অমিতাভ বচ্চনের সহশিল্পী, ১৪তম জন্মদিনেই বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু এ অভিনেত্রীর
মাত্র চারটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন তরুণী সচদেব। তবে বিজ্ঞাপনের পরিচিত মুখ থেকে বলিউডের পর্দায় জায়গা করে নেওয়া এই শিশুশিল্পীর জীবন থেমে যায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে। নিজের জন্মদিনেই নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় মায়ের সঙ্গে প্রাণ হারান তিনি।
শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জগতে পা রেখেছিলেন খুব অল্প বয়সে। বিজ্ঞাপনে তাঁর মিষ্টি মুখ পরিচিতি এনে দিয়েছিল। পরে অভিনয়ের সুযোগ পান বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। মালয়ালম সিনেমাতেও কাজ করেছিলেন। বয়স বাড়লে হয়তো আরও বড় পরিসরে নিজেকে মেলে ধরতেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।
‘রসনা গার্ল’ হয়ে পরিচিতি
১৯৯৮ সালের ১৪ মে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম তরুণীর। ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরার সামনে কাজ শুরু করেন তিনি। বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে জনপ্রিয় পানীয় ব্র্যান্ড রসনার বিজ্ঞাপনে অভিনেত্রী কারিশমা কাপুরের সঙ্গে কাজ করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি। পরে ‘রসনা গার্ল’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ আসে। রসনার পাশাপাশি কোলগেট, আইসিআইসিআই ব্যাংক, সাফোলা ও কেশর বাদাম মিল্কের মতো ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে তাঁকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুশিল্পী হিসেবে প্রায় ৫০টি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছিলেন তরুণী।
বিজ্ঞাপনে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নির্মাতাদেরও আকৃষ্ট করে। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে। খুব অল্প বয়সেই বিজ্ঞাপন ও সিনেমা—দুই মাধ্যমেই নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছিলেন তিনি।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘পা’
তরুণীর চলচ্চিত্রজীবন দীর্ঘ ছিল না। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বলিউডের বড় তারকার সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া আর বালকির ‘পা’ সিনেমায় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে পর্দা ভাগ করেন তরুণী।
সিনেমাটিতে অমিতাভ অভিনয় করেন অরো চরিত্রে। প্রোজেরিয়া নামের বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত এই শিশুর শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়। চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে অমিতাভের অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পায়। সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেন বিদ্যা বালান ও অভিষেক বচ্চন।
‘পা’ সিনেমায় তরুণী ছিলেন অরোর স্কুলের বন্ধু সোমির চরিত্রে। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল ছোট, কিন্তু এমন একটি তারকাবহুল সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।
সিনেমাটি মুক্তির পর অমিতাভের অভিনয়ের পাশাপাশি তরুণীর মতো শিশুশিল্পীদের উপস্থিতিও দর্শকের নজর কাড়ে। বলিউডে তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে।
মালয়ালম সিনেমায়ও কাজ
শুধু হিন্দি সিনেমায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না তরুণী। ২০০৪ সালে মালয়ালম ভাষার ‘ভেল্লিনক্ষত্রম’ ও ‘সত্যম’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। দুটি সিনেমাতেই তাঁর সহশিল্পী ছিলেন পৃথ্বীরাজ সুকুমারন। ‘সত্যম’ সিনেমায় আরও ছিলেন প্রিয়ামণি।
অল্প বয়সে ভিন্ন ভাষার সিনেমায় কাজ করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে মালয়ালম ভাষায় সংলাপ বলার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য ছিল নতুন। তবে নির্মাতাদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে, সংলাপ শুনে নিয়ে তা বলার ক্ষেত্রে তরুণী আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।
মালয়ালম সিনেমায় তাঁর কাজ দর্শকের কাছে তাঁকে পরিচিত করে তোলে। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতেও সম্ভাবনাময় শিশুশিল্পী হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছিলেন তিনি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও দেখা গেছে তরুণীকে। শাহরুখ খানের সঞ্চালনায় ‘ক্যা আপ পাঁচভি পাস সে তেজ হ্যায়?’ কুইজ অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি; অর্থাৎ অভিনয় ও বিজ্ঞাপনের বাইরেও বিনোদনজগতে তাঁর উপস্থিতি ছিল।
শেষ সিনেমাটি মুক্তি পায় মৃত্যুর পর
তরুণীর অভিনয়জীবন থেমে যাওয়ার পরও পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দেখা গেছে। তামিল সিনেমা ‘ভেত্রি সেলভান’-এ অভিনয় করেছিলেন তিনি। ২০১২ সালে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগে সিনেমাটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শুটিং শেষ করেছিলেন তরুণী। পরে সিনেমাটি ২০১৪ সালে মুক্তি পায়।
জন্মদিনেই নেপালে বিমান দুর্ঘটনা
২০১২ সালের ১৪ মে। তরুণীর ১৪তম জন্মদিন। মায়ের সঙ্গে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিনি। পোখরা থেকে জোমসমের উদ্দেশে আগ্নি এয়ারের একটি ডর্নিয়ার উড়োজাহাজে উঠেছিলেন মা-মেয়ে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটে দুর্ঘটনা।
জোমসম বিমানবন্দরের কাছে অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি পাহাড়ে আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় তরুণী, তাঁর মা গীতা সচদেবসহ বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় মোট ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক; উড়োজাহাজের দুই পাইলটও মারা যান। কয়েকজন যাত্রী প্রাণে বেঁচে যান।
একদিকে জন্মদিনের আনন্দ, অন্যদিকে মুহূর্তেই সবকিছু হারিয়ে ফেলা—তরুণীর পরিবারের জন্য দিনটি হয়ে ওঠে অপূরণীয় শোকের। মা ও মেয়ের মরদেহ মুম্বাইয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৬ মে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
শোক জানিয়েছিলেন অমিতাভ ও অভিষেক
তরুণীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বলিউডে শোকের ছায়া নেমে আসে। ‘পা’ সিনেমায় তাঁর সহশিল্পী অমিতাভ বচ্চন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। প্রথমে খবরটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় ছিল গভীর বিস্ময় ও শোক।
অভিষেক বচ্চনও তরুণীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। সহশিল্পীকে হারিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘পা’ সিনেমার তাঁর সবচেয়ে আদরের সহশিল্পীদের একজনকে হারিয়েছেন। এত অল্প বয়সে তরুণীর চলে যাওয়া তাঁকে বাক্রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে