্মান হারিয়ে গেলে এবং প্রয়োজনের সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানো না হলে সেই ক্ষত সহজে মুছে যায় না। ক্ষমা করা সম্ভব হলেও কিছু বিষয় মানুষ ভুলে যায় না। শেষ পর্যন্ত দুজনই নিজেদের জীবনে আলাদা পথে এগিয়ে গেছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে