‘পুরোনো দিনের প্রেমে বিশ্বাস করি’

‘শোটাইম–এর পর বেশ কিছুদিন পর্দায় দেখা যায়নি। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের রোমান্টিক সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’–তে প্রীতি চরিত্রে অভিনয় করে আবার আলোচনায় মহিমা মকওয়ানা। রুচির অরুণ পরিচালিত সিরিজটিতে তাঁর সঙ্গে আছেন বিক্রান্ত ম্যাসি ও বেদিকা পিন্টো। গত সোমবার মুম্বাইয়ের বান্দ্রা-কুর্লা কমপ্লেক্সে নেটফ্লিক্স কার্যালয়ে মহিমা মকওয়ানার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্য

মহিমা মকওয়ানা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

শুরুতেই দীর্ঘ বিরতি প্রসঙ্গ। মহিমার দাবি, তিনি কোথাও হারিয়ে যাননি, ‘আমি এখানেই ছিলাম। শুধু ভালো চিত্রনাট্যের অপেক্ষায় ছিলাম। একজন অভিনেতা হিসেবে নিজের কাজটা করা ছাড়া অনেক কিছুই আমাদের হাতে থাকে না। কোনো প্রকল্প কবে শুরু হবে, কবে মুক্তি পাবে, তা প্রযোজকসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।’

‘শোটাইম’, ‘অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ’ কিংবা ‘তুমসে না হো পায়েগা’–র চেয়ে আলাদা কিছু করতে চাইছিলেন। সেই অপেক্ষারই উত্তর হয়ে এসেছে মুসাফির ক্যাফে। মহিমা বলেন, ‘ভালো কাজ আসতে একটু সময় লেগেছে। মনে হয়েছে, মুসাফির ক্যাফে আমার জন্য ঠিক সেই সুযোগ ছিল।’

তবে অপেক্ষার দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। একজন অভিনেতার জীবনে কাজ না থাকার সময়টাই তাঁর কাছে সবচেয়ে কঠিন। ‘আমার কাছে সেটে থাকা সবচেয়ে সহজ। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার সময়ই নিজেকে সবচেয়ে স্বাধীন মনে হয়। কঠিন হলো অপেক্ষা। তবে আমরা তো এই পেশা নিজেরাই বেছে নিয়েছি, তাই অভিযোগ করার সুযোগ নেই।’

মহিমা মকওয়ানা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

গত দুই বছর কাজের পাশাপাশি নিজেকেও সময় দিয়েছেন মহিমা। ঘুরে বেড়িয়েছেন, নিজের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওই সময়টা আমাকে নিজেকে আরও ভালোভাবে চিনতে সাহায্য করেছে। বুঝেছি, কাজের বাইরেও জীবনে অনেক কিছু আছে। হতাশা এসেছে, কিন্তু অর্ধেকের বেশি বিষয়ই তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’

‘রচনা’ এখনো তাঁর পরিচয়
টেলিভিশন দিয়েই মহিমার অভিনয়জীবনের শুরু। সেই মাধ্যমের প্রতি তাই আলাদা কৃতজ্ঞতা আছে। আজও অনেকে তাঁকে সাপনে সুহানে লড়কপন কে ধারাবাহিকের ‘রচনা’ নামেই চেনেন। মহিমা বলেন, ‘তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর, আর এখন প্রায় ২৭। টেলিভিশনের প্রভাবকে আমরা অনেক সময় ছোট করে দেখি। কিন্তু ১৫ বছর পরও যখন মানুষ পরিবারের একজনের মতো ভালোবাসে, তখন বোঝা যায়, এর পরিধি কতটা বিস্তৃত। আমার পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি করেছে টেলিভিশন।’

মুসাফির ক্যাফেতে মহিমার সঙ্গে আছেন বিক্রান্ত ম্যাসি ও বেদিকা পিন্টো। সিনেমা বা সিরিজের সেটে দুই অভিনেত্রীর মধ্যে প্রতিযোগিতা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার গল্প প্রায়ই শোনা যায়। বেদিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন ছিল? ‘বিষয়টা দুই নারী বা দুই পুরুষের নয়, বরং একজন মানুষ কেমন, সেটাই আসল। দুই অভিনেত্রীর মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব হতে পারে, আবার কোনো পুরুষ অভিনেতার সঙ্গে মিল না–ও হতে পারে। সবটাই নির্ভর করে আপনি জীবনের কোন পর্যায়ে আছেন এবং নিজের সম্পর্কে কতটা আত্মবিশ্বাসী।’ তাঁর মতে, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে সেটিকে আড়াল না করে বরং কথা বলা উচিত। মুসাফির ক্যাফের সেটে বেদিকার সঙ্গে তাঁর সময়টা দারুণ কেটেছে বলেও জানান তিনি।

মহিমা মকওয়ানা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

যেভাবে এল প্রীতির চরিত্র
মুসাফির ক্যাফের প্রস্তাব যখন আসে, মহিমা তখন অন্য একটি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত। গ্রামের পরিবেশে, গ্রামের মেয়ের সাজে চলছিল সেই কাজ। এর মধ্যেই করণ মালিকের ফোন। মহিমা বলেন, ‘তিনি শুধু বললেন, নেটফ্লিক্সের জন্য একটি প্রেমের গল্প হচ্ছে। গল্প কী, কারা আছেন—কিছুই জানালেন না। অডিশন দিলাম, সেটা তাঁদের পছন্দ হলো। এরপর বিক্রান্তের সঙ্গে কেমিস্ট্রি টেস্ট হয়। তখনই জানতে পারি, বিক্রান্তও এই প্রকল্পে আছেন। চিত্রনাট্য পড়ার পর মনে হলো, আমি ঠিক এ ধরনের কাজেরই অপেক্ষায় ছিলাম।’

বিক্রান্ত ম্যাসির সঙ্গে তাঁর পরিচয় অবশ্য এই সিরিজের অনেক আগের। বয়স যখন মাত্র ৯-১০ বছর, বালিকা বধূর সেটে প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই দিনের একটি স্মৃতি এখনো মনে আছে। ‘তখন পরিচালক আমাকে সবার সামনে বকেছিলেন। বলেছিলেন, “একে বের করে দাও, ও অভিনয়ই পারে না।” কিন্তু সেই সেটে একজন ছেলে ছিল, যে খুব আন্তরিক। ১৫ বছর পর সেই একই মানুষের সঙ্গে আবার পর্দা ভাগ করে নিচ্ছি।’
এত বছর পর বিক্রান্তের সঙ্গে কাজ করে তাঁর যে গুণটি মহিমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো সরলতা। ‘ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভাবান মানুষ অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিই ভালো মানুষ খুব কম। বিক্রান্ত এমনই একজন। তিনি নিজের সাফল্য বা অতীত কাজের ভার সেটে নিয়ে আসেন না, নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। তাঁর কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা শিখেছি, সেটা হলো সরলতা।’

মহিমা মকওয়ানা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

পুরোনো দিনের প্রেমে বিশ্বাস
মুসাফির ক্যাফের প্রীতির সঙ্গে নিজের কতটা মিল খুঁজে পান? মহিমা জানালেন, শুধু প্রীতি নয়, সিরিজের সুধা চরিত্রটির সঙ্গেও নিজের অনেক মিল পেয়েছেন। ‘হয়তো আমার জীবনে তখন প্রীতিরই প্রয়োজন ছিল, তাই সেই চরিত্রটাই পেয়েছি।’ তাঁর কাছে গল্পটির সৌন্দর্য এখানেই—কোনো চরিত্রই পুরোপুরি ঠিক কিংবা ভুল নয়। মানুষ ভুল করে, সেই ভুল থেকেই শেখে।

কথা গড়ায় ভালোবাসা, বিয়ে ও জীবনসঙ্গীর প্রসঙ্গে। এখানেই নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা অকপটে জানান মহিমা। ‘আমি পুরোনো দিনের প্রেমে বিশ্বাস করি। বিয়ে, প্রতিশ্রুতি এবং বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মিশেল থাকা সম্পর্কে বিশ্বাস করি। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এমন কিছুই বেছে নিই, যা আমাদের হৃদয় সত্যিই চায়। আমাদের সবারই একটা “ঘর” দরকার। সেই ঘর হয়তো নিজের মধ্যে, অথবা কোনো একজন মানুষের মধ্যে খুঁজে পাই।’

মুসাফির ক্যাফে সিনেমা না হয়ে সিরিজ হওয়াটাও গল্পটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। ‘সিরিজ চরিত্র এবং গল্পের আরও গভীরে যাওয়ার সুযোগ দেয়। যাঁরা বইটি পড়েছেন, তাঁরাও সিরিজে নতুন অনেক কিছু খুঁজে পাবেন। আমার মনে হয়, মুসাফির ক্যাফের জন্য সিরিজের ফরম্যাট দারুণ উপযুক্ত। এতে দর্শক চরিত্রগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জানতে পারছেন। চরিত্রগুলোও দর্শকের জীবনের কাছাকাছি চলে আসছে।’

আরও পড়ুন

‘অন্তিম’ পূরণ করেছিল ছেলেবেলার স্বপ্ন
আড্ডার শেষ দিকে আসে অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ–এর প্রসঙ্গ। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে সালমান খান ও আয়ুশ শর্মার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন মহিমা। তাঁর কাছে ছবিটির অভিজ্ঞতা ছিল ছেলেবেলার স্বপ্নপূরণের মতো। ‘আমার মায়েরও স্বপ্ন ছিল আমাকে সিনেমা হলে বড় পর্দায় দেখা। ‘বিগ বস’–এ আমাকে দেখে সালমান স্যার এক বছর পর অডিশনের জন্য ডাকেন। অডিশনের দুই দিনের মধ্যেই সিনেমার সেটে যাই। অন্তিম আমার ছেলেবেলার স্বপ্ন সত্যি করেছিল।’

ভবিষ্যতে বড় পরিসরের বাণিজ্যিক ছবিতেও কাজ করতে চান মহিমা। তবে টেলিভিশনে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর ভাবনা এখন অন্য রকম। ‘টেলিভিশন আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু এখন নতুন গল্প ও চরিত্র করতে চাই।ওটিটি ও সিনেমা সেই সুযোগ দিচ্ছে।’

১২ বছর বয়সে টেলিভিশন দিয়ে শুরু করা মহিমা তাই এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যমের গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চান না। তাঁর কাছে মাধ্যমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গল্প ও চরিত্র—এমন চরিত্র, যা দর্শককে নতুন কিছু দেবে, একই সঙ্গে অভিনেত্রী মহিমা মকওয়ানাকেও নিজের অচেনা কোনো দিক আবিষ্কারের সুযোগ করে দেবে।