সালমানের পরামর্শে ৯০ কেজি থেকে হিন্দি সিনেমার নায়িকা হওয়ার গল্প
একসময় তাঁকে বলা হতো ‘স্টারকিড’, আবার ক্যারিয়ারের শুরুতে শরীরের ওজন নিয়ে তীব্র কটাক্ষও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, শুধু তারকা পরিবারের পরিচয় নয়, নিজের অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব দিয়েও আলাদা জায়গা তৈরি করা যায়। আজ ২ জুন অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক সোনাক্ষীর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
তারকাখচিত পরিবারে বেড়ে ওঠা
১৯৮৭ সালের ২ জুন ভারতের পাটনায় জন্ম সোনাক্ষীর। তাঁর বাবা শত্রুঘ্ন সিনহা হিন্দি সিনেমার অভিনেতা ও রাজনীতিক। মা পুনম সিনহাও ছিলেন অভিনেত্রী। দুই বড় ভাই লাভ ও কুশ সিনহার সঙ্গে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ‘রামায়ণ’ বাংলোয় তাঁর বেড়ে ওঠা।
অনেকেই ভাবতেন, এমন পরিবারে জন্ম নেওয়ায় অভিনয়ে আসা তাঁর জন্য সহজ ছিল। কিন্তু সোনাক্ষীর নিজের দাবি, পরিবার কখনো তাঁকে জোর করে সিনেমায় আনেনি। বরং ছোটবেলায় তিনি অভিনয়ের চেয়ে আঁকাআঁকি ও ফ্যাশন ডিজাইনের দিকে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
মুম্বাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবেও কাজ করেছেন।
৯০ কেজি থেকে নায়িকা হওয়ার লড়াই
আজকের পর্দার সোনাক্ষীকে দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় তাঁর ওজন ছিল প্রায় ৯০ কেজির কাছাকাছি।
সোনাক্ষী নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অভিনয়ে আসার আগে তিনি নিজের ওজন নিয়ে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতেন। চলচ্চিত্রে নায়িকা হওয়ার কথা কখনো ভাবেননি। পরিস্থিতি বদলায় যখন সালমান খান তাঁকে ওজন কমানোর পরামর্শ দেন।
দেড়-দুই বছরের কঠোর পরিশ্রমে ৩০ কেজির বেশি ওজন কমান তিনি। নিয়মিত ব্যায়াম, ডায়েট ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের শরীরকে বদলে ফেলেন।
পরে সোনাক্ষী বলেছিলেন, ‘ওজন কমানো শুধু নায়িকা হওয়ার জন্য ছিল না; নিজের জন্য ছিল।’
‘দাবাং’ বদলে দেয় জীবন
২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘দাবাং’। ছবিতে সালমান খানের বিপরীতে ‘রাজ্জো’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা হয়ে যান সোনাক্ষী।
ছবিটি বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য পায়। প্রথম ছবিতেই সোনাক্ষী জিতে নেন সেরা নবাগত অভিনেত্রীর একাধিক পুরস্কার।
সেই সময় বলিউডে যখন গ্ল্যামারাস, সাইজ-জিরো নায়িকাদের আধিপত্য, তখন ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাকে উপস্থিত সোনাক্ষী দর্শকদের কাছে নতুন এক আবেদন তৈরি করেন।
একের পর এক হিট
‘দাবাং’-এর পর সোনাক্ষীর ক্যারিয়ার দ্রুত এগোতে থাকে। তিনি অভিনয় করেন—‘রাউডি রাঠোর’, ‘সন অব সর্দার’, ‘দাবাং ২’, ‘হলিডে: আর সোলজার ইজ নেভার অব ডিউটি’, ‘লুটেরা’, ‘মিশন মঙ্গল’ সিনেমায়। বিশেষ করে ‘লুটেরা’ তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমালোচকেরা প্রথমবারের মতো তাঁর অভিনয়ক্ষমতার প্রশংসা করেন। অনেকেই মনে করেন, এই ছবিই প্রমাণ করে সোনাক্ষী শুধু বাণিজ্যিক নায়িকা নন।
ক্যারিয়ারের কঠিন সময়
প্রথম কয়েক বছরের সাফল্যের পর তাঁর ক্যারিয়ারে মন্দা দেখা দেয়। অনেক ছবি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, তিনি একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ট্রলও শুরু হয়। বিশেষ করে সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উত্তর দিতে না পারায় ব্যাপক উপহাসের শিকার হন।
তবে সোনাক্ষী এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন নিজের স্বভাবসুলভ রসবোধে। তিনি বারবার বলেছেন, ‘একটি ভুল উত্তর আমার জীবন বা মেধার পরিচয় নয়।’
ওয়েব সিরিজে নতুন সাফল্য
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। ‘দাহাড়’ সিরিজে একজন পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান। এরপর ‘হীরামান্ডি’–তে তাঁর অভিনয় নতুন করে আলোচনায় আসে। সিরিজে তাঁর চরিত্রটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এতে প্রমাণ হয়, শুধু বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, জটিল ও নাটকীয় চরিত্রেও তিনি সফল।
প্রেম ও বিয়ে
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দীর্ঘদিন খুব বেশি কথা বলতেন না সোনাক্ষী। তবে কয়েক বছর ধরে অভিনেতা জহির ইকবালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছিল। ২০২৪ সালে বহুদিনের প্রেমিক জহির ইকবালকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়, বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মের দুই মানুষের বিয়ে হওয়ায় নানা বিতর্কও দেখা দেয়।
কিন্তু সোনাক্ষী ও জহির দুজনেই স্পষ্ট করে জানান, তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মান।
বিয়ের পরও তাঁরা নিজেদের পেশাগত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন
সোনাক্ষীর বিয়ের সময় একটি বড় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—বাবা শত্রুঘ্ন সিনহা নাকি মেয়ের বিয়েতে খুশি নন। পরবর্তী সময়ে সেই গুঞ্জন ভুল প্রমাণিত হয়। শত্রুঘ্ন সিনহা নিজেই প্রকাশ্যে মেয়েকে আশীর্বাদ করেন এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। পরিবারের সঙ্গে সোনাক্ষীর সম্পর্ক বরাবরই ঘনিষ্ঠ।
‘দাবাং’-এর সরল ‘রাজ্জো’ থেকে ‘দাহাড়’-এর দৃঢ় পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা ‘হীরামান্ডি’র জটিল চরিত্র—প্রতিটি ধাপে তিনি বদলেছেন, শিখেছেন এবং নতুন করে নিজেকে গড়েছেন।
সামনে সোনাক্ষীকে দেখা যাবে ‘দাহাড়’–এর দ্বিতীয় মৌসুমে।
মিড ডে, বলিউড হাঙ্গামা অবলম্বনে